
দফায় দফায় বৈঠক আর মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণের পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য ৩৬ জন প্রার্থীর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করেছে বিএনপি। গতকাল সোমবার সকালে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে নারী আসনে বিএনপি মনোনীতদের নাম ঘোষণা করেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। প্রার্থীদের তালিকা ঘোষণার পরপরই এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলে।
কয়েকজনের বিরুদ্ধে বিগত দিনের কর্মকাণ্ড এবং অন্য দলে সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। আবার কারও বিরুদ্ধে অতি মূল্যায়নের অভিযোগ করা হয়েছে। এদিকে বিএনপি ঘোষিত তালিকায় বেশকিছু নতুন নারীনেত্রী জায়গা পেয়েছেন। বিষয়টিকে চমক হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে ছাত্রদল করা নেত্রীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সংরক্ষিত নারী আসনের আলোচনায় থাকা বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট এবং পরিচিত নারীনেত্রীর কপাল পুড়েছে। অতীতে সংসদ সদস্য ছিলেন—এমন ১০ জনকে এবার মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি।
নাম ঘোষণার সময় রুহুল কবির রিজভী বলেন, সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন দেওয়ার আগে জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যরা দুই দিনব্যাপী বিস্তৃত সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। সেই প্রক্রিয়া শেষে মনোনয়ন বোর্ড চূড়ান্তভাবে ৩৬ জনকে মনোনীত করেছে।
বিএনপির ঘোষিত তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, এবার সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থী মনোনয়নে নবীন, শিক্ষিত তরুণী এবং ত্যাগীদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। ৩৬ জনের মধ্যে সাবেক এমপি ১০ জন আর ২৬ জন নারী প্রথমবারের মতো বিএনপির মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য হতে যাচ্ছেন। প্রথমবারের মতো যারা এমপি হচ্ছেন, তারা হলেন মোসা. ফরিদা ইয়াসমিন, শাকিলা ফারজানা, নিপুণ রায় চৌধুরী, জীবা আমিনা খান, মাহমুদা হাবিবা, সাবিরা সুলতানা (মুন্নী), সানসিলা জেবরিন (প্রিয়াঙ্কা), সানজিদা ইসলাম তুলি, ফাহমিদা হক, আন্না মিনজ্, সুবর্ণা শিকদার (ঠাকুর), শামীম আরা বেগম স্বপ্না, ফেরদৌসী আহমেদ, বীথিকা বিনতে হোসাইন, সুরাইয়া জেরিন, মানছুরা আক্তার, জহরত আদিব চৌধুরী, মমতাজ আলম (আলো), ফাহিমা নাসরিন, আরিফা সুলতানা (রুমা), সানজিদা ইয়াসমিন (তুলি), নাদিয়া পাঠান পাপন, শওকত আর আক্তার (ঊর্মি), মাধবী মারমা, সেলিনা সুলতানা (নিশিতা) ও রেজেকা সুলতানা।
জানা যায়, তালিকার বাকি ১০ জন এর আগেও সংসদ সদস্য ছিলেন। তারা হলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী বেগম সেলিমা রহমান, শিরিন সুলতানা, রেহানা আক্তার রানু, শাম্মী আক্তার, রাশেদা বেগম হীরা, বিলকিস ইসলাম, হেলেন জেরিন খান, নিলোফার চৌধুরী মনি, নেওয়াজ হালিমা আর্লি ও সুলতানা আহমেদ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত হয়েছেন—এমন তিনজনও সংরক্ষিত কোটায় সংসদ সদস্য হতে যাচ্ছেন। তারা হলেন ঢাকা-১৪ আসনের সানজিদা ইসলাম তুলি, যশোর-২ আসনের সাবিরা সুলতানা (মুন্নি), শেরপুর-১ আসনের সানসিলা জেবরিন (প্রিয়াঙ্কা)।
এ ছাড়া বিএনপির তালিকায় এমন দুজন নারী স্থান পেয়েছেন, যাদের স্বামী, বাবা কিংবা শ্বশুর সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী হয়েছেন। তারা হলেন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নিপুণ রায় চৌধুরী। তার বাবা সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, আর শ্বশুর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঢাকা-৩ আসনের সংসদ সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। আরেকজন হলেন শিরিন সুলতানা, তিনি নিজেও মহিলা দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এবং বর্তমানে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক। তার স্বামী বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন নরসিংদী-১ আসনের সংসদ সদস্য। মহিলা দল থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ এবং সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হেলেন জেরিন খান।
বিএনপির তালিকা পর্যালোচনা করে আরও দেখা যায়, এবার সংরক্ষিত আসনে বিএনপির মিডিয়া সেল থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন দুজন। তারা হলেন বিএনপির মরহুম নেতা আয়েন উদ্দীনের মেয়ে মাহমুদা হাবিবা ও শাম্মী আক্তার (সাবেক এমপি)।
ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন তিনজন। তারা হলেন ফেরদৌসী আহমেদ, আরিফা সুলতানা (রুমা) এবং নাদিয়া পাঠান পাপন। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে একজন মনোনয়ন পেয়েছেন। তিনি হলেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মানসুরা আক্তার। তার গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনায়। তিনি এবার সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ হবেন। তার বাবা বিএনপির সাবেক নেতা মরহুম এবাদুর রহমান চৌধুরী।
এ ছাড়া বিএনপির সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন—এমন কয়েকজনকে সংরক্ষিত কোটায় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। তাদের একজন হলেন জহরত আবিদ চৌধুরী। তিনি মোবাইল অপারেটর বাংলালিংকের সিইও। এ ছাড়া মনোনয়ন পেয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি মরহুম শফিউল বারী বাবুর স্ত্রী বীথিকা বিনতে হোসাইন।
জানা যায়, এবার ছাত্রদল করা চারজন নেত্রীকে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। তারা হলেন সেলিনা সুলতানা নিশিতা, আরিফা সুলতানা রুমা, নাদিয়া পাঠান পাপন ও মানসুরা আক্তার। এ চার নেত্রীর রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল ছাত্রদলের বিভিন্ন পর্যায়ের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির অন্যতম প্রধান প্ল্যাটফর্ম ছাত্রদল। এ প্ল্যাটফর্ম থেকেই উঠে আসা এ চার নারীনেত্রী দীর্ঘ সময় ধরে সংগঠনের ক্যাম্পাসভিত্তিক রাজনীতি, মাঠপর্যায়ের আন্দোলন এবং সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেছেন।
কপাল পুড়েছে হেভিওয়েট নারীনেত্রীদের: জানা গেছে, এবারে সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির চূড়ান্ত তালিকায় অনেক হেভিওয়েট নারীনেত্রীর জায়গা হয়নি। অথচ তারা বেশ আলোচিত এবং অতীতে কেউ কেউ সংসদ সদস্যও ছিলেন। এমনকি বিগত দিনের আন্দোলন সংগ্রামে যার যার অবস্থান থেকে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। আলোচিত এবং হেভিওয়েট নারীনেত্রীদের মধ্যে যাদের কপাল পুড়েছে, তারা হলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের স্ত্রী ও জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস, সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া, খ্যাতিমান কণ্ঠশিল্পী কনকচাঁপা, মহিলা দলের সহসভাপতি নাজমুন নাহার বেবী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সাবেক সদস্য মরহুম মওদুদ আহমদের সহধর্মিণী হাসনা জসীমউদ্দীন মওদুদ, কণ্ঠশিল্পী বেবী নাজনীন, ছোটপর্দার অভিনেত্রী রুকাইয়া জাহান চমক, ইডেন কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি রেহানা আক্তার শিরিন, মহিলা দল নেত্রী অ্যাডভোকেট আসমা আজিজসহ বেশ কয়েকজন।
এদিকে মনোনয়ন বঞ্চিত একাধিক নেত্রীকে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়। তাদের অভিযোগ, অনেক ত্যাগী নেত্রীদের বাদ দেওয়া হয়েছে। এমনকি অনেককে অতি মূল্যায়ন করা হয়েছে।
গত শুক্র ও শনিবার সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার নেন বিএনপির মনোনয়ন বোর্ডের সদস্যরা। রাজধানীর গুলশানে বিএনপির চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে ১০টি সাংগঠনিক বিভাগের প্রায় ৯শ মনোনয়নপ্রত্যাশীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বোর্ডের ও বিএনপি চেয়ারম্যান এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান কালবেলাকে বলেন, দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে দুদিন নারী আসনের প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নিয়েছে বিএনপির মনোনয়ন বোর্ড। নিশ্চয়ই প্রার্থীদের বিগত দিনের আমলনামা দেখে সে অনুযায়ী বিবেচনা করা হয়েছে। এবারের মনোনয়নে ছাত্রদল থেকে উঠে আসা অনেক তরুণীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক খবর। তা ছাড়া যারা মনোনয়ন পাননি, নিশ্চয়ই দলের চেয়ারম্যান তাদের বিষয়েও ভালো কোনো পরিকল্পনা রেখেছেন। সবাইকে মিলেমিশে দল এবং জনগণের কল্যাণে কাজ করার আহ্বান জানান শায়রুল কবির খান।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তপশিল অনুযায়ী সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন দাখিলের শেষ তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে আজ ২১ এপ্রিল। মনোনয়নপত্র বাছাই হবে ২২ ও ২৩ এপ্রিল। বাছাই নিয়ে কোনো আপত্তি থাকলে আপিল করা যাবে ২৬ এপ্রিল, আর সেই আপিল নিষ্পত্তি করা হবে ২৭ ও ২৮ এপ্রিল। চূড়ান্ত প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে ৩০ এপ্রিল। এরপর ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১২ মে। ইসি বলছে, নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আসন বণ্টনে বিএনপি জোট ৩৬টি, জামায়াতে ইসলামী জোট ১৩টি, স্বতন্ত্ররা মিলে পাবে একটি আসন।













































