প্রচ্ছদ জাতীয় সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেনের দৃষ্টিতে আওয়ামী লীগের ‘সবচেয়ে বড় ভুল’

সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেনের দৃষ্টিতে আওয়ামী লীগের ‘সবচেয়ে বড় ভুল’

সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, তার দৃষ্টিতে আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা কমে যাওয়া এবং দলের কিছু নেতার চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়া।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক থেকে সম্প্রচারিত টাইম টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সঞ্চালকের প্রশ্নের জবাবে তিনি একথা বলেন। সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ তুলে ধরা হলো।

প্রশ্ন: কোনো রাজনীতিবিদ করাপশন করতে পারে সরকারি কর্মচারীর সহযোগে, একা পারে না। আওয়ামী লীগ সরকারের সবচেয়ে বড় ভুল আপনার চোখে কী হয়েছিল?
এ কে আব্দুল মোমেন: আমার দৃষ্টিতে আওয়ামী লীগ সরকারের ভুলটা হলো- আমাদের কিছু নেতা চাদাবাজিতে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। যে টাকা দেয় তাকে তিনি (সরকার প্রধান) পদবী দেন। আর জনগণের সাথে সম্পৃক্ততা কমে গেল। সরকার সরকারি কর্মচারীর ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, ওরা যা বলে তাই। একজন মন্ত্রী হিসেবে কিংবা এমপি হিসেবে (তৎকালীন) প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাত করার সুযোগ আমাদের সীমিত হয়ে গেল।

কারণ সরকারি অফিসাররা এ্যাপয়েন্টমেন্ট নেন, তিনারা সহজে দেন না। একটা না একটা বাহানা দিয়ে। প্রধানমন্ত্রী মাঝেমধ্যে কোন জায়গায় বড় বক্তৃতা দেন, আমরা দূরে চেয়ারে বসে থাকি আর শুনি। তারপরে যখন উনি বক্তৃতা শেষ করেন তখন আমরা রাজনীতিবিদরা উনার সাথে কথা বলার জন্য সামনে অগ্রসর হলে এসএসএফ লোক ২৫ ফিট দূরে দূর দূর করে সরিয়ে দেয়। তার ফলে আমরা যা কিছু ফিল করি, এই চাঁদাবাজি, এই করাপশন পাবলিক কী মনে করছে সেটা বলার সুযোগ আমাদের কমে গেল। তো আমার মনে হয় আমাদের সবচেয়ে বড় অপরাধ হয়েছে দুটো। একটি হচ্ছে জনগণের সাথে সম্পৃক্ততা কমানো বা কমে গেছে, আর আরেকটি হলো আমাদের অনেক বিভিন্ন শ্রেণীর নেতারা এই চাঁদাবাজিতে মুখ্য হয়ে গেলেন।

এগুলো আমি সংসদেও তুলেছি। আমি ইভেন সংসদে বলেছি যে আমার সিলেট শহরে যে আমার এয়ারপোর্ট হবে তিন বছরে, তিন বছর পার হয়ে গেছে ১০ শতাংশ কাজ হয় নাই। এর মূল কারণ হচ্ছে আপনার দুর্নীতি। এরা দেরি করলে পরে ওটার পয়সা বাড়ে, তখন ওটা পয়সা যা অধিকত দেয়া হয় ৮০ শতাংশ খেয়ে ফেলে। সুতরাং তাদের চিহ্নিত করে আপনার আমি বলেছিলাম যে পিডি হবে যে সে যদি অনটাইম প্রজেক্ট শেষ না করে তার ডিমোশন হবে, চাকরি যাবে যদি রিজনেবল গ্রাউন্ড না থাকে। এইগুলো কয়েকটা এক্সাম্পল।

প্রশ্ন: আপনি কি বলতে চাচ্ছেন যে আপনারা যারা মন্ত্রী ছিলেন তখন মন্ত্রীরাও প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে মানে সবসময় দেখা করতে পারতেন না?
এ কে আব্দুল মোমেন: ইজ নট ভেরি ইজি। প্রথম দিকে যখন আমি মন্ত্রিসভায় সদস্য হলাম, কোভিডের আগে যখন আমরা হলাম, তখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রত্যেকদিন ক্যাবিনেট মিটিং এর পরে সব অফিসারদের বের করে দিতেন দিয়ে সব রাজনীতিবিদ ইলেক্টেড যারা রাজনীতিবিদ তাদের রাখতেন। তখন উনি বলতেন যে আপনাদের কোন সমস্যা আছে কি না। তখন আমরা নির্দ্বিধায় আমাদের সমস্যাগুলো বলতাম। তখন উনি উত্তর দিতেন, কাউন্টার হতো, আমরাও কাউন্টার করতাম। কিন্তু কোভিডের পরে মিটিং এর সাথেই উনি বের হয়ে যান, আমরা দৌড়ে গিয়ে দাঁড়ায়ে কোন একটা যদি কিছু কথা বলতে পারি সেই সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করি। এই একটা ডিস্টেন্স শুরু হলো।

যেমন ধরুন আপনার এই কোটার কথা বলি। কোটা সম্পর্কে আমাদের প্রত্যেকের ধারণা হলো যে আওয়ামী লীগ নীতিগতভাবে এই কোটা রেশনালাইজেশনে পরিবর্তন চায়। আমাদের অনেক সহকর্মীরা এই নাতি-ফাতি ওগুলোর জন্য কোটা রাখার কোন পক্ষেই না। কিন্তু আমরা এইজন্য পরিবর্তন চেয়েছি এবং এটা নীতিগতভাবেও আওয়ামী লীগ গ্রহণ করেছে। কিন্তু কোথায় লয়াররা কী একটা কেস ফেস করে… আমি বললাম কোর্টের রায় দেওয়ার কেস না এটা তো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। আমেরিকাতে ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে যখন আব্রাহাম লিংকন ঘোষণা দিলেন রাজনৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত দিলেন যে ‘Slavery is abolished’, এইটা বাতিল হলো। এরপর কিন্তু কোর্টের কোন জাজ স্লেভারিকে প্রটেক্ট করে নাই। সুতরাং পলিটিক্যাল ডিসিশন…

প্রশ্ন: এই যে আপনি বললেন চাঁদাবাজিতে লিপ্ত হয়ে গেছে কিছু নেতা এবং আপনি জানেন যে বড় বড় দুর্নীতিও হয়েছিল অনেকগুলো। বাট আপনারা কি কখনও প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন?
এ কে আব্দুল মোমেন: করেছি। এই যে কালো টাকা সাদা করা সেইসব নিয়ে আমি বলেছি। করাপশন নিয়ে, সরকারি কর্মচারীর যে ভরাডুবি করাপশন সেটা নিয়ে বলেছি। তারপর প্রজেক্ট ডিলে করে যে করাপশন হয় সেটা আমি বলেছি। ব্যাংকিং ক্ষেত্রে যে একটা নৈরাজ্য, ব্যাংকিংয়ে দুই একটা লোক লাভবান হতে… যারা এমন লোক এরা ব্যবসায়ী, আমি চিনি না ওদের। এরা আওয়ামী লীগের লোক না। যেমন নামটা শুনেন এস আলমের কাহিনী। এস আলম সাহেব কি একবার জাতীয় পার্টি, একবার বিএনপি, একবার জামাত এইসব। উনি ব্যবসায়ী লোক। তাকে তার জন্য কারা দিল? সামরিক বাহিনী তারে প্রটেক্ট দিল। সবগুলোই সামরিক বাহিনী। আমরা এগুলো কিছুই জানি না। এই যে প্রটেকশন দিল তাকে, সে ব্যাং-ট্যাং লুট করলো, দখল করলো ও সবই তো আপনার আমাদের ঊর্ধ্ব পড়া লোকের কারণে। আমাদের কোন ইনপুট নাই এখানে।

আমি এগুলো তোলার পরে আমাকে বলা হলো, দেখেন আমরা তো জিরো টলারেন্স দিয়েছি করাপশনে আর আমরা তো দুদকটাকে এম্পাওয়ার করেছি তারা কাজ করবে। আমি কি প্রত্যেকের কেসের পিছনে পিছনে লেগে থাকব? দুই একটা পিছনে লাগাতে উচিত। দুদক ঠিকমত করতেছে না।

খালি প্রশংসা করত শেষ। আর দোষটা বলতে বলতে ভয়। একবার প্রধানমন্ত্রী নিজে বললেন যে আমার পিয়নেরই ৪০০ কোটি টাকা। একজন উনার এক পিয়ন, সে চাঁদাবাজি করে এইসব করে বহু টাকার মালিক হয়ে যায়। উনার এক পিয়নই ৪০০ কোটি টাকার মালিক। সুতরাং অনেকদিন থাকলে যেটা হয় সেটা ওই যে বললাম একটা দূরত্ব বেড়েছিল। এগুলো আমাদের অপকর্ম।

প্রশ্ন: আপনার চোখে সবচেয়ে করাপ্টেড কে ছিল মন্ত্রিসভার মধ্যে অথবা আমলাদের মধ্যে?
এ কে আব্দুল মোমেন: কোন রাজনীতিবিদ করাপশন করতে পারে সরকারি কর্মচারীর সহযোগে, একা পারে না। কারণ প্রজেক্টের টাকা, টাকার ডিসপার্সমেন্ট অফিসাররা করে। তখন আপনাকে অফিসারের সাথে একটা আতাত করতে হবে। অনেক নিচে নামতে হবে তার সাথে বলতে হবে যে তুমি এটাতে টাকা খাও এর থেকে অত অংশ আমাকে দাও। সহযোগিতা ছাড়া আপনি একা টাকা খেতে পারবেন না। আপনার লজ্জা লাগবে। আর আপনি ওরকম সম্পর্কও করতে পারবেন না। যারা খেয়েছে তারা ওই কনিয়াভেন্স করে খেয়েছে।

সূত্র: চ্যানেল আই