প্রচ্ছদ জাতীয় বিয়ের ৫ দিনের মাথায় গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু: হত্যা নাকি আত্মহত্যা?

বিয়ের ৫ দিনের মাথায় গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু: হত্যা নাকি আত্মহত্যা?

ঘটা করে বিয়ে হয়েছিল ১৮ বছর বয়সী রিয়া আক্তারের। নতুন সংসারের রঙিন স্বপ্ন দেখার কথা ছিল যে বয়সে, সেই বয়সেই এক নববধূর নিথর দেহ উদ্ধার হলো স্বামীর ঘরের খাটের ওপর থেকে। পরিবারের দাবি, নির্মম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে রিয়াকে হত্যা করা হয়েছে। অথচ থানা পুলিশ মামলা নিয়েছে ‘আত্মহত্যার প্ররোচনা’ আইনে। নেত্রকোণার পূর্বধলা থানার এই ঘটনাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র রহস্য, ধূম্রজাল ও স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদ।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ১০ জুলাই নেত্রকোণা জেলার পূর্বধলা থানাধীন ৮নং বিশকাকুনী ইউনিয়নের বড়রুহী গ্রামের মো. লিটন মিয়ার মেয়ে রিয়া আক্তারের সঙ্গে বিয়ে হয় ৪নং খলিশাউড় ইউনিয়নের ডুবিয়ারকান্দা গ্রামের মো. আব্দুর রশিদের ছেলে ইমরান হোসেনের (২২)।

বিয়ের পর থেকেই রিয়াকে নানা বিষয় নিয়ে সন্দেহ এবং মানসিক নির্যাতন চালাতে থাকেন তার স্বামী ইমরান। ঘটনার দিন (১৫ জুলাই) দুপুর সাড়ে ১২টায় রিয়ার বাবা লিটন মিয়া মেয়েকে দেখতে তার শ্বশুরবাড়িতে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে রিয়ার শ্বশুর ফোন করে জানান, দুপুর ১১টার দিকে রিয়া ঘরের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছে।

সংবাদ পেয়ে স্বজন ও স্থানীয় ইউপি সদস্যসহ রিয়ার বাবা ঘটনাস্থল ইমরানের বড় ভাই হানিফ মিয়ার চৌচালা হাফ-বিল্ডিং ঘরে গিয়ে দেখতে পান রিয়ার মরদেহ খাটের ওপর শোয়ানো অবস্থায় রয়েছে।

এ ঘটনায় রিয়ার বাবা মো. লিটন মিয়া বাদী হয়ে ১৫ জুলাই থানায় লিখিত অভিযোগ দিলে পরদিন পূর্বধলা থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনা মামলা রুজু করা হয়।

নথিভুক্ত এজাহারের বাইরে সরেজমিন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে কিছু অসঙ্গতি ও চাঞ্চল্যকর তথ্য, যা সাধারণ আত্মহত্যার ঘটনাকে গভীর সন্দেহের তালিকায় ফেলে দেয়!

রিয়ার বাবা লিটন মিয়া জানান, তিনি মেয়েকে দেখতে যাওয়ার পথে ফাজিলপুর বাজার থেকে মিষ্টি কিনেছিলেন। কিন্তু মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে জানালার ফাঁক দিয়ে দেখতে পান মেয়ের লাশ শোয়ানো। পরবর্তীতে তিনি স্বজনদের নিয়ে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে দেখেন ওয়ালের এক কোণে রক্ত লেগে আছে, যা প্রলেপ দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করা হয়েছিল। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ফাঁসে ঝুললে খাটের ওপর স্বাভাবিক অবস্থায় লাশ শোয়ানো থাকবে কেন? কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার মেয়েরে যেমনে মাইরা ফেলছে, এমনে আমি অহন ফাঁসি চাই! আমি খুনের বদলে খুন চাই!’

রিয়ার খালু মোহাম্মদ শাহীন মিয়া বলেন, ‘আমরা গিয়ে বললাম, ফাঁসে মরলে তো ঝুলন্ত অবস্থায় থাকার কথা, নিচে শুইয়ে রাখলেন কেন? আপনারা পুলিশকে না জানিয়ে লাশ নামালেন কেন? তারা বাহানা দিলেন, মেয়ের ধুকধুপানি (শ্বাস) ছিল। কিন্তু হাসপাতালে না নিয়ে ঘরে শুইয়ে রাখল কেন? আর মেয়ে যদি ভেতর থেকে দরজার সিটকিনি আটকে ফাঁস দেয়, তবে বাইরের সিটকিনি ভাঙা কেন?’

প্রত্যক্ষদর্শী ও এলাকাবাসী আবু বক্কর রানা জানান, রিয়াকে যারা গোসল করিয়েছেন সেসব নারীদের বর্ণনা অনুযায়ী—মেয়ের চোখ, মুখ, নাক এবং শরীরের বিভিন্ন সংবেদনশীল ও অন্যান্য স্থানে আঘাত ও ফোলা দাগ পাওয়া গেছে। রিয়ার নানির বক্তব্যেও উঠে এসেছে অমানুষিক নির্যাতনের ইঙ্গিত।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পূর্বধলা থানার এসআই মো. রাশেদ হাসান লাশের সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুত করে ময়নাতদন্তের জন্য নেত্রকোণা আধুনিক সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠান। পরিবারের অভিযোগ, ঘটনাটি সুস্পষ্ট হত্যাকাণ্ড হওয়া সত্ত্বেও পুলিশ প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যার প্ররোচনা মামলা রুজু করেছে। এমনকি অভিযোগ উঠেছে, শুরুতেই বিষয়টি আপস করারও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল।

অভিযুক্ত ইমরান হোসেনের বাড়িতে গেলে তার পরিবারের কাউকে পাওয়া যায়নি। তবে বাড়িতে মানুষ বসবাসের ছাপ দৃশ্যমান ছিল। পাশের বাড়িতে খোঁজ নিলে জানা যায়, একটু আগেও বাড়িতে ছিলেন, তবে এখন কোথায় তা তারা জানেন না।

তবে আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন। নেত্রকোণার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) হাফিজুল ইসলাম বলেন, সদ্যবিবাহিত একটি মেয়ের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক ও ন্যাক্কারজনক। ইতোমধ্যে পূর্বধলা থানায় একটি নিয়মিত মামলা রুজু হয়েছে এবং প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তারের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যার প্ররোচনা, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট ও এক্সপার্ট অপিনিয়ন (বিশেষজ্ঞ মতামত) পাওয়ার পর তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা হবে।

নববধূ রিয়া আক্তারের এই অকাল ও রহস্যজনক মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে দেয়নি, বরং পুরো এলাকার জনমনে চরম ক্ষোভ ও বিচারের দাবি তুলেছে। স্বজন ও এলাকাবাসীর একটাই আবেদন, কোনো প্রভাব বা প্ররোচনায় যেন তদন্ত পথ না হারায়।