
দীর্ঘ ৪৫ বছর আত্মগোপনে থাকা সাবেক মেজর মো. মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ঘটনার সময় জিয়াউর রহমানের পাশেই ছিলেন মোজাফফর।
বুধবার (১৫ জুলাই) রাতে বনানীর একটি বাসা থেকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ তাকে আটক করে এবং পরদিন বৃহস্পতিবার সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে। বর্তমানে তিনি সেনাবাহিনীর হেফাজতে রয়েছেন।
তৎকালীন মেজর পদমর্যাদার এই কর্মকর্তার বয়স এখন ৭৭ বছর। ঐতিহাসিক বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে জিয়া হত্যার মুহূর্তে তার কাছেই উপস্থিত ছিলেন মোজাফফর।
নথিপত্র অনুসারে তিনি ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন এবং এ ঘটনায় সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে একমাত্র তিনিই বর্তমানে জীবিত আছেন।
দীর্ঘদিন পলাতক থাকায় এতকাল তার কাছ থেকে কোনো তথ্য প্রকাশ হয়নি। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যমান প্রমাণাদির সাথে তার দেওয়া তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে জাতির সামনে প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরার এক সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে।
জানা যায়, এই সেনা কর্মকর্তা ১ম জাতীয় রক্ষীবাহিনীতে (জেআরবি) কমিশন পেয়েছিলেন এবং ১৯৮১ সালে ২৪ পদাথিক ডিভিশনে কর্মরত ছিলেন। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকোণ্ডের পর থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি কলকাতায় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার আশ্রয়ে আত্মগোপন করেছিলেন। সে সময় তিনি নিজেকে ‘বিপ্লব সরকার’ এবং ‘জয় ব্যানার্জি’- এই দুটি ছদ্মনামে পরিচয় দিতেন এবং পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন।
দীর্ঘ পলাতক জীবনে কারা তাকে পালাতে, ভারতে থাকতে, বিভিন্ন দেশে যাতায়াত করতে এবং পরে বাংলাদেশে ফিরতে সহায়তা করেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে ৪৫ বছর ধরে তাকে গ্রেপ্তার করতে না পারার কারণও পরিষ্কার হতে পারে।
জিয়া হত্যার পর ‘বিদ্রোহের’ অভিযোগে সামরিক আদালতে ১৮ সেনা কর্মকর্তার বিচার হয়। তাঁদের মধ্যে ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হয়। তবে মেজর এস এম খালেদ ও মেজর মোজাফফর পালিয়ে যেতে সক্ষম হন এবং তাদের ধরিয়ে দিতেও পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল।
১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে যাওয়া সশস্ত্র সেনা কর্মকর্তাদের একজন এবং জিয়াকে হত্যার মুহূর্তে তাঁর কাছেই ছিলেন মোজাফফর।
সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘বাংলাদেশ: এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ বইয়ে জিয়া হত্যাকাণ্ডের একটা বর্ণনা দিয়েছেন। বইটির ত্রয়োদশ অধ্যায়ে তিনি লিখেছেন, হামলাকারীরা সার্কিট হাউসের কক্ষগুলোতে জিয়াউর রহমানকে খুঁজছিলেন। গোলাগুলির শব্দ শুনে জিয়া কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলে তাঁর সবচেয়ে কাছে ছিলেন মেজর মোজাফফর ও লেফটেন্যান্ট মোসলেহউদ্দিন।
মাসকারেনহাসের বর্ণনায়, মোজাফফর তখন দৃশ্যত কাঁপছিলেন। মোসলেহউদ্দিন জিয়াকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
মাসকারেনহাসের বর্ণনা অনুযায়ী, মোজাফফরের ভূমিকা হত্যার মুহূর্তে উপস্থিত থাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক ঘণ্টা পর মেজর মোজাফফর, মেজর শওকত আলী ও মেজর রেজা সশস্ত্র সেনাসদস্যদের নিয়ে আবার সার্কিট হাউসে যান।
বইটিতে বলা হয়েছে, তাঁরা জিয়ার শোবার ঘরে তল্লাশি চালান। ‘গোপন কাগজপত্র’ ও জিয়ার ব্যক্তিগত ডায়েরি খোঁজা হয়। তাঁর ব্যক্তিগত জিনিসপত্র একটি পুরোনো স্যুটকেসে ভরা হয়। এরপর জিয়া এবং নিহত দুই নিরাপত্তা কর্মকর্তার মরদেহ কাপড়ে মুড়িয়ে সামরিক যানে করে নিয়ে যাওয়া হয়।
মাসকারেনহাস আরও লিখেছেন, পরে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুরের দপ্তরে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও মোজাফফর উপস্থিত ছিলেন। সেখানে মঞ্জুর ‘বিপ্লবী পরিষদ’ গঠনের ঘোষণা দেন।
এদিকে মোজাফফরের পলাতক জীবনের একটি বিরল তথ্য পাওয়া যায় মেজর জেনারেল (অব.) মইনুল হোসেন চৌধুরীর স্মৃতিকথা ‘এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক’ বইয়ে। মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলৎজ ২০১৪ সালে দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী নিবন্ধে মইনুলের বইয়ের সংশ্লিষ্ট অংশের ইংরেজি অনুবাদ উদ্ধৃত করেছিলেন।
মইনুল লিখেছেন, ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত থাইল্যান্ডে রাষ্ট্রদূত থাকাকালে তিনি জানতে পারেন যে জিয়া হত্যার পলাতক অভিযুক্ত মেজর খালেদ ব্যাংককে অবস্থান করছিলেন এবং মোজাফফর ছিলেন ভারতে। একপর্যায়ে মোজাফফর ভারত থেকে ব্যাংককে গিয়ে খালেদকে সঙ্গে নিয়ে মইনুলের সঙ্গে দেখা করেন। জিয়াউর রহমান কীভাবে নিহত হয়েছিলেন, তা জানতে মইনুল তাদের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেন।
খালেদ ও মোজাফফরের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে মইনুল লিখেছেন, চট্টগ্রামের ২৪ পদাতিক ডিভিশনের কয়েকজন কর্মকর্তা জিয়াকে সার্কিট হাউস থেকে তুলে সেনানিবাসে আনার পরিকল্পনা করেছিলেন। পরিকল্পনায় নেতৃত্বে ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান, মাহবুব ও মেজর খালেদ। জেনারেল মঞ্জুর আগে থেকে পরিকল্পনা জানতেন না বলে তাদের দাবি।
তাদের ভাষ্যে, জিয়াকে চাপ দিয়ে তৎকালীন সেনাপ্রধান এরশাদসহ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা এবং কয়েকজন মন্ত্রীকে অপসারণ করানোই ছিল তাদের উদ্দেশ্য।
সার্কিট হাউসের ঘটনা সম্পর্কে মইনুল লিখেছেন, জিয়া কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসার পর মতিউর রহমান খুব কাছ থেকে তাকে গুলি করেন।
সূত্র : একুশে টিভি











































