
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অন্য আসনের মতো চট্টগ্রামের দুটি আসনেও নির্বাচন হয়েছিল। কিন্তু ফলাফল প্রকাশ করা হয়নি।
কারণ এ দুটি আসন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে পৃথক মামলা বিচারাধীন ছিল। তবে এবার পৃথক রায়ে দুটি আসনের মামলা নিষ্পত্তি হলো উচ্চ আদালতে।
এতে চট্টগ্রাম-২ আসনের বিএনপি প্রার্থী সরোয়ার আলমগীরের মনোনয়নপত্র বৈধ হলেও চট্টগ্রাম-৪ আসনের প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র অবৈধ থেকে যায়। কেন এমন হলো—এমন প্রশ্নে আইনজীবীরা বলছেন, আপাতত পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়া পর্যন্ত বিষয়টি পুরোপুরি বলা যাবে না।
তবে ‘ঋণ খেলাপের’ বিষয়টি এখানে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
সরোয়ার আলমগীরের আইনজীবীর মতে, মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের সময় সরোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা বৈধ ছিল।
অর্থাৎ ঋণ খেলাপি ছিলেন না।
অপরদিকে আসলাম চৌধুরীর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী জামায়াতে ইসলামীর আনোয়ার সিদ্দিকীর আইনজীবীর মতে, আসলাম চৌধুরী ঋণ খেলাপি ছিলেন বলে তার মনোনয়নপত্র অবৈধ হয়ে যায়।
চট্টগ্রাম-২
সরোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে বৈধ হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে ঋণ খেলাপের অভিযোগে আপিল করেছিলেন জামায়াতের প্রার্থী মো. নুরুল আমীন।
শুনানি শেষে ১৮ জানুয়ারি কমিশন তার প্রার্থিতা বাতিল করে। এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করেন সরোয়ার আলমগীর।
গত ২৭ জানুয়ারি সরোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা বাতিল করে নির্বাচন কমিশনের দেওয়া আদেশ স্থগিত করেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে তাকে নির্বাচনে সুযোগ দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে রুল জারি করা হয়।
এর বিরুদ্ধে জামায়াত প্রার্থী নুরুল আমীন আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করেন। ৩ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ সরোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা বহালের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল মঞ্জুর করেন। ফলে সরোয়ার আলমগীর নির্বাচন করার সুযোগ পান। কিন্তু ফলাফলটি আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকে।
এর মধ্যে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সরোয়ার আলমগীর বিজয়ী হন। কিন্তু আদালতের আদেশের কারণে ফলাফল প্রকাশিত হয়নি।
এরপর জামায়াতের ওই প্রার্থীর করা আপিলের ওপর শুনানি শেষে ১৬ জুন আদেশ দেন আপিল বিভাগ। আপিল নিষ্পত্তি করে দেওয়া আদেশে আপিল বিভাগ দ্রুত সম্ভাব্য দুই সপ্তাহের মধ্যে হাইকোর্টে রুল নিষ্পত্তি করতে বলেন। রুল নিষ্পত্তি হওয়া পর্যন্ত গত ৩ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগের দেওয়া আদেশ চলমান থাকবে বলে উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সরোয়ার আলমগীর নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে ফলাফল প্রকাশ স্থগিত থাকে।
এ অবস্থায় হাইকোর্টে রুল শুনানি শেষে বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ে সরোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা বৈধ করা হয়।
রায়ের পর রিটকারীর আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, এখন নির্বাচন কমিশন তার পরবর্তী কার্যক্রম চালাবে। গেজেট ও শপথ নিতে এখন আর বাধা থাকল না। অর্থাৎ মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের দিন তার প্রার্থিতা বৈধ ছিল। তিনি ঋণ খেলাপি নন।
জামায়াত প্রার্থী নুরুল আমীনের পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শিশির মনির ও আইনজীবী আজিম উদ্দিন পাটোয়ারী।
আইনজীবী শিশির মনির বলেন, আজকের রায়ে সরোয়ার আলমগীরের নমিনেশন বৈধ। অর্থাৎ তিনি ঋণ খেলাপি ছিলেন না। কিন্তু আরপিওতে আছে যেদিন তিনি নমিনেশন পেপার দাখিল করেছেন, সেদিন তিনি ঋণ খেলাপি কিনা সেটা বিচার্য বিষয়। আজকে আদালত বলেছেন, তিনি যাচাইয়ের দিন ঋণ খেলাপি ছিলেন না। যাচাইয়ের দিন প্রাসঙ্গিক নয়, সাবমিশনের দিন প্রাসঙ্গিক। আমরা এ বিষয়ে আপিল বিভাগে যাব।
চট্টগ্রাম-৪
আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র নির্বাচন কমিশনে আপিল শুনানির শেষ দিন গত ১৮ জানুয়ারি বৈধ ঘোষণা করা হয়। সেই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের করা রিট হাইকোর্ট খারিজ করে দিলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ পরে আপিল বিভাগে আবেদন করে।
হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে জামায়াতের প্রার্থী মো. আনোয়ার সিদ্দিকী লিভ টু আপিল করেন। গত ৩ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বহালের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল মঞ্জুর করেন। ফলে আসলাম চৌধুরী নির্বাচন করার সুযোগ পান। কিন্তু আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ফলাফল স্থগিত থাকে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসলাম চৌধুরী বিজয়ী হন। কিন্তু আদালতের আদেশের কারণে ফলাফল প্রকাশিত হয়নি।
এরপর আপিল বিভাগে শুনানি হয়। শুনানি শেষে চট্টগ্রাম-৪ আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেসরকারিভাবে বিজয়ী বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিল করেন আপিল বিভাগ।
আদালতে জামায়াতের প্রার্থীর পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির এবং সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী মো. আজিম উদ্দিন পাটোয়ারী। ব্যাংক এশিয়ার পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কামাল উল আলম ও আইনজীবী এ এস এম ইলিয়াস হায়দার।
রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।
আসলাম চৌধুরীর পক্ষে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী ও ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন।
আইনজীবী শিশির মনির বলেন, সবার ঐকমত্যের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে (আপিল বিভাগের চার বিচারপতি) আসলাম চৌধুরী ঋণ খেলাপি থাকার কারণে তার প্রার্থিতা বাতিল বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এই রায়ের মাধ্যমে আসলাম চৌধুরী যে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন, তার অংশগ্রহণকে অবৈধ ঘোষণা করা হলো। অর্থাৎ তিনি অযোগ্য প্রার্থী হলেন। প্রার্থী অযোগ্য হওয়ার ফলে ওই আসনে কী হবে, এটা আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হলে পরে বিস্তারিত জানা যাবে। এই মর্মে এখন কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তবে সাধারণত কোনো আসনে প্রথম ব্যক্তি অযোগ্য হলে সাধারণত ভোট পাওয়া দ্বিতীয় যিনি থাকেন, তাকে নির্বাচিত হিসেবে ঘোষণা করার কমনসেন্স তাই বলে। এটি সাধারণ নিয়ম। কিন্তু এর বাইরে আপিল বিভাগ বিশেষ কোনো নির্দেশনা দেন কিনা, ব্যাপারটি পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হলে বিস্তারিত জানা যাবে। এটা ল্যান্ডমার্ক জাজমেন্ট।
এখন চট্টগ্রাম-৪ আসনের কী হবে—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেবেন। একটি পদক্ষেপ কমনসেন্সের ভিত্তিতে হলো, কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে প্রধানতম ব্যক্তি যদি অযোগ্য হয়ে যান, তাহলে স্বাভাবিকভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ যিনি থাকেন, তিনি যোগ্য থাকেন। এছাড়াও এখানে ভিন্ন কোনো পদক্ষেপ হবে কিনা, এ ব্যাপারটি আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর নির্বাচন কমিশন তার ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেবেন। ওখানে দ্বিতীয় হয়েছেন দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকী।












































