
‘অণ্ডকোষ এমনভাবে চেপে ধরেছে যে আমি শ্বাসরোধ হয়ে মারা যাওয়ার উপক্রম। এরপর আমাকে চেয়ার থেকে ফেলে দেয়। আমাকে নিচে ফালাইয়া আমার বুকে পাড়া দিয়া, গলা পাড়া দিয়া ধরে। তারা আমাকে হত্যার চেষ্টা করে এবং বলে যে, আমাদেরকে চেক দে, চেক দে। আমি চেক দেব কেন? তবে ওই অবস্থায় জীবন বাঁচানোটাই বড় মনে হইছে।’
এভাবেই অণ্ডকোষ চেপে ধরে চেক ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার ঘটনার বিবরণ দিচ্ছিলেন বরিশালের অগ্রণী হাউজিং (আবাসন) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আব্দুল আজিজ হাওলাদার। বর্ণনার এক পর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। আজ রবিবার (৫ জুলাই) বিকেলে সংবাদ সম্মেলনে তিনি তার ওপর হওয়া নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেন।
গত ২৭ জুন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে নগরীর সদর রোডে অবস্থিত অগ্রণী হাউজিংয়ের কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। তবে সিসিটিভি ফুটেজটি শনিবার (৪ জুলাই) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হলে তা দ্রুত ভাইরাল হয়। এর আগে গত বৃহস্পতিবার তিনি আদালতে একটি নালিশি মামলা দায়ের করেন। আদালত মামলাটি এফআইআর হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। এ ঘটনায় আজ রবিবার মূল অভিযুক্ত মোস্তাফিজুর রহমান লিটুকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
প্রেস ব্রিফিংয়ে ভুক্তভোগী আব্দুল আজিজ হাওলাদার বলেন, ‘ওই অবস্থায় জীবন বাঁচানোটাই বড় মনে হইছে। যার জন্য আমি আমার ড্রয়ার থেকে চেক বের করলাম। বললাম যে, ‘আমাকে ছেড়ে দাও, আমি চেক তো বের করতে হবে, তারপর তো চেক দেব। তারপর আমাকে ছাড়ল। আমার পিওন আইসা আমাকে ধরে উঠাইল। উঠাবার পরে আমি ড্রয়ার থেকে চেক বের করলাম। সে প্রথমে একটা ব্লাঙ্ক চেক নিল, আর একটা চেক নিল পরে লেখাইয়া— ৭০ লক্ষ টাকা। এরপরে তার পকেট থেকে দুই সেট স্ট্যাম্প বের করল। এক সেটে তিন পাতা করে, মোট ছয়টা পাতায় আমার স্বাক্ষর নিল, আমার সিল নিল। নিয়া আমাকে বলল যে, এখন আমাদের সাথে থানায় যাবি। যাইয়া সালিশ করবি যে আমি তোর কাছে টাকা পাই, সালিশ হবে থানার মাধ্যমে। আমার কাছে ডকুমেন্ট আছে, থানায় বইসা সালিশ হবে।’
তিনি বলেন, ‘আমি প্রথমে থানায় যেতে দ্বিমত প্রকাশ করি, যা হওয়ার হয়ে গেছে, যদি তোমার কোন কথা থাকে বলো, আমি দেখি কী করতে পারি। না, তোর থানায় যেতেই হবে। ওই দিকে তারা ফোনে হয়তো কারো সাথে যোগাযোগ করতেছিল তাদের একজনের (সাথে)…। সে বলল, না না, ভাই বলছে থানায় নিয়ে যেতে। এরপর আমাকে থানায় নিয়ে গেল। ওসি সাহেব ছিলেন না, ওসি তদন্তের রুমে বসছি। উনি বলল যে, আমি ওর কাছে টাকা-পয়সা পাই, আমরা থানার মাধ্যমে সালিশ করতে চাই। ওসি তদন্ত বলল যে, আমার কাছে তো কোন অভিযোগ নাই, অভিযোগ ছাড়া আমি কার সাথে সালিশি করব? বলল যে, আমি অভিযোগ দেবো। তো উনি আমাকে বসাইয়া রাইখা উনি অভিযোগ দিল। অভিযোগ দেওয়ার পরে পাঁচ তারিখে, অর্থাৎ আজকে সালিশের ডেট হইছে রাত আটটায়।’
থানায় পুনরায় মব হতে পারে ভয়ে তার ওপর হওয়া নির্যাতনের কথা থানায় প্রকাশ করেননি বলেও জানান ভুক্তভোগী। বলেন, ‘এই যে আমার রুমে মব হইছে বা যে জোরপূর্বক ছয়-সাতজন এসে… ওখানে আমি কিছুই ব্যক্ত করি নাই। কারণ আমার জীবনের নিরাপত্তা ছিল না। আমি যদি ওখানে বলতাম, তারা থানায়ও হয়তো আমাকে মব করত। সেই ভয়ে আমি ওখানে কিছু বলি নাই।
এ ঘটনায় ভেঙে পড়েন জানিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বলেন, ‘আমি তিন-চারদিন এক প্রকার বিমর্ষ অবস্থায় ছিলাম। এমন ঘটনা, ন্যাক্কারজনক ঘটনা আমি কাউকে জানাইতে পারতেছিলাম না, ভয় পাইতেছিলাম। সর্বশেষ এক বড় ভাই, আত্মীয়— আমি তার শরণাপন্ন হইলাম। সে বলল যে, সালিশ-টালিশ যাই হোক, যেহেতু চেক নিছে, স্ট্যাম্প নিছে, তুমি আগে মামলায় যাও।’
চাঁদার কারণেই এমন নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয়েছে বলেও উল্লেখ করেছেন এই ভুক্তভোগী। বলেন, ‘আমার কাছে তার কোন লেনদেন নাই। সে আমার ব্যবসার সাথে ছিল ঠিকই, কিন্তু সেটা তিন বছর আগে। তার সাথে আমার লেনদেন ক্লিয়ার হয়ে গেছে।’
এ বিষয়ে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের (বিএমপি) উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর) মোহাম্মদ ইমদাদ হুসাইন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আসলে তাদের ভিতরে একটা দ্বন্দ্ব ছিল। একটা ডেভেলপার কোম্পানি তারা নিজেরা চালাত, তাদের ভিতরে আর্থিক ঝামেলা ছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে ঘটনাটা ঘটে থাকতে পারে। আমরা নিবিড়ভাবে এটা খতিয়ে দেখছি এবং যারা এটার সাথে জড়িত, যে হামলায় অংশগ্রহণ করেছে, অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। খুব দ্রুতই আপনারা এর ফলাফল দেখতে পাবেন বলে আশা করছি।’













































