প্রচ্ছদ সারাদেশ ৭ মাত্রার ভয়াবহ শক্তিশালী ভূমিকম্প!

৭ মাত্রার ভয়াবহ শক্তিশালী ভূমিকম্প!

দিনটি ছিল মুসলমানদের ঈদুল ফিতর ও হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের রথযাত্রার দিন। ঈদের আনন্দের মাঝেই সকাল সাড়ে ছয়টা নাগাদ ৭ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল বর্তমান বাংলাদেশের মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া-বালিয়াটির নিকটবর্তী একটি স্থানে।

ভূমিকম্পটি ছিল ১৮৮৫ সালের ১৪ জুলাই তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে সংঘটিত একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প। এটি ১৮৮৫ এর বাংলার ভূমিকম্প, বেঙ্গল ভূমিকম্প বা মানিকগঞ্জ ভূমিকম্প নামে পরিচিত।ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল বর্তমান বাংলাদেশের মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া-বালিয়াটির নিকটবর্তী একটি স্থানে। উৎপত্তিস্থলে রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৭।

ভূমিকম্পটি ভূ-বিচ্যুতিরেখা বরাবর সিরাজগঞ্জ, পাবনা, ময়মনসিংহ, শেরপুর, ঢাকায় সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়। পশ্চিমে ছোট নাগপুর, পূর্বে আসাম, মণিপুর, বার্মা ও উত্তরে সিকিম-ভুটানেও ভূমিকম্প অনুভূত হয়।

মূল ভূমিকম্পের পূর্বে ১৮৮৫ সালের ২৫ জুন কলকাতা ও দার্জিলিং থেকে ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার খবর জানা যায়, যাকে মূল ভূমিকম্পের “ফোরশক” হিসেবে গণ্য করা হয়।

১৪ জুলাইয়ের মূল ভূমিকম্পের পরে ডিসেম্বর নাগাদ অনেকগুলো ছোট ছোট ভূমিকম্প (আফটারশক) অনুভূত হয়। ২১ জুলাই থেকে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১১টি ভূকম্পন নথিবদ্ধ করা হয়। এর মধ্যে ২৪ জুলাইয়ের অনুভূত ভূকম্পনটি ছিল তুলনামূলক শক্তিশালী। এই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৬ এবং উৎপত্তিস্থল ছিল বগুড়া জেলায়। ভূগর্ভস্থ “যমুনা ফাটল” বা মধুপুর চ্যুতিকে এই ভূমিকম্পের জন্য দায়ী করা হয়।

ভূমিকম্প ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও ঢাকা অঞ্চলে সবচেয়ে অনুভূত হয়, ফলে এই অঞ্চলে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানীর পরিমাণ ছিল বেশি। এছাড়া বগুড়া জেলাতেও গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়। ময়মনসিংহ জেলার শেরপুর শহর ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়। শহরের ১০০টির মতো দালান বিধ্বস্ত হয় এবং ৩৫ জন মানুষ মারা যান। এছাড়া আজিমগঞ্জ নামের একটি স্থানে ১১ জনসহ ঢাকা, বগুড়া ইত্যাদি স্থানে মোট ৭৫ জনের প্রাণহানি ঘটে।

ভূমিকম্প সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্তের অন্যতম ছিল তৎকালীন পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জ শহর। শহরের ইট-নির্মিত দালানকোঠার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। শহরের একটি পাটকলের চিমনি গুড়িয়ে যায়। তবে ঈদের ছুটি চলায় এই ঘটনায় কোনো প্রাণহানি ঘটেনি। তবে কিছু বাড়িঘর ধ্বসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

সিরাজগঞ্জের কয়েকটি জায়গায় মাটিতে ফাটল দেখা যায় এবং ফাটল থেকে বালুমিশ্রিত ভূগর্ভস্থ পানি উৎসরিত হয়। বগুড়া শহরের কাচারি, সার্কিট হাউজসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শহরে দাপ্তরিক কাজকর্ম পরিচালনার জন্য অস্থায়ী তাবু স্থাপন করা হয়।

মধুপুর গড় অঞ্চলে সংগঠিত ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল বাংলাদেশের বর্তমান রাজধানী ঢাকা থেকে ৫০ কিলোমিটারের ভেতর। ঢাকা শহরের মতো ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলের কাছাকাছি এর উপকেন্দ্রের অবস্থান এবং শক্তিমাত্রা বর্তমানে বাংলাদেশের ভূমিকম্প ঝুঁকির মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ। ১৮৯৭ সালে আসাম ভূমিকম্প পূর্ব বাংলার ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলে। ফলে এই ধরনের শক্তিশালী ভূমিকম্প আবার সংঘটিত হলে ঢাকাসহ এই অঞ্চলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

মার্কিন ভূতত্ত্ব জরিপ বিভাগের জন ডব্লিউ হুইটনির মতে, পূর্ব ভারতীয় পাতের সীমায় প্রতি ১৩৫ বছরের চক্রে একটি প্রবল অথবা সাতটি শক্তিশালী ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। পাশাপাশি মধুপুর গড় অঞ্চলে সংঘটিত ১৮৮৫ এর ভূমিকম্পের পর ১৩০ বছরের চক্রে আরেকটি একইরকম কিংবা এরচেয়েও বড় মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পের সম্ভাবনা রয়েছে।