
ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ শেখ শাহরিয়ার বিন মতিনের বাবা মোহাম্মদ আব্দুল মতিনের দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, শহীদ ছেলের পরিবারের জন্য সরকারের দেওয়া অনুদানের অর্থ ব্যবহার করে প্রায় সোয়া পাঁচ লাখ টাকার স্বর্ণালংকার কিনে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন তিনি।
শহীদের টাকায় দ্বিতীয়বার মেহেদী মাখা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন আব্দুল মতিন। তার দাবি, নিজের উপার্জনের টাকায় তিনি বিয়ে করেছেন এবং প্রথম স্ত্রীর সম্মতি নিয়েই দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন।
জানা গেছে, মোহাম্মদ আব্দুল মতিন (৫০) ঢাকার মতিঝিলে আলফা গ্রুপের একটি শাখায় সেলস ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত। তার প্রথম স্ত্রী মমতাজ বেগম (৪৫)। উপজেলার মাইজবাগ ইউনিয়নের কুমড়াশসন গ্রামের এই দম্পতির একমাত্র ছেলে শেখ শাহরিয়ার বিন মতিন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হন। এছাড়া তাদের ১০ বছর বয়সী একটি কন্যাসন্তান রয়েছে।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০০৪ সালের ৭ নভেম্বর আব্দুল মতিন ও মমতাজ বেগমের বিয়ে হয়। দীর্ঘ ২২ বছরের দাম্পত্য জীবনের পর স্বামীর দ্বিতীয় বিয়েকে কেন্দ্র করে তাদের সম্পর্কে চরম বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় গত বছরের ১৮ জুলাই ঢাকার মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সময় গুলিবিদ্ধ হন শেখ শাহরিয়ার বিন মতিন। গুলি তার ডান চোখের পাশ দিয়ে মাথা ভেদ করে বেরিয়ে যায়। পরে ২০ জুলাই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
অভিযোগ রয়েছে, চলতি বছরের ২৯ মে শহীদ পরিবারের জন্য পাওয়া সরকারি অনুদানের অর্থ থেকে ৭ লাখ টাকার কাবিন এবং প্রায় সোয়া পাঁচ লাখ টাকার স্বর্ণালঙ্কার দিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেন আব্দুল মতিন।
এ ঘটনার পর পারিবারিক বিরোধ আরও তীব্র আকার ধারণ করে। অভিযোগ অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিয়ের খবর জানার পর গত ২ জুন মেয়ে শেখ মুমতাহিনা বিনতে মতিনকে (স্মাইল) নিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন মমতাজ বেগম। তবে পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি টের পেয়ে তাকে নিবৃত্ত করেন। এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, শহীদ শাহরিয়ারের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম ও আর্থিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টার সঙ্গে আব্দুল মতিন জড়িত ছিলেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এলাকায় তার আগের মতো প্রভাব বা দাপট আর দেখা যায় না বলেও দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
শহীদ শাহরিয়ারের মা মমতাজ বেগম বলেন, ‘সন্তান হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতেই পারিনি। এর মধ্যেই আমার অনুমতি ছাড়াই আব্দুল মতিন দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। তিনি দাবি করছেন আমি নাকি তাকে অনুমতি দিয়েছি, কিন্তু সেটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমার জানামতে, তার নিজের সামর্থ্যে এত দামি স্বর্ণালংকার কেনা সম্ভব নয়। আমার শহীদ ছেলের রক্তের দাগ শুকানোর আগেই সরকারের দেওয়া অনুদানের টাকার ওপর ভর করে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘শহীদ শাহরিয়ারের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর পর থেকেই তিনি আমাকে দ্বিতীয় বিয়ের জন্য চাপ দিতে থাকেন। বারবার বলতেন, ‘বংশ রক্ষার জন্য আমাকে দ্বিতীয় বিয়ে করতেই হবে।’ কিন্তু আমি কখনোই এতে সম্মতি দিইনি।’
মমতাজ বেগমের অভিযোগ, আমার ছেলের শহীদ হওয়ার ঘটনাকে পুঁজি করে আব্দুল মতিন নানা ধরনের প্রতারণা ও ধান্ধাবাজির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। আমি তাকে বহুবার নিষেধ করেছি, কিন্তু তিনি শোনেননি। তার দুই সংসার চালানোর মতো আর্থিক সক্ষমতাও নেই।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, শহীদ পরিবারের জন্য সরকারের বরাদ্দ দেওয়া ৩০ লাখ টাকা উত্তোলনের জন্য আমার স্বাক্ষর জাল করার চেষ্টা করা হয়েছিল। আমি সতর্ক থাকায় সেটি সফল হয়নি। এছাড়া শহীদ ছেলের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার চেষ্টাও করেছেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমার এখন একটাই চাওয়া আমার মেয়েটিকে মানুষ করে যেতে চাই। একই সঙ্গে এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে শহীদ শাহরিয়ারের বাবা মোহাম্মদ আব্দুল মতিন বলেন, ‘বংশ রক্ষার স্বার্থে, বিশেষ করে আমার মায়ের অনুরোধে আমি দ্বিতীয় বিয়ে করেছি। বিয়ের আগে আমার প্রথম স্ত্রীও এতে সম্মতি দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন তিনি সেই বিষয়টি অস্বীকার করছেন। আমি আলফা গ্রুপের মতিঝিল শাখায় সেলস ম্যানেজার হিসেবে চাকরি করি। বিয়ে করার মতো আর্থিক সামর্থ্য আমার রয়েছে। ছেলের অনুদানের টাকা দিয়ে বিয়ে করেছি- এ ধরনের অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।’
আব্দুল মতিনের দাবি, দ্বিতীয় বিয়ের পর তিনি পাঁচবার প্রথম স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু স্ত্রী ও মেয়ের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাননি। সর্বশেষ অন্য একজনের সহায়তায় বাড়িতে প্রবেশ করলেও তাকে অপমান করে বের করে দেওয়া হয়। বর্তমানে বিষয়টি পারিবারিকভাবে সমাধানের চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে জুলাই সমন্বয়ক ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট ময়মনসিংহ জেলা শাখার সভাপতি আব্দুল্লাহ আল নাকিব বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে আমি শুনেছি। যদি প্রথম স্ত্রীর সম্মতি ও পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে বিয়েটি হতো, তাহলে সেটি বেশি গ্রহণযোগ্য হতো। আইন ও ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী একজন পুরুষ একাধিক বিয়ে করতে পারেন। তবে এমন সিদ্ধান্ত এমনভাবে নেওয়া উচিত, যাতে পরিবারের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং কোনো বিতর্কের সৃষ্টি না হয়। বিশেষ করে একজন জুলাই শহীদের পরিবারের ক্ষেত্রে এমন কোনো কাজ করা উচিত নয়, যাতে শহীদদের সম্মান ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ময়মনসিংহের আহ্বায়ক আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, একজন জুলাই শহীদের বাবা হিসেবে মতিন সাহেবের এমন সিদ্ধান্ত আমাদের গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, এই সিদ্ধান্ত মোটেও সমীচীন হয়নি। শহীদ পরিবারের প্রতি মানুষের যে সম্মান, আবেগ ও প্রত্যাশা রয়েছে, এ ধরনের পদক্ষেপ তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আমি এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল ও সংবেদনশীল আচরণের প্রত্যাশা করি।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কারী (শহীদ ও আহত সেল) আল নূর আয়াস বলেন, জুলাই শহীদ শাহরিয়ার বিন মতিনের বাবার দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টি শুনেছি। বিষয়টি আমাদের কাছে অত্যন্ত দুঃখজনক এবং মেনে নেওয়া কঠিন। আমার বিশ্বাস, যদি তিনি ছেলের স্মৃতি ও পরিবারের প্রতি আরও দায়িত্বশীল থাকতেন, তাহলে এমন সিদ্ধান্ত নিতেন না।













































