
কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তের নাফ নদের ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য। সেখানে গড়ে উঠেছে মাদক তৈরির কারখানা। সেখান থেকে বাংলাদেশে আসছে মাদকের চালান। নাফ নদী দীর্ঘদিন ধরেই পাচারের অন্যতম রুট হিসেবে পরিচিত। এরই মধ্যে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে পাচার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির মধ্যেও নিত্যনতুন কৌশলে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথের মতো মাদক নিয়ে আসছে পাচারকারীরা।
তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নিয়মিত বাহক ও খুচরা কারবারিরা গ্রেফতার হলেও পাচার চক্রের মূল নিয়ন্ত্রক ও প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকরা থাকছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে সীমান্তে মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার হলেও থামছে না পাচার; বরং নতুন নতুন রুট ও কৌশলে বিস্তৃত হচ্ছে পাচারের নেটওয়ার্ক।
এমন বাস্তবতায় জাতীয় সংসদে সরব হয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঢাকা-৩ আসনের সংসদ সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি কারাগারে যাওয়ার পর টেকনাফ সীমান্তে মাদক কারবারের ‘দায়িত্ব’ এখন কার হাতে রয়েছে।
শনিবার জাতীয় সংসদে বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে বিষয়টি তুলে ধরেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের উদ্দেশে প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি কারাগারে যাওয়ার পর টেকনাফ সীমান্তে মাদক কারবারের দায়িত্ব এখন কে নিয়েছে? দেশে মাদকের সবচেয়ে বড় চালান আসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এলাকার আশপাশ দিয়ে। আগে শুনতাম বদি, এখন তো বদি নেই। এখন ওখানকার দায়িত্বটা কে নিয়েছে? বাড়ির আশপাশের লোক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তো চেনার কথা। কক্সবাজার-টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে এতদিনে মাদক আসা বন্ধ হওয়া উচিত ছিল। শুধু আইন করলেই হবে না, আইন কার্যকর করতে সাহস, সততা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।’
আবদুর রহমান বদি কক্সবাজার-৪ (টেকনাফ-উখিয়া) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য। গয়েশ্বর রায়ের বক্তব্যের পর সীমান্ত দিয়ে মাদক পাচার এবং তা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে ২৭১ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। এর মধ্যে স্থলসীমান্ত রয়েছে ১৮৭ কিলোমিটার। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, আলীকদম, লামা ও থানচির সঙ্গে রয়েছে এই সীমানা। এর বাইরে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার সঙ্গে মিয়ানমারের জলসীমা রয়েছে ৮৪ কিলোমিটার।
নতুন করে নেটওয়ার্ক গড়ছে প্রভাবশালী চক্র
সীমান্তের বাসিন্দা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আবারও টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে সংঘবদ্ধ মাদক সিন্ডিকেট। সারা দেশে ইয়াবার সরবরাহ সচল রাখতে একটি প্রভাবশালী চক্র নতুন করে নেটওয়ার্ক বিস্তারে কাজ করছে। এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা মিয়ানমার থেকে বড় চালান এনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সুসংগঠিত রুট ও পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।
জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, টেকনাফ সীমান্তে মাদকের কারবার টিকে থাকার পেছনে কয়েকটি বড় কারণ আছে। এর মধ্যে দুর্গম সীমান্ত, সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট, প্রভাবশালীদের পৃষ্ঠপোষকতা, সীমান্তবর্তী জনপদের ভৌগোলিক সুবিধা এবং দ্রুত লাভের প্রলোভন উল্লেখযোগ্য। মাদকবিরোধী অভিযানে লাখ লাখ পিস ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদক উদ্ধার হচ্ছে, গ্রেফতারও হচ্ছে অনেকে। তবুও থামছে না পাচার।
অর্ধশতাধিক রুটে মাদক পাচার
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, অর্ধশতাধিক রুট ব্যবহার করে এখনও বাংলাদেশে মাদক প্রবেশ করছে। নাফ নদী, পাহাড়ি পথ, ছড়া, উপকূলীয় এলাকা, মাছ ধরার ট্রলার এবং দুর্গম সীমান্ত করিডরকে কাজে লাগিয়ে সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটগুলো মাদকের চালান দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে দিচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শাহপরীর দ্বীপ, সাবরাং, টেকনাফ সদর, বাহারছড়া, হ্নীলা ও হোয়াইক্যং ইউনিয়নের অসংখ্য সীমান্ত পয়েন্ট দীর্ঘদিন ধরে মাদক পাচারের করিডর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। রাতের অন্ধকার, প্রতিকূল আবহাওয়া, নদীপথ, মাছ ধরার ট্রলার, পাহাড়ি ছড়া ও দুর্গম জনপদকে কাজে লাগিয়ে সংঘবদ্ধ চক্রগুলো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাদকের চালান পৌঁছে দিচ্ছে। বিশেষ করে শাহপরীর দ্বীপের পশ্চিমপাড়া, মিস্ত্রিপাড়া, জালিয়াপাড়া ও ঘোলারচর; সাবরাংয়ের খুরেরমুখ, আচারবনিয়া ও নোয়াপাড়া বেড়িবাঁধ; টেকনাফ সদর ইউনিয়নের কেরনতলী, মহেশখালীয়াপাড়া, তুলাতুলী, রাজরছড়া ও মিঠাপানির ছড়া; বাহারছড়ার নৌয়াখালীপাড়া, বড় ডেইল, মাথাভাঙ্গা, শীলখালী ও মারিশবনিয়া এলাকাকে মাদক প্রবেশের অন্যতম রুট। এ ছাড়া হ্নীলা ইউনিয়নের জাদিমুড়া, লেদা, চৌধুরীপাড়া, ফুলের ডেইল, ওয়াব্রাং, আনোয়ার ফিশারিজ প্রকল্প এলাকা ও মৌলভীবাজার এবং হোয়াইক্যং ইউনিয়নের হারাংখালী, মিনাবাজার, উলুচামরি, ঝিমংখালী, উংচিপ্রাং, বাজারপাড়া ও নয়াবাজারসহ বেশ কয়েকটি সীমান্তবর্তী এলাকা দীর্ঘদিন ধরে মাদক পাচার হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্তজুড়ে একাধিক সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। এসব চক্রের বিরুদ্ধে মাদক, অস্ত্র, অপহরণ, ডাকাতি ও হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ থাকলেও প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষক ও শক্তিশালী নেটওয়ার্কের কারণে অনেক ক্ষেত্রে তারা আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যায়। ফলে গ্রেফতার হয় মূলত বাহক ও ছোট সদস্যরা, আর সিন্ডিকেটের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিরা থেকে যায় আড়ালে।
নৌপথ ও মেরিন ড্রাইভে সক্রিয় পাচার চক্র
টেকনাফ পৌরসভার কায়ুকখালী, শাহপরীর দ্বীপের নৌঘাট এবং মেরিন ড্রাইভ সড়কসংলগ্ন বিভিন্ন নৌপথ ব্যবহার করে মাছ ধরার আড়ালে নানা কৌশলে মাদকের চালান সাগর ও নদীপথে দেশে প্রবেশ করছে। এ কাজে কিছু রোহিঙ্গা জেলে ও স্থানীয় জেলের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, বড় বড় কারবারিরা এসব পয়েন্টকে তুলনামূলক নিরাপদ করিডর হিসেবে ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ মাদক দেশে প্রবেশ করায়। পরে তা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করে। নিত্যনতুন কৌশল অবলম্বন করে মাদক নিয়ে আসছে পাচারকারীরা। নিজেদের নিরাপদ রাখতে মাদক পাচারকারীরাও এখন ড্রোনসহ আধুনিক প্রযুক্তি এবং অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, গ্রেফতারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে বর্তমানে আরাকান আর্মির সহযোগিতায় বাংলাদেশে ইয়াবা পাচার চলছে। ইয়াবা এনে হুন্ডির মাধ্যমে এর মূল্য পরিশোধ করা হয়। অনেক সময় মূল্য হিসেবে বাংলাদেশ থেকে চোরাইপথে ওষুধ, খাদ্যসামগ্রীসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পাঠানো হচ্ছে।
ধরাছোঁয়ার বাইরে মূলহোতারা
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানান, মাদক পরিবহনের ক্ষেত্রে কারবারিরা প্রায়ই বিলাসবহুল প্রাইভেটকারসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন ব্যবহার করে থাকে। সম্প্রতি কোস্টগার্ডের একাধিক অভিযানে কয়েকটি যানবাহনসহ বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার হয়। তবে মূলহোতারা ধরা পড়ে না। প্রভাবশালী মাদক সিন্ডিকেটের সদস্যরা সাধারণত আড়ালে থেকে মোবাইল ফোন ও অন্যান্য যোগাযোগমাধ্যমের সহায়তায় পুরো কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে মাঠপর্যায়ের সদস্যরা গ্রেফতার হলেও মূল পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট নৌঘাট, উপকূলীয় এলাকা ও মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন রুটগুলোতে নজরদারি বৃদ্ধি, গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার এবং মাদক সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয় দুজন মাদক কারবারির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ইয়াবার বড় চালানের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনও টেকনাফের হ্নীলা ও হোয়াইক্যং সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে আসে। এর সঙ্গে জড়িত কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতা। ছোট ছোট মাদক কারবারিদের ব্যবহার করে নিজেদের কার্যক্রম চালাচ্ছে বড় কারবারিরা। ফলে মাদকের বাহক গ্রেফতার হলেও সবসময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে মূলহোতা।
মাদক উদ্ধারের পরিমাণ বেড়েছে
সীমান্তে নিয়োজিত বাহিনী বিজিবির তথ্য বলছে, চলতি বছরে মাদক উদ্ধারের পরিমাণ আগের তুলনায় বেড়েছে। তবে অভিযানে মাঠপর্যায়ের মাদক কারবারিরা ধরা পড়লেও মূলহোতারা গ্রেফতার হয়নি।
বিজিবি জানায়, ২০২৫ সালে সীমান্তে অভিযান চালিয়ে ১ কোটি ৪৩ লাখ ৯২ হাজার ৯৯৩টি ইয়াবা উদ্ধার করে বিজিবি, যার আনুমানিক মূল্য ৪৩২ কোটি টাকা। তবে ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত প্রথম ৬ মাসেই উদ্ধার হয়েছে ১ কোটি ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৫০৩টি ইয়াবা, যার বাজারমূল্য ৩১৭ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে মাদকসহ ৭৮৪ জনকে গ্রেফতার করে বিজিবি। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ৪৩৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়।
জলসীমা ও উপকূলে প্রায়ই মিয়ানমার থেকে আনা মাদকের চালান ধরা পড়ে কোস্টগার্ডের অভিযানে। কোস্টগার্ড জানিয়েছে, উপকূলীয় অঞ্চলে অভিযান চালিয়ে গত দেড় বছরে ৪৩ লাখের বেশি ইয়াবা এবং সোয়া ৫ কেজি ক্রিস্টাল মেথ উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় ১৯৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়।
উদ্ধার-গ্রেফতারেও কেন থামছে না পাচার
কোস্টগার্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত পরিচালিত বিভিন্ন অভিযানে কক্সবাজার জেলায় মোট ৪৩ লাখ ২১ হাজার ৮৬৪ পিস ইয়াবা, ৫ দশমিক ২৫০ কেজি আইস, ৪০ দশমিক ৩ কেজি গাঁজা এবং ৬৩ বোতল বিদেশি মদ উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ১৯৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়।
বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধারের পরও সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশের চেষ্টা অব্যাহত থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক তালিকায় কক্সবাজার জেলার ১ হাজার ১৫১ জন মাদক কারবারির নাম উঠে এসেছে, যার মধ্যে ৯১২ জনই টেকনাফের বাসিন্দা। তালিকাভুক্ত শীর্ষ ৭৩ ইয়াবা কারবারির মধ্যে ৬৫ জনের অবস্থানও টেকনাফে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, তালিকাভুক্তদের বাইরে গত কয়েক বছরে নতুন করে আরও অনেক ব্যক্তি ও সংঘবদ্ধ চক্র মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছে, যাদের বড় অংশ এখনও শনাক্তের বাইরে রয়ে গেছে।
মূলহোতারা গ্রেফতার না হওয়ায় পাচার থামছে না
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্যসচিব এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেন, ‘একসময় সীমান্তের মাদক কারবারের সঙ্গে সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত ছিল। বর্তমানে তিনি কারাগারে। তাহলে এখন সীমান্ত দিয়ে মাদকের বড় বড় চালান কারা নিয়ন্ত্রণ করছে সেটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি একজন আলোচিত ব্যক্তির অনুপস্থিতিতেও মাদক পাচার অব্যাহত থাকে, তাহলে কি এর পেছনে আরও প্রভাবশালী গডফাদার বা সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে?।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রিত এলাকা ব্যবহার করে বাংলাদেশে ইয়াবার বড় চালান পাচার হচ্ছে। ইয়াবার মূল্য পরিশোধ করা হয় মূলত হুন্ডির মাধ্যমে। হুন্ডি কারবারিদেরও ধরতে হবে। ফলে বিষয়টি এখন শুধু মাদক পাচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি সীমান্তকেন্দ্রিক আন্তঃদেশীয় অবৈধ বাণিজ্য নেটওয়ার্কে রূপ নিয়েছে। তাই খুব দ্রুত সমন্বিত মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান পরিচালনা না করলে এই মরণনেশা আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।’
মূলহোতারা গ্রেফতার না হওয়ায় মাদক চোরাচালান বন্ধ হচ্ছে না বলে অভিমত সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কক্সবাজারের সভাপতি অধ্যাপক অজিত দাশের। তিনি বলেন, ‘গডফাদাররা সব সময় পর্দার আড়ালে নিরাপদেই থেকে যায়। চুনোপুঁটি গ্রেফতার হলেও মূল সিন্ডিকেট অক্ষত থাকায় মাদক ও অস্ত্রের প্রবাহ কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না।’
জেল থেকে বেরিয়ে গেছে অনেক মাদক কারবারি
কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আগের সরকারের আমলে টেকনাফে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ১০৩ জন ইয়াবা গডফাদার ও কারবারি পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। কিন্তু মাত্র দুই বছরের মাথায় আইনি ফাঁকফোকরে তারা সবাই খালাস পেয়ে যান। বর্তমানে তাদের অনেকেই আবার কারাগার থেকে বা আত্মগোপনে থেকে মাদকের চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করছেন।’
কেন বন্ধ হচ্ছে না মাদকের রুট
বিজিবির কক্সবাজারের রামু সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে আমাদের টহল ও পর্যবেক্ষণ আগের তুলনায় বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে। বিজিবি অত্যন্ত তৎপর থাকায় চোরাই পণ্য এখন বেশি ধরা পড়ছে। তবে একটি রুট বন্ধ করলে অন্য রুটে পাচার হয়। আমরা রুটগুলো নজরদারিতে রাখছি।’
এ বিষয়ে বিজিবির রামু সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা গেলে মাদক পাচার অনেকটাই কমে আসবে। তবে মাদক শুধু সীমান্তের নয়, এটি একটি সামাজিক সমস্যাও। তাই মাদক প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণও প্রয়োজন। চাহিদা থাকলে যেকোনো উপায়েই মাদক দেশে প্রবেশের চেষ্টা হবে। তাই সরবরাহ বন্ধের পাশাপাশি মাদকের চাহিদা কমানোর দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। মাঠপর্যায়ে অনেক সময় মাদক সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে, ফলে তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। তারপরও তাদের আইনের আওতায় আনতে গোয়েন্দা তৎপরতা ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’
কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বলেন, ‘উপকূলীয় অঞ্চলে নজরদারি বাড়ানোর কারণে পাচারকারীদের রুটগুলো এখন অবরুদ্ধ হয়ে পড়ছে। এজন্য বেশি ধরা পড়ছে।মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আমাদের কঠোর অবস্থান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। সীমান্ত ও উপকূলীয় অঞ্চলে নজরদারি আরও জোরদার করা হচ্ছে।’
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বলেন, ‘মাদক অধ্যুষিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করছে। গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তাদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।’












































