প্রচ্ছদ জাতীয় আয়নাঘরের দেয়ালজুড়ে স্বজনদের কান্না : হারিয়ে যাওয়া হাজারো মানুষের খোঁজে বাংলাদেশ

আয়নাঘরের দেয়ালজুড়ে স্বজনদের কান্না : হারিয়ে যাওয়া হাজারো মানুষের খোঁজে বাংলাদেশ

বাবা কোথায়?’—বিপ্লবের পরেও কাটেনি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অন্তহীন অপেক্ষা আর বিচারহীনতার যন্ত্রণা
ঢাকার ধানমন্ডিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে তৈরি ফ্যাসিবাদের জাদুঘর পরিদর্শনে যান লেখক সায়রাস নাজি। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেখানে স্থাপন করা ‘আয়নাঘর’র একটি প্রতিরূপ কক্ষের ভেতর দাঁড়িয়ে তিনি প্রত্যক্ষ করেন গুম হওয়া মানুষদের অবর্ণনীয় যাতনা। মাত্র এক মিটার চওড়া স্যাঁতসেঁতে দেয়ালজুড়ে আঁচড় কেটে লেখা নাম আর আকুতি ফিসফিসিয়ে বলছিল এক নির্মম বন্দিদশার গল্প।

২০২৪ সালের মনসুন বিপ্লবের পর শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেলে এই গোপন নির্যাতন কক্ষের ভয়াবহতা সামনে আসে। তদন্ত কমিশন এ পর্যন্ত প্রায় ১,৬০০টি গুমের ঘটনা নিশ্চিত করেছে, তবে প্রকৃত সংখ্যা ৪,০০০ থেকে ৬,০০০ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

page-top-ad

ঢাকার উপকণ্ঠে শীতলক্ষ্যা নদী হয়ে উঠেছে বহু ভুক্তভোগীর গণকবর, যেখানে এলিট ফোর্স র‌্যাব লাশ গুম করত বলে অভিযোগ রয়েছে। জাতিসঙ্ঘ এই বাহিনীকে বিলুপ্ত করার আহ্বান জানালেও তা এখনো বহাল রয়েছে।

ফিনান্সিয়াল টাইমস শনিবার (২৭ জুন) জানিয়েছে, এই মানবিক বিপর্যয়কে নিজের ক্যামেরায় বন্দি করছেন ২৯ বছর বয়সী তরুণ আলোকচিত্রী ও অধিকারকর্মী মশিফুর রহমান জোহান। সায়রাস নাজিকে সেই জাদুঘর ঘুরিয়ে দেখানোর সময় জোহান আক্ষেপ করে বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর তারা ভেবেছিলেন পরিবারগুলো বিচার পাবে, কিন্তু পরিস্থিতি এখনো স্থবির।

জোহান ২০২১ সাল থেকে গুম হওয়া মানুষদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’র সাথে যুক্ত হয়ে কাজ করছেন। এই সংগঠনের অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি, যার ভাই ও তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল বিএনপির কর্মী সুমন ২০১৩ সালে নিখোঁজ হন।

তুলি জানান, গুমের শিকার কেবল একজন ব্যক্তি নন, বরং পুরো পরিবার মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে এবং শিশুরা বাবার পরিচয় না জেনেই বড় হচ্ছে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে কোনো আইনি বা প্রশাসনিক সহায়তা দেয়া হয়নি।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার নির্বাচিত হওয়ার পর গুমের বিচারের প্রক্রিয়াটি স্তিমিত হয়ে পড়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের করা গুমবিরোধী আইনটি গত এপ্রিলে বাতিল হতে দেয়া হয়েছে এবং নতুন বিল পাসের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

তদন্ত কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, এই খসড়া আইনটি নিরাপত্তা বাহিনীকে জবাবদিহিতা থেকে সুরক্ষা দিতে পারে এবং ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন সন্দেহভাজন দেশ ছেড়ে পালানোর সুযোগ পেয়েছেন।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোও এই পরিস্থিতিকে আশঙ্কাজনক বলছে। তবে মে মাসে সংসদ সদস্য হওয়া তুলি এখনো সংসদে শক্তিশালী আইন পাসের আশা রাখছেন। আর জোহান বিচারহীনতার এই চক্রে হতাশাগ্রস্ত হয়ে বর্তমানে তার কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন, কারণ স্বজনদের চোখের জল আর সান্ত্বনার কোনো ভাষা তার জানা নেই। আবারো এক অন্ধকার অধ্যায়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জোহানের মনে হচ্ছে, নদীর স্রোতের মতোই হয়তো হারিয়ে যাচ্ছে আরো অনেক স্মৃতি।