প্রচ্ছদ অপরাধ ও বিচার গ্রেপ্তারের পর নতুন করে আলোচনায় বেনজীরের সব অপকর্ম

গ্রেপ্তারের পর নতুন করে আলোচনায় বেনজীরের সব অপকর্ম

বেনজীর আহমেদ, সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে যোগদান করেন ১৯৮৮ সালে। এরপর দীর্ঘ চাকরি জীবনের শেষের দিকে পুলিশ ও র‌্যাবের সর্বোচ্চ পদের দায়িত্ব পালন করেছেন। এই সময়ের মধ্যে ক্ষমতার অব্যবহার করে গড়ে তোলেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়। তার বিরুদ্ধে রয়েছে অসংখ্য অভিযোগ। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তার নানা অপকর্ম প্রকাশ হয়। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে সত্যতা নিশ্চিত হয়। এরপর একে একে তার অবৈধ সম্পদ ও দুর্নীতির নানা তথ্য বের হতে থাকে। শুধু তাই নয় তার পরিবারের সদস্যদেরও বিপুল সম্পদের খোঁজ পায় দুদক।

দুদকের অনুসন্ধানের মধ্যে ২০২৪ সালের ৪ মে সপরিবার দেশ ছাড়েন বেনজীর। তার দেশ ত্যাগের পরও আইনি প্রক্রিয়া চলতে থাকে। এরমধ্যে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের কাছে রেড নোটিশ জারি করতে আবেদন করে বাংলাদেশ পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি)। নোটিশও জারি করা হয়। ওই পরোয়ানার প্রেক্ষিতে দুবাইয়ে ইন্টারপোলের সহযোগিতায় দুবাই পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছে।

এদিকে, বেনজীরের গ্রেপ্তারের খবরে তার অবৈধ সম্পদ, লুটপাট, দখলসহ বিভিন্ন অপকর্মের কথা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা : বেনজীরের বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। ২০১৫-২০ সাল পর্যন্ত র‍্যাবের মহাপরিচালক এবং পরে আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের সঙ্গে তার জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে ২০২১ সালে র‍্যাব এবং বেনজীর আহমেদসহ কয়েকজনের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট। ওই সময় ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট উল্লেখ করে, ২০০৯ সাল থেকে ৬০০-এর বেশি গুম এবং ২০১৮ সাল থেকে প্রায় ৬০০ বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে র‍্যাবের বিরুদ্ধে।

জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ : দুদকের দেওয়া চার্জশিট অনুযায়ী, বেনজীরের প্রায় ১১ কোটি ৪ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের প্রমাণ পাওয়া গেছে। সম্পদ বিবরণীতে তিনি ৬ কোটি ৪৫ লাখ টাকার স্থাবর ও ৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পদ দেখিয়েছিলেন। কিন্তু দুদকের তদন্তে স্থাবর ৭ কোটি ৫২ লাখ এবং অস্থাবর ৮ কোটি ১৫ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য বেরিয়ে আসে, যা ঘোষণার চেয়ে অনেক বেশি। এ ছাড়া নিজের মেয়ে জাহরা জাবিন বিনতের সম্পদও তিনি সম্পদ বিবরণীতে গোপন করেছিলেন।

অর্থ পাচার : অবৈধ আয়ের উৎস ও মালিকানা গোপন করতে বেনজীর আহমেদ বিভিন্ন ব্যাংক, ব্যবসা ও যৌথ মূলধনি প্রতিষ্ঠানে অর্থ বিনিয়োগ এবং স্থানান্তর করেছেন। স্ত্রী জিসান মির্জার নামে দুবাইয়ে ১ কোটি ৪ লাখ ৭৯ হাজার দিরহাম মূল্যের দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কেনা হয়েছে। এ ছাড়া সেখানকার দুটি ব্যাংক হিসাবে ১ লাখ ৬২ হাজার দিরহাম পাওয়া গেছে। এসব সম্পদ জব্দ ও হিসাব অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দেন আদালত।

শুধু দুবাই নয়, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও যুক্তরাজ্যে তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ও বিনিয়োগের তথ্য চেয়ে ‘মিউচুয়াল লিগ্যাল রিকোয়েস্ট’ (এমএলআর) পাঠিয়েছে দুদক।

ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, জমি, ফ্ল্যাটের ছড়াছড়ি : আদালত ইতোমধ্যে বেনজীর ও তার পরিবারের নামে থাকা ৬২১ বিঘা জমি, ১৯টি কোম্পানির শেয়ার, ব্যাংক হিসাব ও বিও (বেনিফিশিয়ারি ওনার্স) হিসাব জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৩ সালের ৫ মার্চ একদিনেই ঢাকার গুলশানের ‘র‍্যাংকন আইকন টাওয়ারে’ চারটি ফ্ল্যাট কেনেন তিনি। ৯ হাজার ১৯২ বর্গফুটের এসব ফ্ল্যাটের দাম দেখানো হয় মাত্র ২ কোটি ১৯ লাখ টাকা, যা বাজারদরের তুলনায় অস্বাভাবিক রকম কম। সরকারি চাকরিজীবী হওয়া সত্ত্বেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো অনুমোদন ছাড়াই তিনি এসব ব্যবসা ও সম্পদ করেছেন।

জমি দখল : মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জে ‘সাভানা ইকো রিসোর্টের’ নামে প্রায় ৬০০-৬২১ বিঘা জমি কেনা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এলাকার বেশ কয়েকটি সংখ্যালঘু হিন্দু পরিবারকে ভয় দেখিয়ে ও জোর করে এসব জমি বিক্রি করতে বাধ্য করা হয়। এ ছাড়া গাজীপুরের কালীগঞ্জেও হিন্দু ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের জমি কম দামে কেনা এবং ভয় দেখানোর অভিযোগ নিয়ে দুদক কাজ করছে বলে জানা গেছে।

ইসিএ এলাকায় জমি : সাভানা রিসোর্টের প্রাথমিক পরিবেশ ছাড়পত্রের মেয়াদ শেষ হলেও চূড়ান্ত ছাড়পত্রের কোনো আবেদন করেননি বেনজীর। এমনকি রিসোর্টের কাজ তদারকির জন্য পুলিশ ও র‍্যাব সদস্যদের ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে। সাবেক আইজিপি নুর মোহাম্মদ এ বিষয়ে বলেছিলেন, ব্যক্তিগত কাজে পুলিশের ব্যবহার সম্পূর্ণ অপরাধমূলক।

এ ছাড়া পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) সেন্ট মার্টিনে ১ দশমিক ৭৫ একর এবং কক্সবাজারের ইনানী সৈকতের কাছে স্ত্রী-কন্যাদের নামে ৭২ শতক জমি কিনেছেন সাবেক এই আইজিপি।

দুদকের মামলা : ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর দুদকের পক্ষ থেকে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপনের অভিযোগে বেনজীর ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।

অভিযোগপত্র বা চার্জশিট : দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে দুদক। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেনজীর তার দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ গোপন করেছেন এবং তার নামে অন্তত ১১ কোটি ৪ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ পাওয়া গেছে।

আদালতের পরোয়ানা : অভিযোগপত্র গ্রহণের পর চলতি বছরের মার্চ মাসে ঢাকার একটি বিশেষ আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। এরপর মে মাসে তার অনুপস্থিতিতেই আদালতে অভিযোগ গঠন করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা : ২০২১ সালের ডিসেম্বরে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ও ট্রেজারি বিভাগ র‍্যাবের সাবেক ও বর্তমান ৭ কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, যার মধ্যে বেনজীর আহমেদের নামও ছিল।

বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুলিশের আইজি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) মহাপরিচালক এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সূত্র :কালবেলা