প্রচ্ছদ জাতীয় ঐক্যের বদলে বিভাজন, বিএনপির রাজনীতিতে নতুন সংকট

ঐক্যের বদলে বিভাজন, বিএনপির রাজনীতিতে নতুন সংকট

দীর্ঘদিন ধরে পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকায় ফ্রান্স বিএনপিতে হতাশা, ক্ষোভ ও বিভক্তি ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। একসময় প্রবাসে বিএনপির অন্যতম শক্তিশালী ইউনিট হিসেবে পরিচিত সংগঠনটি বর্তমানে নেতৃত্ব সংকট, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং সাংগঠনিক অচলাবস্থার মধ্য দিয়ে সময় পার করছে। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, বছরের পর বছর অপেক্ষার পরও নতুন কমিটি গঠন না হওয়ায় সংগঠনের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে এবং নেতাকর্মীদের মধ্যে অনাস্থা ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

২০১৪ সালে সৈয়দ সাইফুর রহমানকে সভাপতি এবং এম এ তাহেরকে সাধারণ সম্পাদক করে কেন্দ্র থেকে ফ্রান্স বিএনপির কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়। সে সময় ইউরোপ অঞ্চলের দায়িত্বে ছিলেন বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মাহিদুর রহমান। দীর্ঘ সময় ধরে সাইফুর রহমান ও এম এ তাহেরের নেতৃত্বে ফ্রান্স বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তাদের নেতৃত্বে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি, আন্দোলন-সংগ্রাম এবং প্রবাসী বাংলাদেশীদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে সংগঠনটি সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।

তবে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে কেন্দ্রের নির্দেশে বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও ফ্রান্স বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক আনোয়ার হোসেন খোকন বিদ্যমান কমিটি ভেঙে দেন। এরপর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়নি।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মাহিদুর রহমান দীর্ঘদিন ফ্রান্স বিএনপির সাংগঠনিক বিষয় তদারকি করতেন। তার সাথে সহযোগী হিসেবে ছিলেন বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক আনোয়ার হোসেন খোকন এবং বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার আবু সায়েম। মাহিদুর রহমান বিভিন্ন সময়ে নেতাকর্মীদের সাথে আলোচনা করে একটি গ্রহণযোগ্য কমিটি গঠনের চেষ্টা করলেও স্থানীয় পর্যায়ের অনৈক্য, গ্রুপিং ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্বের কারণে সেই উদ্যোগ সফল হয়নি।

পরবর্তীতে ফ্রান্স বিএনপির সাংগঠনিক দায়িত্ব পান সাবেক ছাত্রনেতা আনোয়ার হোসেন খোকন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত এই নেতা দায়িত্ব গ্রহণের পর সংগঠন পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিলেও স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, তার কার্যক্রম মূলত অনলাইন বৈঠক ও জুম সভার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

নেতাকর্মীদের মতে, ফ্রান্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে সাংগঠনিক সংকট নিরসনে সরাসরি মাঠপর্যায়ে এসে পরিস্থিতি মূল্যায়ন এবং সংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনা করা জরুরি ছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তাকে ফ্রান্সে এসে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ফ্রান্স বিএনপির এক সিনিয়র নেতা বলেন, আমরা প্রবাসে কষ্টার্জিত অর্থের একটি অংশ দলের জন্য ব্যয় করি। পরিবার-পরিজনের সময় থেকে সময় বের করে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নি-ই। অথচ আমাদের সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে কেন্দ্রীয় নেতারা শুধু আশ্বাস দিয়েই যাচ্ছেন। আমাদের নিয়ে আর তামাশা করা উচিত নয়।

তিনি বলেন, ‘ফ্রান্স বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মী বছরের পর বছর ধরে একটি গ্রহণযোগ্য কমিটির অপেক্ষায় রয়েছেন। কিন্তু সেই অপেক্ষার কোনো শেষ দেখা যাচ্ছে না।’

কমিটি ভেঙে দেয়ার পর রাজনৈতিক কার্যক্রম সচল রাখার লক্ষ্যে এক জুম সভায় সাবেক সভাপতি আহসানুল হক বুলুকে সমন্বয়কের দায়িত্ব দিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের নিয়ে ১৬ সদস্যের একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়। তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, অসহযোগিতা ও সমন্বয়ের অভাবে কমিটিটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।

এদিকে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর ফ্রান্সে দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভক্তি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একাধিক সূত্র জানায়, পদ-পদবি ও সাংগঠনিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব তীব্র হয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে সংগঠনের সামগ্রিক কার্যক্রমে।

সম্প্রতি কয়েকটি দলীয় কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রকাশ্য বাকবিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব ঘটনায় সাধারণ নেতাকর্মীরা যেমন বিব্রত হচ্ছেন, তেমনি সংগঠনের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

একসময় ফ্রান্স বিএনপির কর্মসূচিগুলোতে ব্যাপক নেতাকর্মীর উপস্থিতি দেখা গেলেও বর্তমানে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। বিভিন্ন জাতীয় দিবস, দলীয় কর্মসূচি ও স্মরণসভায় অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার বিষয়টি এখন দৃশ্যমান বাস্তবতা।

এরই ধারাবাহিকতায় দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকীও এবার সম্মিলিতভাবে পালন করা সম্ভব হয়নি। অতীতে এ উপলক্ষে ফ্রান্স বিএনপির সব পর্যায়ের নেতাকর্মীরা এক মঞ্চে উপস্থিত হলেও এবার সেই ঐক্যের চিত্র দেখা যায়নি।

গত ১০ জুন সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জুনেদ আহমেদের নেতৃত্বে একটি স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। তবে সেখানে সংগঠনের অনেক শীর্ষ নেতা ও কর্মীর অনুপস্থিতি বর্তমান বিভক্তির চিত্রকে আরো স্পষ্ট করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দায়িত্বশীল নেতা বলেন, ফ্রান্স বিএনপির বর্তমান অবস্থার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের নিষ্ক্রিয়তাই অনেকাংশে দায়ী। শুরু থেকেই কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেয়া হলে পরিস্থিতি এতটা জটিল হতো না।

এদিকে ফ্রান্স যুবদল নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ফ্রান্স যুবদলের সভাপতি আহমেদ মালেক বলেন, ‘কমিটি গঠনের পর একটি ইফতার মাহফিলকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অমান্য করার অভিযোগে সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদকে দল থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়।’

ফ্রান্স বিএনপির নতুন কমিটি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রবাসে দল পরিচালনার ক্ষেত্রে কেন্দ্র অনুমোদিত কমিটি ছাড়া অন্য কোনো কাঠামো কমিউনিটির কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায় না। কী কারণে কেন্দ্র কমিটির অনুমোদনে বিলম্ব করছে, তা আমার বোধগম্য নয়।’

সদ্য বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক এম এ তাহের বলেন, ‘ওয়ান-ইলেভেনের আগে ও পরে কেন্দ্রের নির্দেশনায় পরিচালিত ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে প্রবাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে ফ্রান্স বিএনপি। দীর্ঘদিন ধরে কমিটি না থাকায় নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয়েছে।’

তিনি দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফ্রান্স বিএনপির নতুন কমিটি গঠনের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের হতাশা দূর করতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান জানান।

ফ্রান্স বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি সিরাজুর রহমান বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে ফ্রান্স বিএনপির কোনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকায় নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা বিরাজ করছে।’

সাবেক সহ-সভাপতি মাহবুব আলম রাঙ্গা বলেন, ‘একটি কার্যকর কমিটি না থাকায় নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা কাজ করছে। দলীয় কর্মীদের চাঙা রাখতে কেন্দ্রের উচিত দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা।’

সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ রেজাউল করিম রেজা বলেন, ‘যোগ্য, ত্যাগী ও দলের প্রতি নিবেদিত নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়নের মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য কমিটি দ্রুত গঠন করা হলে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান হবে।’

অন্যদিকে সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জুনেদ আহমেদ বলেন, ‘ত্যাগী নেতাদের নেতৃত্ব নিশ্চিত না হলে ফ্রান্সে অবস্থানরত বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা তা মেনে নেবেন না। প্রায় তিন দশক ধরে প্রবাসে দলের দুর্দিনে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করেছি। ইউরোপের এমন কোনো দেশ নেই, যেখানে আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনে আমরা সক্রিয়ভাবে অংশ নিইনি।’

তিনি আরো বলেন, ‘দল আজ রাষ্ট্রক্ষমতায়। এ সময় বহির্বিশ্বে বিএনপির আদর্শ ও কর্মসূচি মানুষের কাছে তুলে ধরার পাশাপাশি প্রবাসীদের কাছে রাষ্ট্রের সেবা পৌঁছে দেয়ার এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। সে জন্য প্রয়োজন একটি কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব।’

ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মহিলা দল কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক শামীমা আক্তার রুবী টেলিফোনে বলেন, ‘সাংগঠনিক কার্যক্রম কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি অত্যন্ত জরুরি। পূর্ণাঙ্গ কমিটি ছাড়া কাঙ্ক্ষিত সাংগঠনিক তৎপরতা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘কমিটি গঠনে বিলম্বের কারণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট নেতৃবৃন্দই ভালো বলতে পারবেন।’

তবে সংগঠনের শৃঙ্খলা ও কার্যক্রমের স্বার্থে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

ফ্রান্স বিএনপির সাবেক সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক কবির আহমেদ জানান, তিনি ১৯৮৪ সাল থেকে বিএনপির রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। সংগঠনের শৃঙ্খলার স্বার্থে অনেক বিষয় প্রকাশ্যে বলতে চান না বলেও উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, ‘সমাজ ও সংগঠনের কার্যক্রমকে গতিশীল করতে কেন্দ্রের নির্দেশনায় একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন এখন সময়ের দাবি।’

এ বিষয়ে কেন্দ্র থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত ফ্রান্স বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক আনোয়ার হোসেন খোকনের সাথে টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ফ্রান্স বিএনপির আগামী নেতৃত্বে যাদের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক ছাত্রনেতা ও সাবেক সহ-সভাপতি মাহবুবুল আলম রাঙ্গা, সাবেক সহ-সভাপতি কবির আহমেদ পাটোয়ারী, সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম এ তাহের, সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ রেজাউল করিম রেজা, জুনেদ আহমেদ এবং সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক কবির আহমেদ।

ফ্রান্স বিএনপির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা থাকলেও অধিকাংশ নেতাকর্মীর প্রত্যাশা একটাই—দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য ও পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা। তাদের মতে, দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, বিভক্তি ও সাংগঠনিক অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে আরো সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। অন্যথায় ফ্রান্স বিএনপির সাংগঠনিক সংকট আরো গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা বিএনপির আন্তর্জাতিক সাংগঠনিক কাঠামোর জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।