প্রচ্ছদ জাতীয় বিজয়ীদের সঙ্গে ছবি তুললেও পুরস্কারের টাকা দেননি এনসিপি নেতা

বিজয়ীদের সঙ্গে ছবি তুললেও পুরস্কারের টাকা দেননি এনসিপি নেতা

আন্তঃকলেজ বিতর্ক প্রতিযোগিতা আয়োজন করে ছবি তুলে মিডিয়া কাভারেজ নিলেও পুরস্কারের টাকা দেননি জাতীয় নাগরিক পার্টির এক নেতা। ৮ মাস আগে আয়োজিত ওই প্রতিযোগিতায় বিজয়ী ও বিজিত দল টাকা চাইলে তাদের হুমকি-ধমকি দেওয়ার অভিযোগ করেছে চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ দল। দুই দলই কালবেলাকে বলেছে, পুরস্কারের টাকা নিয়ে আজ-কাল করতে করতে তিনি আমাদের দীর্ঘ ৮ মাস ধরে ঘোরাচ্ছেন। টাকা চাইতে গেলে তিনি আমাদের নম্বরগুলো ব্লক করে দিয়েছেন। তার ফেসবুকে কমেন্ট করায় আমাদের আইডিগুলোও ব্লক করে দিয়েছেন। পরে অন্য নম্বর থেকে ফোন করলে তিনি একপ্রকার ধমকের সুরে বলেন, ‘দিব না পারলেও উটাই নিস’। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ওই নেতার নাম হাজি ইউসুফ মাহমুদ তৌসিফ। তিনি এনসিপির ডেমরা থানা শাখার সদস্য সচিব।

জানা গেছে, গত বছরের নভেম্বরে ‘ইয়ুথ ফোরাম অব বাংলাদেশ’ নামের একটি সংগঠন থেকে আন্তঃকলেজ বিতর্ক উৎসব-২০২৫ শীর্ষক একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। প্রতিযোগিতার প্রতিপাদ্য ছিল— তারুণ্যের চোখে আগামীর বাংলাদেশ। ফাইনালে দারুন নাজাত সিদ্দিকিয়া কামিল মাদ্রাসা চ্যাম্পিয়ন ও দনিয়া কলেজ রানার্সআপ হওয়ার গৌরব অর্জন করে। ঘটা করে বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানও আয়োজন করা হয়। এতে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ, তৎকালীন জামায়াত নেতা ও বর্তমান ঢাকা-১৪ আসনের এমপি মীর আহমদ বিন কাসেম (ব্যারিস্টার আরমান) ও ঢাকা-৫ আসনের এমপি কামাল হোসেনসহ একাধিক জামায়াত ও এনসিপি নেতা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে বিজয়ী ও বিজিত দলের মধ্যে ৩০ হাজার ও ২০ হাজার টাকার প্ল্যাকার্ডও দেওয়া হয়। বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ দপ্তর— প্রেস ইনফরমেশন ডিপার্টমেন্ট (পিআইডি) থেকে সেই অনুষ্ঠানের ছবি তুলে তা গণমাধ্যমেও প্রচারের জন্য সরবরাহ করা হয়। পিআইডি থেকে তখন সরবরাহ করা একটি ছবির ক্যাপশনে লেখা ছিল— ‘সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ আজ ঢাকায় বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে ‘তারুণ্যের চোখে আগামীর বাংলাদেশ’ শিরোনামে ‘আন্তঃকলেজ বিতর্ক উৎসব-২০২৫’ এর ফাইনাল পর্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করেন (মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর ২০২৫)।-পিআইডি।

এই পর্যন্ত সব ঠিকঠাকই ছিল। তবে বিজয়ী ও বিজিত দল পূর্ব ঘোষিত প্রাইজ মানি বা পুরস্কারের টাকা চাইতে গেলে সংগঠনটির সভাপতি ও জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা ইউসুফ মাহমুদ তৌসিফ ‘আজ না কাল’ করে ঘোরাতে থাকেন। এভাবে ৮ মাস পার হলেও এখনো কোনো টাকাই পরিশোধ করেননি। এরমধ্যে দারুন নাজাত সিদ্দিকিয়া কামিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদেরকে ২০ হাজার টাকার একটি চেক দেওয়া হয়। সেই চেক নিয়ে তারা ব্যাংকে গেলে বাধে আর এক বিপত্তি। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানায়, ওই অ্যাকাউন্টে কোনো টাকাই নেই। অ্যাকাউন্টটি দীর্ঘদিন ধরে ডিসেবলড।

জানতে চাইলে দারুন নাজাত সিদ্দিকিয়া কামিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী শাসুল আরেফীন কালবেলাকে বলেন, জাতীয় নাগরিক পার্টির সাংস্কৃতিক সংগঠনের কথা বলে ইয়ুথ ফোরাম অব বাংলাদেশ নামের একটি সংগঠন একটি আন্তঃকলেজ বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। যেখানে ১০ থেকে ১২টি কলেজের টিম অংশগ্রহণ করেছিল। প্রতিযোগিতার সার্কুলার অনুযায়ী ঘোষণা করা হয়েছিল যে, চ্যাম্পিয়ন দলকে ৩০ হাজার এবং রানার্সআপ দলকে ২০ হাজার টাকা পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হবে। ২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বর এই প্রতিযোগিতার ফাইনাল পর্ব অনুষ্ঠিত হয় এবং আয়োজকরা পুরস্কারের টাকা দেওয়ার জন্য এক সপ্তাহ সময় চেয়ে নেন। তবে পরবর্তীতে নির্বাচনসহ বিভিন্ন অজুহাতে দীর্ঘ আট মাস পার হয়ে গেলেও তারা পুরস্কারের অর্থ প্রদান করেননি এবং আনঅফিসিয়ালি টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানান। এরপর একটি অনুষ্ঠানে ‘ন্যাশনাল ইয়ুথ ফোরাম অব বাংলাদেশ’-এর সভাপতি ইউসুফ মাহমুদ তৌসিফ চ্যাম্পিয়ন টিমকে একটি চেক প্রদান করেন, যেখানে ৩০ হাজার টাকার পরিবর্তে মাত্র ২০ হাজার টাকা লেখা ছিল। পরবর্তীতে ব্যাংকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই চেকটি ছিল সম্পূর্ণ ভুয়া এবং যে অ্যাকাউন্ট থেকে চেকটি দেওয়া হয়েছে সেটি এক বছর আগে থেকেই ব্লক ও ডিজেবল অবস্থায় ছিল।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে দনিয়া কলেজ ডিবেটিং ক্লাবের সভাপতি মো. রিয়াদ খান কালবেলাকে বলেন, প্রতিযোগিতার শুরুতে চ্যাম্পিয়ন দলের জন্য এক লাখ টাকা পুরস্কারের কথা থাকলেও পরবর্তীতে তা কমিয়ে চ্যাম্পিয়নদের জন্য ৩০ হাজার এবং রানার্সআপ দলের জন্য ২০ হাজার টাকা ঘোষণা করা হয়। প্রতিযোগিতা শেষ হওয়ার পর আয়োজকরা পুরস্কারের অর্থ প্রদানে টালবাহানা শুরু করেন। অনুদান না পাওয়ার অজুহাত দেখিয়ে মাসের পর মাস সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন। বর্তমানে আয়োজক কমিটির সভাপতি আমাদের ফোন ধরা বন্ধ করার পাশাপাশি ফেসবুকে ব্লক করে দিয়েছেন।

পুরস্কারের টাকা না দেওয়ার কথা স্বীকার করে সংগঠনটির সভাপতি ও জাতীয় নাগরিক পার্টির ডেমরা থানা শাখার সদস্য সচিব হাজি ইউসুফ মাহমুদ তৌসিফ কালবেলাকে বলেন, ‘আমাদের ইবনে সিনা হাসপাতাল থেকে একটা বড় ধরনের স্পন্সর করার কথা ছিল। পরবর্তীতে আমরা সেটা না পাওয়ায় পুরস্কারের টাকা দিতে পারিনি। তবে আমরা চেষ্টা করতেছি শিগগিরই টাকা দিয়ে দেব।’ তবে টাকা চাইতে গেলে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।

এর কিছুক্ষণ পর পুনরায় ফোন করে বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করা হবে কি না জানতে চান ইউসুফ মাহমুদ তৌসিফ। সংবাদ প্রকাশের কথা বললে তিনি বলেন, তা হলে ভালোভাবে খোঁজখবর নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করবেন। পাশাপাশি বলেন, ইবনেসিনা থেকে যেভাবে আবেদন করতে বলা হয়েছিল আমরা সেভাবে আবেদন করতে না পারায় স্পন্সর পাইনি। যে কারণে টাকাটা দিতে পারিনি। এই হলো বিষয়টি ।