প্রচ্ছদ জাতীয় ‘ওসি স্যার বিপক্ষে যাবে না’ আমি যা বলব সায় দিবেন

‘ওসি স্যার বিপক্ষে যাবে না’ আমি যা বলব সায় দিবেন

নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলায় ভারতীয় চোরাই প্রসাধনী জব্দ ও দুই যুবক আটকের ঘটনায় পুলিশের এক এক উপপরিদর্শকের বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। মামলায় নাম না দেওয়ার আশ্বাস, জব্দকৃত পণ্যের পরিমাণ কম দেখানোর প্রস্তাব এবং লাখ টাকার দর-কষাকষির কথোপকথন—এসব নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দুটি অডিও জেলাজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।

অডিও ফাঁসের পর অভিযুক্ত উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আবু হানিফাকে কলমাকান্দা থানা থেকে প্রত্যাহার করে নেত্রকোনা পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৭ মে) দুপুরে জেলা পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম বলেন, বুধবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অডিও ছড়িয়ে পড়ার পরপরই বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে। অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। সত্যতা মিললে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি জানান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) সজল কুমার সরকারকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার গভীর রাতে কলমাকান্দা উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের রাঙ্গামাটিয়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি পিকআপভ্যান থেকে ১৮ বস্তা ভারতীয় প্রসাধনী জব্দ করে পুলিশ। উদ্ধার হওয়া পণ্যের মধ্যে ভারতীয় বডি স্প্রে, শ্যাম্পু, অলিভ অয়েলসহ বিভিন্ন কসমেটিকস সামগ্রী ছিল। এসময় পিকআপচালক নাছিম (২৩) ও তার সহকারী মনির হোসেনকে (২১) আটক করা হয়। পরে এ ঘটনায় উপজেলার রাজনগর গ্রামের জসিম উদ্দিনসহ পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করা হয়। পুলিশ জসিমকে চোরাই পণ্যের মূল হোতা হিসেবে উল্লেখ করে।

তবে অভিযানের পরপরই ঘটনাটি নতুন মোড় নেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দুটি কথোপকথন হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে হয়েছে বলে দেখা গেছে।

বুধবার রাত ১০টার পর ছড়িয়ে পড়া প্রথম ক্লিপে মামলার আসামি জসিম উদ্দিনের সঙ্গে এক ব্যক্তির কথোপকথন শোনা যায়, যাকে এসআই আবু হানিফা বলে দাবি করা হচ্ছে। ৫ মিনিট ২৩ সেকেন্ডের ওই অডিওতে জসিমকে বলতে শোনা যায়, ‘স্যার, আপনাকে ৮০ হাজার টাকা দেব। আপনি আমাকে মামলা দেবেন না। শুধু দুই বস্তা মাল আটক দেখাবেন।’

জবাবে অপর প্রান্তের ব্যক্তিকে (যাকে এসআই আবু হানিফা বলে দাবি করা হচ্ছে) বলতে শোনা যায়,

‘না ভাই, যা বলছি তার কম হবে না। আপনি তিন লাখ টাকা দেন।’

কথোপকথনের একপর্যায়ে তাকে আরও বলতে শোনা যায়, ‘এক লাখ টাকা দিব। ওসি স্যার কিন্তু বিপক্ষে যাবে না। ওসি স্যার বলছেন, যেহেতু আমাকে জানিয়ে আপনারা করেছেন, দারোগার সঙ্গে কথা বলেন।’

তখন অপর ব্যক্তি বলেন, ‘আমি যা বলবো স্যার সায় দিবে। বিপক্ষে যাবে না।’

অডিওর এই অংশ প্রকাশ্যে আসার পর থানার অভ্যন্তরীণ ভূমিকা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অনেকেই বলছেন, বিষয়টি শুধু একজন কর্মকর্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ, নাকি আরও কেউ জড়িত—তা তদন্তেই স্পষ্ট হবে।

এর কিছু সময় পর রাত ১টার দিকে দ্বিতীয় ক্লিপটিও ছড়িয়ে পড়ে। সেটির দৈর্ঘ্য ৩ মিনিট ১২ সেকেন্ড। সেখানে ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আপনি যা করবেন, তাড়াতাড়ি করেন। আমি এখন ভবানীপুর ব্রিজ পার হচ্ছি… আপনার জন্য আমি ছাড় দিলাম, আড়াই লাখ টাকা নিয়ে আসেন।’

জবাবে জসিম উদ্দিন বলেন, ‘আমি কষ্ট করে হলেও আপনাকে দুই লাখ টাকা দিচ্ছি। আমাকে একটু সময় দেন।’

একপর্যায়ে ওই ব্যক্তি আরও বলেন,‘দেইখেন, হোয়াটসঅ্যাপে কথা অন্য ফোনে রেকর্ড করা যায়, এটা করবেন না।’

এর পর অডিও দুটি ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চোরাচালান সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকলেও অনেক সময় মূল কারবারিরা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এবার অডিও ফাঁসের ঘটনায় পুলিশের ভূমিকাও নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত এসআই আবু হানিফা ও মামলার আসামি জসিম উদ্দিনের মোবাইলে কল দিয়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও বন্ধ পাওয়া যায়।

কলমাকান্দা থানার ওসি মো. সিদ্দিক হোসেন বলেন, ‘বিষয়টি পুলিশ সুপার স্যার দেখছেন। এসআই আবু হানিফাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। চোরাই পণ্যের মালিক জসিম মিয়াকে আটকের চেষ্টা চলছে।’ নিজের সম্পৃক্ততার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এসব ঘটনার সঙ্গে আমি জড়িত নই।’