প্রচ্ছদ জাতীয় রিজওয়ানার থাবায় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র

রিজওয়ানার থাবায় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র

একাত্তরের রক্তাক্ত সময়। সীমান্তের ওপারে ভারতের ত্রিপুরায় গড়ে ওঠে এক অনন্য চিকিৎসাকেন্দ্র—বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আর শরণার্থীদের চিকিৎসার সেই মানবিক উদ্যোগ থেকেই জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম বড় স্বাস্থ্যভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান—গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সহোদর হিসেবে নামটি ছড়িয়ে আছে বিশ্বভুবনে।

রিজওয়ানার থাবায় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রসাভারের মির্জানগরে সদর দপ্তর, দেশের নানা প্রান্তে রয়েছে ৪৩টি উপকেন্দ্র। গণবিশ্ববিদ্যালয়, ফার্মাসিউটিক্যালস, নারী উন্নয়ন, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, কৃষি, সামাজিক উন্নয়নসহ অসংখ্য কাজে নিবেদিত এই প্রতিষ্ঠান। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে স্বাধীনতা পুরস্কারও লাভ করেছে।
অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, মহান এই প্রতিষ্ঠানও বাদ যায়নি মব সন্ত্রাসের ছোবল থেকে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট নাটকীয়ভাবে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে গেলে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র দখল হয়ে যায়। এই প্রতিষ্ঠানে পড়েছে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের থাবা।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের মতো একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানও কেন মবের ছোবল থেকে বাদ পড়েনি—এর কারণ অনুসন্ধানে নামে কালের কণ্ঠ। দেখা যায়, ২০২৩ সালের ১১ এপ্রিল ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী মারা গেলে গেলে প্রতিষ্ঠানটি দখলের পাঁয়তারা শুরু হয়।

আর তা বাস্তবায়িত হয় ২০২৪ সালের ২৪ আগস্ট। সেদিন অর্ধশতাধিক ব্যক্তি সাভারে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সদর দপ্তরে মব সৃষ্টি করে। এ সময় তারা একমাত্র জীবিত প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি মুক্তিযোদ্ধা ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদ ও পরিচালক ডা. মাহবুব জুবায়েরকে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করে।
সেদিনের ঘটনা প্রসঙ্গে ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদ গতকাল বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি হিসেবে কোনো পদে বা দায়িত্বে ছিলেন না তিনি। কিন্তু তাঁকে সরাতে পারলেই গোটা গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র গিলে খাওয়া যাবে, সেই উদ্দেশ্য সফল করতে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও শিরিন হক দীর্ঘদিন ধরে তৎপর ছিলেন।

তিনি বলেন, “তাঁরা দুজন মিলেই সেদিন মির্জানগরে অর্ধশতাধিক লোক পাঠিয়েছিলেন। সে সময় বারবার মবকারীদের ফোনে নির্দেশনা দিচ্ছিল আমাকে যেন পদত্যাগ করিয়ে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হয়। এ ছাড়া গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের একাধিক কর্মচারীও সরাসরি ইন্ধন দেন। ঘটনাস্থলে স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকলেও ‘ওপর মহলের’ নির্দেশনা আছে জানিয়ে তাঁরা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেন।”
রিজওয়ানার থাবায় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্ররিজওয়ানার নির্দেশ—ডা. নাজিমকে বের করেন : অনুসন্ধানে জানা গেছে, কয়েক বছর ধরেই গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অনানুষ্ঠানিকভাবে খবরদারি করার চেষ্টা করছিলেন সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। প্রতিষ্ঠানটিকে নিজের কবজায় নিতে একটি সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। আর সেই সুযোগ এসে যায় ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে। সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ১৬ দিনের মাথায় দখলে নেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চূড়ান্ত ধাপে সরিয়ে দেন ডা. নাজিমউদ্দিনকে।

মবের মুখে সই করা নাজিমউদ্দিনের কথিত পদত্যাগপত্রের একটি ছবি কালের কণ্ঠ খুঁজে পেয়েছে। সেখানে লেখাটি ছিল এ রকম : ‘আমি স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে অত্র তারিখ হতে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সকল দায়িত্ব হতে অব্যাহতি নিলাম এবং ভবিষ্যতে অত্র প্রতিষ্ঠানের কোন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করব না।’

ঘটনার সময় উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে নিশ্চিত করেন, লেখাগুলো মবকারীরা নিজেদের হাতে লিখে দিয়েছিল। তারপর সেখানে নাজিমউদ্দিনকে সই করতে বাধ্য করা হয়।

অন্যদিকে ডা. নাজিমউদ্দিন অভিযোগ করেন, তাঁকে যেকোনো মূল্যে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে অপমান করে বের করে দিতে হবে, এই নির্দেশ ছিল সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের। তাঁর ভাষ্য, “প্রশাসনের লোকজন মব ঠেকাতে না পেরে আমাকে পদত্যাগের অনুরোধ জানায়। এর মধ্যে তারা ফোন লাউড স্পিকারে দিয়ে নির্দেশনার কথাটি শোনায়। তখনই আমি শুনতে পাই, রিজওয়ানা হাসান বলছিলেন, ‘ডাক্তার নাজিমকে গ্রেপ্তার করেন, ডাক্তার নাজিমকে এখনই বের করেন, যেকোনো মূল্যে তাঁকে বের করতে হবে, নইলে অ্যারেস্ট করতে হবে। এটা আমাদের নির্দেশ।’”

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের একজন ট্রাস্টি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নজরুল ইসলাম একজন পুলিশ সুপারের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন। তাতেও কাজ হয়নি। ওই পুলিশ সুপারও পরিস্থিতি তাঁদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে জানিয়ে মবকারীদের দাবি মেনে নেওয়ার পরামর্শ দেন।

গণস্বাস্থ্যে মব সন্ত্রাসের ঘটনার একাধিক ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করেছে কালের কণ্ঠ। একটি ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল পরিচালকের কার্যালয়ে ঢুকে পড়ে ৫০ থেকে ৬০ জনের একটি দল। তারা এসে প্রথমেই ডা. নাজিম ও ডা. মাহবুবকে পদত্যাগের জন্য চাপ দিতে থাকে। এই মবের ঘটনা চলে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। পুরো সময়ে দেখা যায়, অসহায়ের মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন ডা. নাজিমউদ্দিন। আর তাঁকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেছে মবকারীরা। অসহায়ের মতো চার ঘণ্টা ধরে মব সহ্য করলেও এগিয়ে আসেনি কেউই।

ভিডিওতে মবের নেতৃত্ব দেওয়া কয়েকজনকে চিহ্নিত করা গেছে। তাঁরা হলেন ধানমণ্ডি নগর হাসপাতালের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. সাইমুম আহমেদ প্রান্ত, গণস্বাস্থ্য মেডিক্যাল কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী ডা. নাবিল, ডা. রানা, ডা. হান্নান, ডা. ইয়ামিন, ডা. অন্তর, ফার্মাসিউটিক্যালসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা সোহেল রানা, ঢাকা উত্তর ছাত্রলীগের সহ-আইন বিষয়ক সম্পাদক মুশফিকুর রহমান ইমন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, মূলত জুলাই আন্দোলনের বিরোধী বা আওয়ামী লীগের দোসর ট্যাগ লাগিয়ে সারা দেশে শুরু হয় মবোৎসব। সে সময় প্রশাসনও ছিল নির্বিকার। গণস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও সেই সুযোগটি কাজে লাগানো হয়।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের যাত্রা এবং সহযাত্রীরা : গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর নাম শুনে অভ্যস্ত সবাই। কিন্তু এই দলে আছেন আরো কয়েকজন—এই তথ্য জেনেই আমরা শুরু করি অনুসন্ধান। তেজগাঁওয়ের ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার অফিস থেকে সংগ্রহ করি ১৯৭২ সালের ১৪ অক্টোবর গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি বোর্ড গঠনের সত্যায়িত দলিল। দলিলটি নিবন্ধিত হয়েছিল ১৯৭২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর। সেখানে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা মোট ছয়জন। তাঁরা হলেন ডা. এম এ মবিন, ডা. এ টি এম জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ডা. মো. আলতাফুর রহমান, ডা. কাজী কামরুজ্জামান, ডা. বরকত আলী চৌধুরী ও ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদ।

ওই দলিলে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরা চারজনকে নিয়ে ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করেন। এই চারজন হলেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদ, সাদেক খান ও এম জাকারিয়া। তাঁদের মধ্যে ডা. নাজিমউদ্দিন বাদে বাকিদের কেউ আর জীবিত নেই।

অন্যদিকে প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে ডা. নাজিমউদ্দিন ও ডা. কাজী কামরুজ্জামান দেশে আছেন। ডা. এম এ মবিন ও আলতাফুর রহমান যুক্তরাজ্যে এবং বরকত আলী যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। জানা গেছে, আশির দশকের পর তাঁদের কারোরই গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ততা নেই।

২০২৩ সালের ১১ এপ্রিল ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী মারা গেলে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র নিয়ে নানা জটিলতা সৃষ্টি হয়। তখন আলোচনায় আসেন প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা. নাজিমউদ্দিন। তাঁর সম্পর্কে অনুসন্ধানে জানা যায়, তিনি প্রচারবিমুখ মানুষ। কিন্তু ইতিহাসের নানা অধ্যায়ে লেখা আছে তাঁর নাম। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ইতিহাস বলতে গেলেও এসে যায় নামটি।

প্রচারের আড়ালে বীরত্বের ইতিহাস : শাহাদুজ্জামান ও খায়রুল ইসলামের ‘মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব এক হাসপাতাল’ শিরোনামে যৌথ গবেষণা প্রবন্ধে ডা. নাজিমউদ্দিনের কীর্তি লেখা রয়েছে বীরত্বের সঙ্গে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতালের নেপথ্যে ছিলেন কয়েকজন নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসক। ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে ছিলেন সেনাবাহিনীর দুজন সদস্য ডা. আখতার আহমেদ ও ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম। পরে বিদেশ থেকে এসে সেখানে যোগ দেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও ডা. এম এ মবিন।

মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন দলিলপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, আগরতলায় ২ নম্বর সেক্টরে যোগ দিয়ে ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদ প্রথমে বিবির বাজারের যুদ্ধে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য সোনামুড়ায় একটি অস্থায়ী হাসপাতাল গড়ে তোলেন। পরে শ্রীমন্তপুর থেকে সরে এসে ডা. আখতার আহমেদের সঙ্গে তিনি যৌথভাবে হাসপাতালটি পরিচালনা করেন। স্থানসংকট ও নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে ধাপে ধাপে সেটি বন বিভাগের একটি টিনের ঘর হয়ে মেলাঘরে স্থানান্তরিত হয়, যেখানে এর সাংগঠনিক কাঠামো আরো শক্তিশালী হয়।

১৯৭১ সালের মে মাসে যুক্তরাজ্য থেকে এসে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও ডা. এম এ মবিন যোগ দিলে হাসপাতালের পরিধি ও কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়। যুদ্ধের শেষ দিন পর্যন্ত ডা. আখতার, ডা. নাজিমউদ্দিন ও ডা. সিতারা চিকিৎসা কার্যক্রমে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। অন্যদিকে ডা. জাফরুল্লাহ মূলত আন্তর্জাতিক যোগাযোগের মাধ্যমে অর্থ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও সহায়তা সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সঙ্গে ফ্রান্স সাপোর্ট কমিটি সম্পর্কের বিষয়ে একটি বই লিখেছেন ফ্রান্সের লেখক লুইসিয়েন বিগল্ট। বইয়ের নাম ‘সলিডারিটি অ্যাক্রস বর্ডারস’। বইটিতে ১৯৭৬ সালের একটি ঘটনার ধারা বর্ণনা করতে গিয়ে লেখক তুলে ধরেন ডা. নাজিমউদ্দিনকে।

গণপ্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ‘ফ্রম ব্যাটল ফ্রন্ট টু কমিউনিটি : স্টোরি অব গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র’ বইটিতেও অসংখ্যবার উঠে এসেছে নাজিমউদ্দিনের নাম। মুক্তিযুদ্ধের সময় ফিল্ড হাসপাতালে ডা. নাজিমউদ্দিনের অবদানের কথা আছে। ১৯৭১ সালের ১৮ অক্টোবর কুমিল্লার মন্দাবাগ থেকে বিদেশের সাহায্যকারী বন্ধুদের কাছে লেখা চিঠিতেও নাজিমের কৃতিত্বের কথা বলেছেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী।

দখলের শুরু যেভাবে : ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মৃত্যুর পর গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র দখলের ষড়যন্ত্র মবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, একটি দলিল তৈরি করে নতুন ট্রাস্টি বোর্ড গঠনের মতো বিস্ময়কর ঘটনাও ঘটেছে। আর সেখানেও পাওয়া গেছে সৈয়দা রিজওয়ানার নাম। জানা গেছে, গত বছরের ২৫ জানুয়ারি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের নামে ভুয়া ট্রাস্ট দলিল তৈরি করা হয়। আশুলিয়া সাবরেজিস্ট্রি কার্যালয় থেকে সেই দলিলের একটি অনুলিপি সংগ্রহ করে কালের কণ্ঠ।

সেখানে দেখা যায়, সাতজনকে নিয়ে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের নতুন ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়। এই সাতজন হলেন আলতাফুন্নেসা, আবুল কাশেম চৌধুরী, সন্ধ্যা রায়, মনজুর কাদির আহম্মেদ, শিরীন পারভীন হক, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও আব্দুল কাদের আজাদ।

ট্রাস্ট আইন-১৮৮২ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠাতা ছাড়া ট্রাস্টি বোর্ড গঠনের এখতিয়ার কারো নেই। এই আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কথিত ট্রাস্টি বোর্ড গঠিত হয়। অর্থাৎ তাঁরা নিজেরাই নিজেদের ট্রাস্টি মনোনীত করেছেন।

জানা গেছে, কথিত ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের মধ্যে আলতাফুন্নেসা হলেন প্রথম ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এম জাকারিয়ার স্ত্রী। আবুল কাশেম চৌধুরী ছিলেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের পরিচালক। সন্ধ্যা রায় ও মনজুর কাদিরকে ২০২৩ সালে দুর্নীতির দায়ে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র দখলের পর তাঁরা ফিরে আসেন। সবাইকে অবাক করে কথিত ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যও হয়ে যান তাঁরা। সন্ধ্যা রায় বর্তমানে মানবসম্পদ বিভাগের কথিত পরিচালক। আর মনজুর কাদির ফার্মাসিউটিক্যালসের কথিত ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

একটি নথিতে দেখা যায়, ২০২২ সালের ২০ অক্টোবর ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী তাঁর একক সিদ্ধান্তে আলতাফুন্নেসাকে ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মনোনীত করেন। এর ফলে আলতাফুন্নেসাকে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ, গণস্বাস্থ্য ক্রেডিট কো-অপারেটিভ সোসাইটিসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়। ওই ঘটনায় তিনি অন্য সদস্যদের মতামতকে উপেক্ষা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে ডা. নাজিমউদ্দিন লিখিতভাবে তাঁর আপত্তি ব্যক্ত করেন।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ওয়েবসাইটে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের তালিকায় সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানসহ অন্যদের ছবিসহ পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে।

ডা. নাজিমউদ্দিনের বিস্ফোরক অভিযোগ : ডা. নাজিম উদ্দিনের অভিযোগ, তাঁকে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে সরানোর পেছনে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও শিরিন হক। আরো ছিলেন কাসেম চৌধুরী এবং আগে বহিষ্কৃত কয়েকজন কর্মকর্তা—মহিবুল্লাহ মঞ্জু, আব্দুল কাদের ও সন্ধ্যা রায়।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মৃত্যুর পর তিনি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিভাগে অডিট শুরু করেন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে থাকেন। এই উদ্যোগই সংশ্লিষ্ট একটি পক্ষকে ক্ষুব্ধ করে তোলে।

ট্রাস্টিকাঠামো নিয়ে ডা. নাজিম উদ্দিনের বক্তব্য, তিনি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের একমাত্র জীবিত প্রতিষ্ঠাতা-ট্রাস্টি। কিন্তু শিরিন হকের নেতৃত্বে জাল দলিলের মাধ্যমে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানসহ কয়েকজনকে নিয়ে একটি অবৈধ ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়েছে, যেখানে কোনো প্রতিষ্ঠাতা সদস্য নেই। এটি প্রতিষ্ঠানের নিয়ম ও আইনের পরিপন্থী বলে তিনি অভিযোগ করেন।

তিনি জানান, সাভারের গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে ৫০ থেকে ৬০ জনের একটি বহিরাগত দল প্রবেশ করে। তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে পদত্যাগে বাধ্য করা হয় বলে তাঁর অভিযোগ। চাপের মুখে তিনি একটি কাগজে লিখে দেন যে তিনি ‘গণস্বাস্থ্যের কর্মকাণ্ড থেকে অব্যাহতি নিচ্ছেন’; তবে তাঁর দাবি, এটি আনুষ্ঠানিক পদত্যাগ নয় এবং ট্রাস্টি হিসেবে তাঁর অধিকার বহাল রয়েছে।

ডা. নাজিমউদ্দিনের মতে, পরিকল্পিতভাবে ‘মব’ সৃষ্টি করে প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ দখল করা হয়েছে। ওই ঘটনায় নথিপত্র তছনছ, আলমারি ভাঙচুর এবং কিছু মালপত্র ও মোবাইল সেট ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি অবৈধভাবে দখলে রয়েছে এবং ভিন্নমত পোষণকারীদের ছাঁটাই করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান। এ পরিস্থিতিতে তিনি সুষ্ঠু তদন্ত এবং সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

ষড়যন্ত্রের শুরু এক বছর আগেই : অনুসন্ধানে জানা গেছে, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র দখলের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন হতে শুরু করে এক বছর আগে ২০২৩ সালের আগস্টে। সে সময়ও সাভারে মবের ঘটনা ঘটে। তখন অপমান করে বের করে দেওয়া হয় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের পরিচালক ইউরোলজিস্ট ডা. গিয়াস উদ্দিন আহমেদকে। মূলত সেটিই ছিল গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র দখলের প্রথম ধাপ।

অনুসন্ধান বলছে, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র পকেটে পুরতে ডা. গিয়াস উদ্দিনকে সরাতেই হতো। তারপর প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা. নাজিমউদ্দিনকে সরিয়ে দিলেই পকেটবন্দি হয়ে যায় পুরো প্রতিষ্ঠানটি। আর এই কাজটি সফল করতে তাঁরা দীর্ঘ পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করেছেন।

ডা. গিয়াস উদ্দিন আহমেদ সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমাদের বিস্ময় সীমা ছাড়িয়ে যায়। অপমানিত হয়ে সপ্তাহ দুয়েক পরই তিনি অভিমানে দেশ ছেড়ে চলে যান। আমরা খুঁজে বের করেছি সেই ডা. গিয়াস উদ্দিন আহমেদকে। বর্তমানে তিনি আর্জেন্টিনার এক প্রত্যন্ত এলাকায় জীবন কাটাচ্ছেন। একসময় অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে দেশের টানে ফিরে এসেছিলেন সাভারের গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে। কিন্তু দুর্নীতির এক শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কাছে পরাজিত হয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন এই চিকিৎসক। (এই দেশপ্রেমিক চিকিৎসকের বিষয়ে বিস্তারিত আছে পার্শ্বপ্রতিবেদনে।)

অভিযুক্তদের ভাষ্য : কথিত ট্রাস্টি বোর্ড গঠনের বিষয়ে জানতে চাইলে সদস্য মনজুর কাদির আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারি না, এটি কেন্দ্রের আইন উপদেষ্টা সোহেল রানা দেখেন। তিনি ভালো বলতে পারবেন।’

ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হয়েও প্রতিষ্ঠানের কোনো দায়িত্বে সরাসরি যুক্ত থাকার বিধান আছে কি না, জানতে চাইলে মনজুর কাদির বলেন, ‘আমি নিজে তো দায়িত্ব নিইনি। আগে থেকেই আমাকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।’

সোহেল রানা হলেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের আইন ও প্রশাসন বিভাগের সহকারী পরিচালক। গত রাতে ফোন দিয়ে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আইন-কানুনের বিষয় তো, এগুলো ফোনে বলা যায় না। আপনি সরাসরি আসেন, চা খাই। আলাপ করি।’

অন্যদিকে এই বোর্ডের আরেক সদস্য সন্ধ্যা রায়ের বক্তব্য জানতে গত ২১ এপ্রিল গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সদর দপ্তরে গেলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া গত রাতে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বক্তব্য জানতে গত রাতে ফোন করা হলে তিনি তা রিসিভ করেননি। এ বিষয়ে তাঁকে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিয়েও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।