
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ছাত্র উপদেষ্টা ড. আমিরুল ইসলাম কনকের এক ফেসবুক পোস্টের মন্তব্যে ‘শিক্ষক শিক্ষকের মতো থাকেন, না হলে কান বরাবর পড়বে’ এরকম হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে রাবির এক ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে।
শরিফুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি শরিফুল ইসলাম। তিনি নৃবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী, তার বাড়ি বগুড়া জেলায়।
শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রিনশটে ছড়িয়ে পড়া এ মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসজুড়ে তুমুল সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
জানা যায়, শুক্রবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. আমিরুল ইসলাম কনক নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে লেখেন, ‘শকুনিমুক্ত করতে দেড় হাজার প্রাণ ঝরলো, ত্রিশ হাজার আহত হলো। কারও নেই জীবন গড়ার পরিকল্পনা। চলছে নেড়িকুত্তা আর শুকরের কামড়াকামড়ি।
এই পোস্টের কমেন্ট বক্সে ছাত্রদল নেতা শরীফুল ইসলাম মন্তব্য করেন, ‘শিক্ষক শিক্ষকের মতো থাকেন, না হলে কান বরাবর পড়বে।’
মন্তব্যটি মুহূর্তেই সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের অনেকেই বলেন, শিক্ষককে উদ্দেশ করে এ ধরনের মন্তব্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ ও সংস্কৃতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তারা এ ধরনের আচরণের নিন্দা জানিয়ে সংশ্লিষ্টদের দায়বদ্ধতার আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে রাকসুর বিতর্ক ও সাহিত্যবিষয়ক সম্পাদক ইমরান লস্কর বলেন, কনক স্যার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অগ্রসরমান ব্যক্তিত্ব। অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে এবং ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে তিনি সবসময় অবস্থান নেন। এমন একজন মানুষকে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়া দুঃখজনক।
ছাত্র উপদেষ্টা ড. আমিরুল ইসলাম কনক বলেন, আমি চাই সারাদেশে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হোক এবং শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় মনোযোগী হোক। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেকে নিজের ক্যারিয়ার গঠনের দিকে না গিয়ে অপ্রয়োজনীয় দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ছে। মনের কষ্ট থেকেই আমি ওই পোস্টটি দিয়েছিলাম।
তিনি আরও বলেন, ওই মন্তব্যটি আমার কাছে অশোভন মনে হয়েছে। ক্যাম্পাসের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে কিছু আপত্তিকর মন্তব্যের জবাবে আমি প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলাম। তবে এসব বিষয় সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে খারাপ দেখায়, তাই পরে মন্তব্যের অপশন বন্ধ করে দিই।
হুমকির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পরবর্তীতে আবার মন্তব্যে আমাকে ‘শিক্ষকের মতো থাকতে’ বলে এবং ‘না হলে কান বরাবর পড়বে’— এ ধরনের হুমকি দেওয়া হয়। আমি তাকে ভাষা সংযত করতে বলেছি। আমি বিষয়টি সিনিয়র শিক্ষকদের অবহিত করব।
অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতা শরিফুল ইসলাম বলেন, আমি প্রথমে ওনার পোস্টে মন্তব্য করেছিলাম, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন একের পর এক মব হচ্ছিলো তখন প্রশাসনে বসে কী করছিলেন।’ উনি রিপ্লাইয়ে মন্তব্য করেন, ‘তোর মতো ভেড়াকে ঘাস খাওয়াচ্ছি।’ এরপর আমি আমার ওই মন্তব্যটি করেছিলাম। এরপর উনি আমাকে ব্লক করে দিয়ে নিজের কমেন্টটা ডিলিট করে দিয়ে আমার কমেন্টগুলো রেখে ফ্রেমিং করা শুরু করে।
তিনি বলেন, আমি প্রথমে উনার পোস্টে মন্তব্য করার পর উনি আমাকে ভেড়ার সাথে তুলনা করেন। সেই জায়গা থেকে আমি মন্তব্য করেছি।
তিনি আরও বলেন, উনার সাথে দ্বন্দ্ব অনেক পুরোনো। আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলাম, তখন উনার মদদে একদিন ছাত্রলীগ আমাকে তৎকালীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের ২৩৭ নম্বর কক্ষে নিয়ে নির্যাতন করে।
তবে ছাত্রদল নেতা শরিফুলকে নির্যাতনের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যাচার বলে অভিহিত করেছেন আমিরুল ইসলাম কনক। তিনি বলেন, আমি আজই এই ঘটনা প্রথম শুনলাম। এমন মিথ্যাচার কেউ করতে পারে? ওর মানসিক অবস্থা নিয়ে এখন আমি চিন্তিত।
এ বিষয়ে রাবি ছাত্রদল সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, আমি আমাদের ছাত্রনেতার কোনো দোষ দেখছি না, উনি এ বিষয়টা আরো দায়িত্বশীল ভাবে সমাধান করতে পারতেন। এটা আমি মনে করি শিক্ষক হিসাবে উনি ছাত্রকে এভাবে মন্তব্য করতে পারেন না, এখানে ছাত্রের থেকে শিক্ষকের অপরাধটাই বেশি মনে করছি।
তিনি বলেন, স্যার আমাদের ওই নেতাকে মুজিব হলের ২৩৭ নাম্বার রুমে এক ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীকে দিয়ে মারধর করিয়েছিলেন। ছাত্রলীগের সাথে উনি চলাফেরা করতেন। উনি ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন মব বিষয়ে, তখন আমাদের ওই নেতা কমেন্ট করার পর উনি বলেছিলেন তোর মতো ভেড়াকে ঘাস খাওয়াবো। এ মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে পূর্বদ্বন্দের জেরে এমন একটা মন্তব্য করেন আমাদের ছাত্রদল নেতা।
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। শিক্ষককে উদ্দেশ্য করে এ ধরনের হুমকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা ও শিক্ষার পরিবেশের পরিপন্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীর কাছে এ ধরনের মন্তব্য কখনোই কাম্য নয়।












































