
দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি। কিন্তু অনেক ত্যাগী নেতাকর্মীর অভিযোগ-তাদের ভাগ্য বদলায়নি। বরং বঞ্চনার কথাই বেশি শোনা যাচ্ছে। ত্যাগ আছে, কিন্তু মূল্যায়ন কোথায়? এই প্রশ্ন এখন দলটির কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতাদের মুখে মুখে। তারা বলছেন, রাজনীতি করলে কিছু ভুলভ্রান্তি হতে পারে। কিন্তু অনেক নেতাই আছেন, যাদের বিএনপির ‘ব্র্যান্ড’ বলে মনে করা হয়।
ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, সেলিমা রহমান, রুহুল কবীর রিজভীসহ এমন অনেকেই আছেন-যারা বিগত দেড় যুগ দলকে আগলে রেখেছেন। লড়াই করেছেন। তাদের কাউকে কাউকে শেখ হাসিনা সরকার নানা প্রলোভন দিয়ে নির্বাচনে নেওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। অনেকের মতে, ত্যাগী এসব নেতার যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। বরং এমন অনেকে মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন, যাদের নাম অনেক বছর ধরে শোনা যায়নি।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরে প্রায় দেড় লাখ মামলায় ৬০ লাখ নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে বলে দাবি বিএনপির। কারও কারও বিরুদ্ধে জমেছে মামলার পাহাড়।
অনেকেই আক্ষেপ করে বলছেন, আন্দোলনের সময় যাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি, তারাই এখন প্রভাবশালী। আর যারা জীবনবাজি রেখে রাজপথে ছিলেন, তারা অবহেলিত। কেউ কেউ সরাসরি দলের কাছে ত্যাগের স্বীকৃতি দাবি করছেন। তাদের মতে, শুধু ক্ষমতায় আসাই শেষ কথা নয়, যারা এই পথ তৈরি করেছেন, তাদের মূল্যায়ন না হলে দলীয় ঐক্য ও ভবিষ্যৎ রাজনীতি হুমকির মুখে পড়তে পারে।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্মমহাসচিব রুহুল কবীর রিজভীকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা হলেও এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে বিএনপির রাজনীতিতে। হাসিনাবিরোধী আন্দোলনের কঠিন সময়ে এমন অনেকদিন ছিল, দলীয় কার্যালয়ে ঝড়ের বেগে প্রেস ব্রিফিং করে আবারও আত্মগোপনে যেতে হয়েছে রিজভীকে। কারণ, দলের বেশির ভাগ নেতা তখন গ্রেফতার হয়ে কারাগারে ছিলেন। কিন্তু মন্ত্রিত্বের বদলে রিজভীকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করায় অনেকে বিস্মিত হয়েছেন।
বিএনপির যুগ্মমহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলও এই বাস্তবতার একটি উদাহরণ। সাড়ে চারশ মামলার আসামি হিসাবে দীর্ঘ সময় আদালত ও কারাগারে কাটিয়েছেন তিনি। প্রতিটি আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। তার অনুসারীদের প্রত্যাশা ছিল-গণ-অভ্যুত্থানের পর তিনি এমপি, মন্ত্রী, মেয়র কিংবা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে মূল্যায়িত হবেন। তবে কোনোটিই ঘটেনি।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল তিন শতাধিক মামলার আসামি। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। আন্দোলন জোরালো করতে নেতাকর্মীদের নানাভাবে উৎসাহ দিয়েছেন। পিকেটিংসহ প্রতিটি মিছিল, মিটিংয়ে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন। বেশ কয়েকবার রাজপথ থেকে গ্রেফতারও হন। রিমান্ডে তার ওপর চলে অমানবিক নির্যাতন। রাত কাটিয়েছেন কারাগারের কনডেম সেলে। একদিকে রিমান্ডে নির্যাতন, অন্যদিকে কারাগারে বিনা চিকিৎসায় তার একটি কিডনি অকেজো হলে ফেলে দেওয়া হয়।
২০০১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি মালিবাগে হরতাল চলাকালে বিএনপির শান্তিপূর্ণ মিছিলে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলিতে ৪ জন নিহত হন। ওই সময় মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল গুলিবিদ্ধ হন। তার মেরুদণ্ডে দুবার অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন গুলির সেই ক্ষত। মায়ের মৃত্যুর সময় ছিলেন কারাগারে। মৃত্যুর ৩ দিন পর ৮ ঘণ্টা প্যারোলে রংপুর থেকে বরিশালে নেওয়া হলেও মায়ের মুখ আর দেখতে পারেননি তিনি। আলালের সাড়ে ৩ বছর সাজার রায় দেওয়া হয়। এমন পরিস্থিতিতেও কারাগার থেকে তিনি আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার নানা বার্তা দিতেন নেতাকর্মীদের। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে তাকেও এমপি, মন্ত্রী কিংবা দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে চেয়েছেন নেতারা। এত ত্যাগের পরও তাকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি বলে অনেক নেতাকর্মীর অভিযোগ।
জানতে চাইলে আলাল যুগান্তরকে বলেন, বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে আমাদের বিভিন্ন সময়ে ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনে উৎসাহিত করেছেন। তিনি সবকিছু অবগত রয়েছেন। চেয়ারম্যান যথাসময়েই দলের ত্যাগী নেতাকর্মী যারা আছেন, তাদের পুরস্কৃত ও সম্মানিত করবেন। এই বিশ্বাস আমার আছে।













































