প্রচ্ছদ জাতীয় সমালোচনার দায়ে কারাগারে, মুক্তি পেয়ে বললেন ‘বিএনপিকে ভালোবাসি’

সমালোচনার দায়ে কারাগারে, মুক্তি পেয়ে বললেন ‘বিএনপিকে ভালোবাসি’

ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে একের পর এক চুরি, নিরাপত্তাহীনতা আর প্রতিকারের অভাবে ক্ষুব্ধ হয়ে ফেসবুক লাইভে বিএনপিকে ভোট দেওয়ার অনুশোচনা প্রকাশ করেছিলেন নারী উদ্যোক্তা সাথী আক্তার। অভিযোগ, এর জেরে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মীর হাতে গালাগাল ও মারধরের শিকার হন তিনি। পরে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫১ ধারায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারেও যেতে হয় তাকে। বুধবার (২৮ অক্টোবর) জামিনে মুক্ত হয়ে সেই ক্ষোভ ও আক্ষেপই ঝরল তার কণ্ঠে। সাথী বলেন, ‘আমি এই দলকে ভালোবাসি। দলের দুঃসময়ে যখন অনেকে ভয়ে কথা বলত না, তখন আমি নেত্রীর জন্য আন্দোলনে ছিলাম। আজ সেই দলের নেতাকর্মীদের হাতেই আমাকে অপদস্থ হতে হয়েছে। আমি শুধু আমার মনের কষ্ট প্রকাশ করেছি।’

ময়মনসিংহের ভালুকায় প্রায় ১৪ বছর ধরে ‘সাথী বিউটি পার্লার’ পরিচালনা করছেন সাথী আক্তার। তার অভিযোগ, সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির তিনটি শোরুমের শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) তার ও বিদ্যুতের মিটারের তার কেটে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন তিনি। বারবার চুরির ঘটনায় প্রতিকার না পেয়ে গত ২৫ অক্টোবর ফেসবুক লাইভে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

সাথীর দাবি, লাইভের পর স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে গালাগাল ও মারধর করেন। এ সময় তার মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। তার ছেলে মো. জুনায়েদের অভিযোগ, তার কাছে দেড় লাখ টাকা চাঁদাও দাবি করা হয়েছিল।

গত ২৬ অক্টোবর ভালুকা থানা পুলিশ সাথী আক্তারকে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫১ ধারায় গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায়। বুধবার আদালত ৫০০ টাকার মুচলেকায় নিজ জিম্মায় তার জামিন মঞ্জুর করেন। তার আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাহাতাব উদ্দিন আহমেদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। মামলার পরবর্তী তারিখ ৩ নভেম্বর।

সাথী আক্তার বলেন, ‘আমি শুধু আমার মনের কষ্ট প্রকাশ করেছি। সরকারবিরোধী কোনো কথা বলিনি। অথচ বিএনপির নেতাকর্মীরা এসে আমার ওপর হামলা চালিয়েছেন। দুর্দিনে দলের পাশে ছিলাম, আর আজ সেই দলের লোকেরাই আমার বুকে লাথি মারছে।’

তিনি জানান, একটি শোরুমে নতুন করে চার কয়েল তার লাগাতে হয়েছে। প্রতি কয়েল তারের দাম ১২ হাজার টাকা। একের পর এক চুরির ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন তিনি। দীর্ঘদিনেও প্রতিকার না পেয়ে ক্ষোভ জমতে থাকে তার মনে। সেই কষ্টের কথাই ফেসবুক লাইভে তুলে ধরেন।

সাথীর অভিযোগ, ওই ঘটনায় ইব্রাহিম নামে এক ব্যক্তিও জড়িত ছিলেন। তার মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয় বলেও দাবি করেন তিনি।

সাথীর ছেলে মো. জুনায়েদ বলেন, ‘আম্মুর দোকানে দীর্ঘদিন ধরে চুরি হচ্ছিল। একপর্যায়ে রাগের মাথায় তিনি ফেসবুক লাইভে কিছু কথা বলেন। এরপর কয়েকজন নেতা এসে ঝামেলা করেন। তারা দেড় লাখ টাকা চাঁদা চেয়েছিলেন। চাঁদা না দেওয়ায় এবং মোবাইলে কথোপকথন রেকর্ড হয়ে যাওয়ায় ফোনটি কেড়ে নেওয়া হয়। পরে রাত ১০টার পর আম্মুকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়।’

সাথী আক্তার জানান, বিএনপির দুঃসময়ে দলটির বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন তিনি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তি ও উন্নত চিকিৎসার দাবিতে আন্দোলন এবং স্থানীয় বিএনপি নেতা ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চুর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারেও ভূমিকা রেখেছেন। তবে দলের কোনো আনুষ্ঠানিক পদে ছিলেন না।

সাথীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাহাতাব উদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বারবার চুরির ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে সাথী ফেসবুক লাইভে নিজের মতামত প্রকাশ করেছিলেন। সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা স্বীকৃত। তার অভিযোগ, সাথীকে নিরাপত্তা দেওয়ার পরিবর্তে পুলিশ তাকেই গ্রেপ্তার করেছে।

আইনজীবী জানান, গত ২৫ অক্টোবর করা একটি সাধারণ ডায়েরির (জিডি) সূত্র ধরে সাথীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আদালতে শুনানির সময় পুলিশের প্রতিবেদনে আমলযোগ্য অপরাধ সংঘটনের আশঙ্কার পক্ষে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরা হয়। পরে আদালত তার জামিন মঞ্জুর করেন। এ বিষয়ে তদন্ত চলমান রয়েছে।

ময়মনসিংহ কোর্ট পুলিশের ইন্সপেক্টর মোস্তাছিনুর রহমান বলেন, ভালুকা থানা পুলিশ ২৬ অক্টোবর সাথী আক্তারকে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫১ ধারায় গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায়। বুধবার আদালত তাকে ৫০০ টাকার মুচলেকায় নিজ জিম্মায় জামিন দেন। পরবর্তী তারিখে পুলিশের প্রতিবেদন পাওয়ার পর আদালত পরবর্তী কার্যক্রম নির্ধারণ করবেন।

এর আগে ভালুকা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, সাথী আক্তারের ফেসবুক লাইভে সরকারবিরোধী কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে লাইভকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়ায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে তাকে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫১ ধারায় আদালতে পাঠানো হয়।