প্রচ্ছদ জাতীয় চীন সফরে কী পেলো বাংলাদেশ

চীন সফরে কী পেলো বাংলাদেশ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার চার মাস পর প্রথম বিদেশ সফরে দুই দেশ গেছেন। তিনি প্রথমে মালয়েশিয়া যান এবং সেখান থেকে ১৮ ঘণ্টার সফরে চীন যান। চীনে চার দিনের সফর শেষে শুক্রবার দেশে ফিরেছেন তিনি।

চীন সফরে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পর প্রধানমন্ত্রী এবং চীনের নেতৃত্বের সম্মতির ভিত্তিতে মোট ১৭টি মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং (এমওইউ) সই হয়েছে। এ ছাড়া তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের আগ্রহ, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাবসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

চীন সফরের ‘উল্লেখযোগ্য’ অর্জন

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক এতদিন সর্বাঙ্গীন কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্ব পর্যায়ে ছিল। এই সফরের মাধ্যমে সেটিকে উন্নীত করে ‘চীন-বাংলাদেশ কমিউনিটি উইথ অ্যা শেয়ার্ড ফিউচার’ বা ‘অভিন্ন ভবিষ্যৎ নিয়ে চীন-বাংলাদেশ কমিউনিটি’ পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে। এটি চীনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একটি কূটনৈতিক কাঠামো, যা চীন তার ঘনিষ্ঠ অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করে থাকে।

এ ধরনের সম্পর্ক চীনের শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, ব্রাজিল ও নাইজেরিয়াসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দেশের সঙ্গে রয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে একই পর্যায়ের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা হওয়াকে কূটনৈতিক অগ্রগতির একটি বড় অর্জন বলে মনে করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

এ ছাড়া দুই দেশের মধ্যে এতদিন সচিব পর্যায়ে যে পররাষ্ট্র দপ্তরের পরামর্শ বৈঠক হতো, সেটিকে এখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের কৌশলগত সংলাপে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ ব্যবস্থা চালুর সম্ভাবনাও দুই দেশ যৌথভাবে পর্যালোচনা করবে।

কর্মকর্তারা বলছেন, মোংলা বন্দর উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ, চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতায় বড় অবকাঠামো ও জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে সহযোগিতা বাড়াতে দুই দেশ একমত হয়েছে।

উন্নয়ন সহযোগিতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং সাংস্কৃতিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আটটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ), তিনটি চুক্তি, একটি প্রোটোকল এবং একটি যৌথ কর্মপরিকল্পনা সই হয়েছে।

এ ছাড়া বিএনপি ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সঙ্গে চীনের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দুটি চুক্তি এবং একটি সমঝোতা স্মারকও সই হয়েছে। একই সঙ্গে অত্যন্ত সফলভাবে একটি বিনিয়োগ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সংযোগ জোরদারের লক্ষ্যে বন্দরভিত্তিক মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট কানেক্টিভিটি এবং চীন-বাংলাদেশ-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর (বিসিআইএম)–সংক্রান্ত সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

তিস্তা মহাপরিকল্পনায় কারিগরি সহায়তা দেবে চীন

তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। চীন সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনায় সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা যেকোনো বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ। প্রকল্পটি বাস্তবসম্মত ও কার্যকর কি না, তা নির্ধারণের পরই বাস্তবায়নের পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এ ছাড়া সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদী ড্রেজিং এবং আধুনিক প্রযুক্তি বিনিময়ের ক্ষেত্রেও দুই দেশ সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছে।

এ ছাড়া ব্রিকস, এসসিও এবং আরসিইপিতে বাংলাদেশের যোগদানের প্রচেষ্টায় চীন পূর্ণ সহযোগিতা করবে বলে আশ্বাস দিয়েছে।

কী কী চুক্তি সই হয়েছে

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে উন্নয়ন সহযোগিতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং সাংস্কৃতিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আটটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ), তিনটি চুক্তি, একটি প্রোটোকল এবং একটি যৌথ কর্মপরিকল্পনা সই হয়েছে।

এগুলোর মধ্যে রয়েছে, উন্নয়ন সহযোগিতায় চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে উন্নয়নমূলক সহযোগিতা চুক্তি, মংলা বন্দর সুবিধা প্রকল্প সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণের জন্য কাঠামো চুক্তি, মানবসম্পদ উন্নয়ন সহযোগিতা পরিকল্পনার যৌথ বাস্তবায়নের জন্য সমঝোতা স্মারক, চীন সরকার এবং বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ রূপায়ণের বিষয়ে সমঝোতাপত্র, বাংলাদেশ থেকে চীনে টাটকা কাঁঠাল রফতানির জন্য ফাইটোস্যানিটারি রিকোয়ারমেন্টস প্রোটোকল এবং চায়না মিডিয়া গ্রুপ ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের মধ্যে সহযোগিতা গভীর করার সমঝোতা স্মারক।

এছাড়া, চায়না মিডিয়া গ্রুপ এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝোতাপত্র, সিনহুয়া নিউজ এজেন্সি ও বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) মধ্যে সমঝোতাপত্র, সিনহুয়া নিউজ এজেন্সির সঙ্গে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সমঝোতা, চীনের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে চীনা ভাষা শিক্ষায় সহযোগিতাসংক্রান্ত চুক্তি, বৃত্তিমূলক শিক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে সমঝোতাপত্র, সবুজ উন্নয়নে বিনিয়োগের প্রসারে সহযোগিতা সমঝোতা, বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে যৌথ কর্মপরিকল্পনা, চট্টগ্রাম শিল্পাঞ্চলে ডেভেলপার ও ল্যান্ড লিজ চুক্তি, মোংলা বন্দর অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নে সহযোগিতা সমঝোতা, সিসিপিআইটির বিনিয়োগ সহযোগিতা চুক্তি এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে বিনিময় ও সহযোগিতাসংক্রান্ত সমঝোতাও সই হয়েছে।

চীন সফর নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জানান, এবারের চীন সফর আগের সফরগুলোর চেয়ে গুণগতভাবে আলাদা। কেননা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুই-তৃতীয়াংশ জনসমর্থন নিয়ে গঠিত সরকারের পক্ষ থেকে এই সফর করেছেন। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ছাড়াও দেশটির অর্থমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।

তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্ককে ‘সামগ্রিক কৌশলগত অংশীদারত্ব’ থেকে আরও উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে চীনের বিনিয়োগ এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণ নিয়ে গুরুত্বসহকারে আলোচনা হয়েছে।

জিডিআইয়ে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি

প্রায় চার বছর ধরে নানা কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর অবশেষে চীনের বহুল আলোচিত বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ ‘গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ (জিডিআই)-এ যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এবং পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বেইজিংয়ের ধারাবাহিক চেষ্টা সত্ত্বেও ঢাকা এতে চূড়ান্ত সই করা থেকে বিরত ছিল।

চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বিশ্ব নিয়ে ভাবনার অংশ হিসেবে চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগ রয়েছে। এগুলো হলো—গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (জিডিআই), গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ (জিএসআই), গ্লোবাল সিভিলাইজেশন ইনিশিয়েটিভ (জিসিআই) এবং গ্লোবাল গভর্ন্যান্স ইনিশিয়েটিভ (জিজিআই)। বাংলাদেশ এর একটি উদ্যোগে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে।

চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে (বিআরআই) অংশগ্রহণের প্রায় এক দশক পর এবার বেইজিংয়ের আরেক গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক উদ্যোগ গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভে (জিডিআই) যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রীর সফরে এ-সংক্রান্ত একটি সমঝোতা সই হয়েছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জিডিআইয়ে অন্তর্ভুক্তি বাংলাদেশকে চীনের আরও কাছে নিয়ে যাবে।

চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মোট ১৭টি এমওইউ হয়েছে। তারপরও যদি কেউ বলে কিছু আনতে পারেনি, তা আসলে ঠিক হবে না। বরং অনেক বেশি হয়েছে। আমি মনে করি, অঙ্গীকারের দিক থেকে যদি দেখা হয়, তাহলে অঙ্গীকারের কোনো শেষ নেই, প্রচুর আছে। মূল প্রশ্ন হলো, সেগুলো বাস্তবায়ন করতে পারবো কি না। চীনের পক্ষ থেকে তো সমস্যা হবে না। কিন্তু আমাদের সেগুলো গ্রহণ করার মতো, সেগুলোকে কাজে লাগানোর মতো দক্ষতা সবসময় থাকে না।’

তিনি বলেন, ‘সে জন্য অনেক সময় অনেক প্রতিশ্রুতি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয় না। সেজন্য আমাদের সেই জায়গাটার ব্যাপারে চেষ্টা করতে হবে, আমাদের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। আর যেসব কাজ করবো বলেছি, সেসব কাজ সত্যি সত্যি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। আমরা অনেক সময় বলি, তারপর করি না। সেজন্য ‘অনেক অনেক’ বলে টাকার অঙ্কের কথা উচ্চারণ না করে, যেগুলো করা হচ্ছে, সেগুলো কাজে লাগাতে হবে।’