প্রচ্ছদ জাতীয় ফের আলোচনায় সাংবাদিক পেটানো সেই আলি আকবর

ফের আলোচনায় সাংবাদিক পেটানো সেই আলি আকবর

ফের আলোচনায় এসেছেন বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের ১৫ ব্যাচের কর্মকর্তা ডিআইজি আলি আকবর খান। ২০ বছর আগে চট্টগ্রামে স্টেডিয়ামে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ চলাকালে সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালিয়ে দেশ-বিদেশে আলোচনার জন্ম দেন তিনি। ওই সময় ছিলেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) উপকমিশনার। এবার অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি না পেয়ে নিজের প্রতি বৈষম্যের অভিযোগ তুলে স্বেচ্ছায় অবসরের আবেদন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন তিনি।

গত ১ জুন ডিআইজি আলি আকবর খানকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডির ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এর দুদিনের মাথায় গত বৃহস্পতিবার তিনি স্বেচ্ছায় চাকরি থেকে অবসরের জন্য পুলিশ সদর দপ্তরের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। তবে তার আবেদনপত্র নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এসেছে সেই আলোচনা।

ফের আলোচনায় সাংবাদিক পেটানো সেই আলি আকবর
‘মব সৃষ্টি করে’ গ্রেপ্তার বিএনপি নেতাকে ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ
তার আবেদনপত্রটি প্রকাশ পাওয়ার পর কেউ কেউ ফেসবুকে লিখেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে চাকরি করে কেউ পদোন্নতি না পেয়ে এভাবে আবেদনপত্র লিখতে পারেন না। এতে শৃঙ্খলা ভঙ্গ হয় এবং ঊর্ধ্বতনদের প্রতি অধীনদের আস্থাহীনতা প্রকাশ পায়। এতে বাহিনীর শৃঙ্খলা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে অনেকে আবার আলি আকবর খানের এ উদ্যোগকে প্রতিবাদ হিসেবে দেখছেন। তাদের অনেকেই বলছেন, সরকারি চাকরিতে পদোন্নতিতে অনেকে যে বঞ্চিত ও বৈষম্যের শিকার হন, এ আবেদনে সেটাই সামনে এসেছে। অনেকে হয়তো হতাশা-ক্ষোভ নিয়ে চাকরি থেকে নীরবে চলে গেলেও এভাবে লেখেন না।

ফের আলোচনায় সাংবাদিক পেটানো সেই আলি আকবর
জামায়াত-এনসিপি ঠেকাতে মাঠে ফেরার ছক আ.লীগের
এসব আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে ২০ বছর আগের একটি ঘটনা সামনে এসেছে। ২০০৬ সালের ১৬ এপ্রিলে চট্টগ্রামের বিভাগীয় স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট ম্যাচ চলছিল; কিন্তু পুলিশ স্টেডিয়ামে সাংবাদিকদের ঢুকতে বাধা দেওয়ার জেরে সাংবাদিকরা স্টেডিয়ামে ক্যামেরা রেখে প্রতিবাদ করেন। ওই ঘটনার জেরে সিএমপির তৎকালীন উপকমিশনার (পোর্ট) আলি আকবর খানের নেতৃত্বে সাংবাদিকদের ওপর হামলা হয় এবং ক্যামেরা ভাঙচুর করা হয়। আন্তর্জাতিক ম্যাচ চলাকালে এমন ঘটনার ছবি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে পুলিশ কর্মকর্তা আলি আকবর খান প্রবীণ সাংবাদিক জহিরুল হককে ঘুসি ও শারীরিক লাঞ্ছনার ছবি ছড়িয়ে পড়লে নিন্দার ঝড় ওঠে।

ওই ঘটনায় হামলায় অন্তত ১৫ জন সাংবাদিক আহত হন। গতকাল শুক্রবার তাদের মধ্যে ৩ জনের সঙ্গে কথা বলেছে কালবেলা। তারা বলেন, তৎকালীন উপকমিশনার আলি আকবর খানের নেতৃত্বে পুলিশের হামলার সময় মাঠে অস্ট্রেলিয়ার খেলোয়াড়রা ছিলেন। তাদের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার তৎকালীন অধিনায়ক রিকি পন্টিং নিজেও হামলার ছবি তুলেন। এমন ঘটনায় তখন দেশের ভাবর্মূর্তি ক্ষুণ্ন হয়।

একজন সাংবাদিক জানান, পুরো ঘটনা নিয়ে দেশ-বিদেশে তোলপাড় হয়। দেশের সাংবাদিক সংগঠনগুলো প্রতিবাদ করেন এবং ওই ঘটনায় বিভিন্ন তদন্ত কমিটি হয়। পাশাপাশি চট্টগ্রামের সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে মামলাও হয়েছিল; কিন্তু কোনো প্রতিবেদনই প্রকাশিত হয়নি।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই সময়ে আলি আকবর খান প্রভাবশালী কর্মকর্তা ছিলেন। তার বিরুদ্ধে বড় ধরনের বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি। তবে ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুলিশ কর্মকর্তা আলি আকবর খানকে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করে রাখা হয়। ২০২২ সালের এপ্রিলে তাকে চাকরিচ্যুত করে সরকার।

তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হওয়ার পরের মাসেই তিনি চাকরি ফিরে পান। সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগের ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। গত ১ জুন তিনি সিআইডির ভারপ্রাপ্ত চিফ হিসেবে দায়িত্ব পান।

পুলিশ সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পাঁচজন ডিআইজিকে অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন করে। পদোন্নতির ওই প্রজ্ঞাপনে নিজের নাম না দেখে ক্ষিপ্ত হন আলি আকবর খান। এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বরাবর স্বেচ্ছায় অবসরের জন্য আবেদন করেন এবং আবেদনে এর কারণও উল্লেখ করেন। আবেদনপত্রটি সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপারের (প্রশাসন) মাধ্যমে পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়।

আলি আকবর খান তার আবেদনে বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বিগত সরকার বাংলাদেশ পুলিশের সর্বপ্রথম সদস্য হিসেবে তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করে এবং ২০২২ সালের ৭ এপ্রিল চাকরিচ্যুত করে। প্রায় ১৬ বছর বঞ্চিত হয়ে তিনি ২০২৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর চাকরিতে পুনর্বহাল হন।

আবেদনপত্রে তিনি বলেন, ‘১৯৯৫ সালে চাকরিতে যোগদানের পর থেকে অদ্যাবধি সততা, দক্ষতা ও সম্মানের সঙ্গে চাকরি করে আসছি। অদ্য ৪ জুন ২০২৬ (গত বৃহস্পতিবার) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে যারা পদোন্নতি পেয়েছেন সে তালিকায় আমার নাম না থাকায় আমি নিশ্চিত যে, আমার জানা-অজানা কোন অযোগ্যতার কারণে আমি সর্বশেষ বৈষম্যের শিকার হলাম। এমতাবস্থায়, নিজের অযোগ্যতা নিয়ে সরকারের বোঝা হওয়ার পরিবর্তে আমি সরকারি চাকরি আইন-২০১৮-এর ৪৪ ধারা মতে আগামী ২ জুলাই চাকরি হতে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণে ইচ্ছুক।’

ওই আবেদনে তিনি ২ জুলাই থেকে এক বছরের পিআরএল মঞ্জুরের জন্যও অনুরোধ করেন।

সরকারি চাকরি আইন-২০১৮ এর ৪৪ ধারায় বলা হয়েছে, চাকরির মেয়াদ ২৫ (পঁচিশ) বৎসর পূর্ণ হলে যে কোনো সময় একজন সরকারি কর্মচারী অবসর গ্রহণের অভিপ্রেত তারিখের অন্যূন ৩০ (ত্রিশ) দিন আগে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের কাছে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের অভিপ্রায় লিখিতভাবে ব্যক্ত করে অবসর গ্রহণ করতে পারবেন।

এই ধারার উপধারা ২ এ বলা হয়েছে, ব্যক্ত করা অভিপ্রায় চূড়ান্ত হিসাবে গণ্য হবে এবং তা সংশোধন বা প্রত্যাহার করা যাবে না।

অবশ্য পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ওই আবেদনটি শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পৌঁছেছে কি-না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের কোনো কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিক মুখ খুলছেন না। তবে পুলিশের এক কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেছেন, আলি আকবর খানের চাকরির মেয়াদ হয়তো ২ থেকে ৩ মাস রয়েছে। পদোন্নতি না পেয়ে নিজের প্রতি বৈষম্যের অভিযোগ তুললেও তিনি জুলাই মাস থেকে স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়ার আবেদন করেছেন।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মুহাম্মদ নুরুল হুদা মনে করছেন, বৈষম্যের শিকার বলে অবসরে যাওয়ার আবেদন করা ঠিক হয়নি। কোনো অফিসার বৈষম্যের শিকার হলে তা বলার অধিকার রয়েছে। কিন্তু সেটা বাহিনীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত এবং নির্ধারিত ফোরামে বলা উচিত। এভাবে চিঠি দিয়ে জানানোটা ঠিক হয়নি। এতে পুলিশের মতো শৃঙ্খলিত বাহিনীতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে।

পুলিশের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, সিআইডি প্রধানের পদটি অতিরিক্ত আইজিপির। হয়তো ডিআইজি আলি আকবর খান ধারণা করেছেন যে অতিরিক্ত আইজিপি পদে পাঁচজন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়ায় সিআইডি চিফ পদে তার আর থাকা হবে না এবং তারও পদোন্নতির সুযোগও নেই। এ জন্য ক্ষোভে বা হতাশা থেকে পদোন্নতিতে নিজের প্রতি বৈষম্যের বিষয়টি সামনে এনে বিতর্কের সৃষ্টি করতে পারেন।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, প্রয়োজনে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে সরকারি কর্মকর্তারা স্বেচ্ছায় অবসরের আবেদন করে থাকেন। তবে ডিআইজি আলি আকবরের আবেদনের শব্দচয়ন পুলিশ প্রশাসন বিব্রত অবস্থায় পড়বে এবং পদোন্নতি কার্যক্রম নিয়ে বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।