প্রচ্ছদ অপরাধ ও বিচার স্বর্ণময়ীর আত্মহত্যার ঘটনায় নতুন মোড়, কী লেখা ছিল নোটবুকে?

স্বর্ণময়ীর আত্মহত্যার ঘটনায় নতুন মোড়, কী লেখা ছিল নোটবুকে?

অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘ঢাকা স্ট্রিম’-এর গ্রাফিক্স ডিজাইনার স্বর্ণময়ী বিশ্বাসের (২৮) আত্মহত্যার ৬ মাস পর নতুন তথ্য সামনে এসেছে। পুলিশের তদন্তে সহকর্মীর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। চূড়ান্ত প্রতিবেদন বলছে, পারিবারিক বৈষম্যের কারণে অভিমান থেকে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন স্বর্ণময়ী, যা লিপিবদ্ধ করে গিয়েছিলেন মারা যাওয়ার আগে।

পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, গত ১৪ এপ্রিল তদন্তকারী কর্মকর্তা শেরেবাংলা নগর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সাইফুল ইসলাম আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি জমা দিয়েছেন। ১৯ এপ্রিল আদালত সেটি গ্রহণ করেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মৃত্যুর আগে লেখা মাত্র ১৪৬ শব্দের এই চিরকুটে জীবনের নানা হতাশার কথা বলেছিলেন স্বর্ণময়ী। এক জায়গায় তিনি লিখেছেন, ‘মায়ের জগতে আমি কোথাও ছিলাম না, ছিলাম শুধু দায়িত্ব হয়ে।’

গত বছরের ১৮ অক্টোবর শেরেবাংলা নগরের সোবহানবাগের নাভানা টাওয়ারের বাসা থেকে স্বর্ণময়ী বিশ্বাসের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সে সময় ঢাকা স্ট্রিমের তৎকালীন বাংলা কনটেন্ট এডিটর আলতাফ শাহনেওয়াজকে দায়ী করেন সহকর্মীরা। আত্মহত্যার প্ররোচনা ও যৌন হয়রানির বিচার দাবিতে তারা মানববন্ধনও করেন। আলতাফ শাহনেওয়াজের চাকরি যাওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘ অনলাইন প্রচারণায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার স্ত্রী ও সাবেক গণমাধ্যমকর্মী ফাতেমা আবেদীন নাজলার ব্যবসাও। প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম তার ক্যাটারিং সার্ভিস এন’স কিচেন।

তবে পুলিশের চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘ তদন্ত ও ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পর্যালোচনার পর পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে-পরিবারের ওপর গভীর অভিমান থেকেই স্বর্ণময়ী আত্মহননের পথ বেছে নেন। ঘটনাস্থল থেকে রক্তমাখা ব্লেড ও প্রিন্টের ওড়না, নোট বুক ও ডায়েরি উদ্ধার করা হয়। নোটবুকের দ্বিতীয় পাতায় স্বর্ণময়ীর নিজের হাতে লেখা আবেগঘন বার্তা পাওয়া যায়।

ঢাকা স্ট্রিমে কাজ করতে গিয়ে আমি চরমভাবে অফিসের নোংরা পলিটিক্সের শিকার হয়েছি। এছাড়া সামাজিকভাবে হেয় করতে আমার নামে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়েছিল। এতে আমার ও আমার পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে— আলতাফ শাহনেওয়াজ

এই নোটবুকে তিনি লিখেছেন, ‘সবাই এটাই ভাবছে— আমার হইতে এটা আশা করেনি। মজার ব্যাপার হলো আমি নিজেও আশা করিনি। কি লিখব বুঝতে পারছি না। মাথার মধ্যে শুধু অভিমান। আর অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর নেই কারও কাছে। চলে যাওয়ার প্ল্যান করেছি অনেক দিন আগে। মাঝে দাদাভাইয়ের বিয়ে বেঁধে গেল। এত বাধার মধ্যে আমি বাধা হইতে চাইলাম না। তাই শেষবারের মতো তোমাদের একটু গুছিয়ে দিয়ে গেলাম। আমি না থাকলে তোমাদের দিব্যি চলবে। বরং আমি থাকলেই জ্বালা। আমি যাদের ওপর খুব ভরসা করেছিলাম-তারা খুব নড়বড়ে। কিন্তু আমি ভেবেছি শক্ত।’

স্বর্ণময়ী আরও লেখেন, ‘মা দাদাভাই ছাড়া কোনো দিন কিছু চিনলই না। মা আমার মুখের উপরই বলেন, তোমাকে নিয়ে আমি ভাবি না। আমার ছেলেকে নিয়ে যত চিন্তা।’ কেন? মা আমাকে নিয়ে শুধুমাত্র এটা ভাবে যে, আমার জন্য তার ঘাড়ে যেন কোনো দোষ না চাপে। মায়ের জগতে তার ছেলে বাপি আর মানুষ। ওই জগতে আমি কোথাও ছিলাম না। ছিলাম শুধু দায়িত্ব হয়ে। সবার দায়িত্ব।’

পুলিশের প্রতিবেদনে ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলা হয়, ঘটনার দিন সকাল থেকেই স্বর্ণময়ী অস্বাভাবিক আচরণ করতে থাকেন। বিষয়টি বড়ভাই গ্রামে থাকা বাবা-মাকে ফোন করে জানান। বিকালের দিকে ব্লেড দিয়ে স্বর্ণময়ী বাম হাতের কনুইয়ে একাধিক পোজ দেন। বিকাল অনুমান সাড়ে ৪টার দিকে স্বর্ণময়ীর জেঠিমা ও তার ছেলে স্বর্ণময়ীদের বাসায় আসেন। তখন রক্তাক্ত হাত কাপড় দিয়ে ঢেকে তিনি সবার সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণ করেন। এক পর্যায়ে তার প্যান্টে রক্তের দাগ দেখতে পান জেঠিমা। পোশাক পরিবর্তনের কথা বলে রুমে ঢুকে স্বর্ণময়ী দরজা বন্ধ করে দেন। অনেক ডাকাডাকি করার পরও দরজা না খোলায় বিকল্প চাবি দিয়ে দরজা খোলা হয়। ভেতরে প্রবেশ করে স্বজনরা দেখতে পায়-স্বর্ণময়ী ওড়না প্যাঁচিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আছেন। ধানমণ্ডির পপুলার হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) শফিকুর রহমান গণমাধ্যমকে এই চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এ ছাড়া শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ জানায়, শ্বাসরোধে স্বর্ণময়ীর মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ডিএনএ ল্যাবের ভ্যাজাইনাল সোয়াব পরীক্ষায় ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায়নি।

এর আগে স্বর্ণময়ীর লাশ উদ্ধারের ঘটনায় শেরেবাংলা নগর থানায় অপমৃত্যুর মামলা করেন তার বড়ভাই সৌরভ বিশ্বাস। দুই ভাই-বোনের মধ্যে স্বর্ণময়ী ছিলেন ছোট। এ ব্যাপারে ঢাকা স্ট্রিমের তৎকালীন বাংলা কনটেন্ট এডিটর আলতাফ শাহনেওয়াজ গণমাধ্যমকে বলেন, ঢাকা স্ট্রিমে কাজ করতে গিয়ে আমি চরমভাবে অফিসের নোংরা পলিটিক্সের শিকার হয়েছি। এছাড়া সামাজিকভাবে হেয় করতে আমার নামে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়েছিল। এতে আমার ও আমার পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে।

সূত্র : The Daily Campus