
দেয়াল লিখন ও আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মুখোমুখি অবস্থানকে কেন্দ্র করে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখনো থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। রাজধানীর শাহবাগে বৃহস্পতিবার ছাত্রদল ও শিবিরের মারামারি এবং ডাকসুর দুই নেতাকে মারধরের পর ওইদিন রাতেই দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ করেছে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির। এদিকে ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখতে কোনো ধরনের দেয়াল লিখন, সংঘাত বা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড থেকে সবাইকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কৃর্তপক্ষ। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা তদন্ত করতে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুই পক্ষ সহনশীল হলেই ক্যাম্পাসে শান্তি ফিরবে। অন্যথায় তা আরও অস্থিতিশীল হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
এদিকে, পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে রাজধানীর শাহবাগ থানার ভেতরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির (ডুজা) অন্তত ১০ জন সদস্যের ওপর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের হামলার তীব্র নিন্দা, প্রতিবাদ এবং জড়িতদের আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকদের সংগঠনগুলো। এ ছাড়া জড়িতদের বিরুদ্ধে দলীয়ভাবে সাংগঠনিক ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত ছাত্রদলের সব কর্মসূচি বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে ডুজা। গতকাল শুক্রবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে এ হামলার ঘটনার বিচার চেয়ে স্মারকলিপি প্রদান শেষে সংগঠনটির সভাপতি মানজুর হোসাইন মাহি বর্জনের সিদ্ধান্ত জানান। মানজুর হোসাইন মাহি বলেন, ‘সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রদলের যেসব নেতাকর্মী হামলা করেছিল, তাদের চিহ্নিত করে দল থেকে ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত ছাত্রদলের সব কর্মসূচি আমরা বর্জন করব।’ যদিও এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির। ঘটনার তদন্তে চার সদস্যের কমিটি গঠন করেছে ছাত্রদল।
চট্টগ্রাম সিটি কলেজে দেয়ালের গ্রাফিতিতে ‘ছাত্র’ শব্দটি মুছে সেখানে ‘গুপ্ত’ লেখাকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের সঙ্গে শিবিরের দফায় দফায় সংঘর্ষের পর এর রেশ ছড়িয়ে পড়ে দেশের অন্য ক্যাম্পাসগুলোতে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, কুমিল্লা, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বড় বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজগুলোতেও ছাত্রদল দেয়ালে দেয়ালে ‘গুপ্ত’ গ্রাফিতি আঁকে। ক্যাম্পাসের বাইরে জেলা-উপজেলা পর্যায়েও ছাত্রদল-শিবির পাল্টাপাল্টি হামলার অভিযোগ এনে বিক্ষোভ করে। এতে বিভিন্ন জায়গায় দুই সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এর রেশ কাটার আগেই গত বৃহস্পতিবার আধিপত্য বিস্তার ও ‘গুপ্ত’ নিয়ে পাবনার ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ, কুমিল্লা পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটে ছাত্রদল ও শিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয়পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হন।
অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে কটূক্তির প্রতিবাদে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর শাহবাগে অবস্থান নেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এ সময় তারা শিবিরের বিরুদ্ধে নানা স্লোগান দিতে থাকেন। একপর্যায়ে ডাকসু নেতা এবি জুবায়ের ও মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদের নেতৃত্বে শিবিরের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গেলে তাদের মারধর করা হয়। হামলার মুখে শাহবাগ থানার ভেতরে আশ্রয় নেন মুসাদ্দিক ও জুবায়ের। হামলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত বিভিন্ন গণমাধ্যমের ১০ জন সাংবাদিকও আহত হন। ঘটনার পর রাত ৯টার দিকে ঘটনাস্থলে আসেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব এবং ডাকসুর ভিপি ও ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতা সাদিক কায়েম। এ সময় উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।
এসব ঘটনার পর বৃহস্পতিবার রাতেই ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ করে ছাত্রদল-শিবির। চট্টগ্রামে বিক্ষোভ শেষে সমাবেশে শিবির নেতা ও চাকসুর ভিপি ইব্রাহীম রনি বলেন, আমাদের আজ পড়ার টেবিলে থাকার কথা ছিল। ৫ আগস্টের পর আমরা ভেবেছিলাম সন্ত্রাসের রাজনীতি শেষ হবে। কিন্তু তারা আবারও সন্ত্রাসের রাজনীতি শুরু করতে চায়। এর কারণ তাদের কোনো সাংগঠনিক ভিত্তি নেই। অল্প সময়েই এ সরকার একটি ব্যর্থ সরকারে পরিণত হয়েছে, এটি এখন সবার কাছে স্পষ্ট।
এদিকে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীবান্ধব ও শান্তিপূর্ণ শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখতে কোনো ধরনের দেয়াল লিখন, সংঘাত বা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড থেকে সবাইকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদদীন। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের নেতৃত্বে জকসু ও সব ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে একটি সর্বদলীয় সভা আগামী রোববার আয়োজনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সকালে জবি উপাচার্যের কার্যালয়ে ‘দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায়’ এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদদীন বলেন, কোনো শিক্ষার্থী বা সংগঠন যেন উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে না পড়ে এবং অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা থেকে বিরত থাকে। পারস্পরিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে হবে। কেউ যেন কারও প্ররোচনায় বিভ্রান্ত না হয়।
এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। ঢাবি ক্যাম্পাসের ঘটনায় তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠনসহ সবাইকে দেয়াল লিখন থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের উপপরিচালক ফররুখ মাহমুদ স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঢাবি ক্যাম্পাসে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে শান্ত ও সংযত থাকার আহ্বান জানানো হলো। এ ঘটনা তদন্তের জন্য সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক শিক্ষক ড. মো. আনোয়ার হোসেনকে আহ্বায়ক ও সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক শিক্ষক জাওয়াদ ইবনে ফরিদকে সদস্য সচিব করে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন আইসিটি বিশেষজ্ঞ ও সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. মোসাদ্দেক খান। কমিটি এরই মধ্যে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে এবং আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলেছে। গঠিত তদন্ত কমিটিকে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
জামায়াত-শিবিরের নিন্দা: রাজধানীর শাহবাগ থানায় ঢুকে ডাকসু নেতাদের ওপর হামলা, পাশাপাশি পাবনা ও কুমিল্লায় ছাত্রশিবিরের ওপর হামলার অভিযোগ এনে এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবির।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘শাহবাগ থানার ভেতরে ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী, সমাজসেবা সম্পাদক এবি যুবায়ের এবং ডাকসুর নারী নেত্রী জুমার ওপর ছাত্রদলের বর্বরোচিত হামলা অত্যন্ত দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত। হাজার হাজার শিক্ষার্থীর নির্বাচিত জনপ্রিয় প্রতিনিধিদের ওপর এ ন্যক্কারজনক হামলা গণতান্ত্রিক সভ্য সমাজে মেনে নেওয়া যায় না। আমরা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’
ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম ও সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, ‘মূলত রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যর্থতার ফলে সৃষ্ট জনরোষকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতেই পরিকল্পিতভাবে ক্যাম্পাসগুলো অস্থিতিশীল করছে ছাত্রদল। অবিলম্বে শাহবাগ থানার সিসিটিভি ফুটেজ দেখে চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে দাবি আদায়ে বাধ্য করবে।’










































