
চব্বিশের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পরিবর্তন হলেও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত অনেক কর্মকর্তা এখনও স্বপদে বহাল রয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, আওয়ামী সরকারের সহযোগী হিসেবে অভিযুক্ত এসব কর্মকর্তার অনেকেই পাচ্ছেন পদোন্নতি। এমনই একজন টেলিকম ক্যাডারের কর্মকর্তা মির্জা কামাল আহম্মদ।
জুলাই আন্দোলনের সময় ইন্টারনেট শাটডাউনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে কামাল আহম্মদের বিরুদ্ধে। এই অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও একাধিকবার হাজিরা দিয়েছেন তিনি। এবার পেলেন পদোন্নতি।
বর্তমানে মির্জা কামাল আহম্মদ বিটিসিএলের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (রক্ষণাবেক্ষণ ও চালনা) পদে কর্মরত রয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ৭ সেপ্টেম্বর (সোমবার) ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে টেলিকম ক্যাডারের ২০ জন কর্মকর্তাকে একযোগে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। গত ৭ সেপ্টেম্বর দেওয়া পদোন্নতির তালিকার ৫ নম্বরে রয়েছে মির্জা কামাল আহম্মদের নাম। পদোন্নতি পেয়ে এই কর্মকর্তা পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) চতুর্থ গ্রেড থেকে জিএম (ইঞ্জিনিয়ার) তৃতীয় গ্রেডে উন্নীত হয়েছেন।
জুলাই আন্দোলনের সময় ইন্টারনেট শাটডাউনের সঙ্গে জড়িতের থাকার অভিযোগের পাশাপাশি সরকারি সাবমেরিন কেবলে কোম্পানির এমডির দায়িত্বে থাকা অবস্থায় মির্জা কামালের বিরুদ্ধে ছিল বিস্তর অভিযোগ। নানা অভিযোগে তাকে পদ থেকে সরিয়ে দেয় অন্তর্বর্তী সরকার।
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা হয় ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে। জুলাই আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত টানা ২২ দিন নানা স্তরে ইন্টারনেট শাটডাউন করে তৎকালীন সরকার। এক অদৃশ্য ‘তথ্য-অন্ধকার’ সৃষ্টির মাধ্যমে গণহত্যা চলে।
বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সেই গণহত্যার মামলায় সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলককে গ্রেপ্তার করা হলেও, ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি ইন্টারনেট শাটডাউনের সঙ্গে জড়িত অনেক সরকারি ককর্তার বিরুদ্ধে।
সেই সময় জুনাইদ আহমেদ পলককের নির্দেশে ইন্টারনেট শাটডাউন করেছিলেন সরকারি সাবমেরিন কেবল কোম্পানি (বিএসপিএলসি) তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মির্জা কামাল আহম্মদ। এই অভিযোগের বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাকে কয়েকবার ডাকা হয়।
ট্রাইব্যুনালকে কামাল আহম্মদ বলেন, ‘১৮ জুলাই রাতে প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক আমাকে ফোন দিয়ে ইন্টারনেট বন্ধ করার নির্দেশনা দেন, তার নির্দেশে ১৫ মিনিটের মধ্যে সাবমেরিন দুটো শাটডাউন করা হয়।’
ট্রাইব্যুনালকে জুনাইদ আহমেদ পলকের নির্দেশে ইন্টারনেট বন্ধ করার কথা জানালেও, বিএসসিপিএলসির অনেকের অভিযোগ, জুলাই আন্দোলনের সময়ে মন্ত্রণালয়ের কোনো আদেশ ছাড়াই শুধু পলকের মৌখিক নির্দেশে তিনি দেশের দুটি সাবমেরিন কেবল বন্ধ করেন। বরং আওয়ামী সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকার কারণেই তিনি ইন্টারনেট বন্ধের ক্ষেত্রে বেশি আগ্রহী ছিলেন।
ইন্টারনেট শাটডাউনের সঙ্গে জড়িত এই কর্মকর্তা আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য সাজ্জাদুল হাসানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তার ক্ষমতার বলে তিনি নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
ইন্টারনেট শাটডাউন ছাড়াও সাবমেরিন কেবলের এমডির দায়িত্বে থাকা অবস্থায় মির্জা কামালের বিরুদ্ধে ছিল বিস্তর অভিযোগ। তিনি ২০১৬ সালে টেলিকম ক্যাডার থেকে প্রেষণে উপমহাব্যবস্থাপক হিসেবে বিএসসিপিএলসিতে যোগ দেন। ক্যাডার সার্ভিসে কোনো পদোন্নতি না পেলেও মাত্র দুই বছরের মধ্যেই তিনি জোর তদবির চালিয়ে উপমহাব্যবস্থাপকের পরিবর্তে মহাব্যবস্থাপক হিসেবে প্রেষণাদেশ করিয়ে জিএম (প্রশাসন ও অর্থ) পদটিতে চেপে বসেন।
অন্যদিকে বিএসসিপিএলসিতে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০০৯ সালে কোম্পানিতে উপমহাব্যবস্থাপক হিসেবে যোগদান করা অনেক কর্মকর্তা গত ১৭ বছরেও মহাব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি পাননি, একই পদে স্থবির হয়ে রয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, মহাব্যবস্থাপক পদে থেকে মির্জা কামাল কোম্পানির আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। একই সঙ্গে এফডিআর বাণিজ্য ও কোম্পানির বিপুল পরিমাণ বকেয়ার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। মির্জা কামাল যখন বকেয়া আদায় কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন, তখন দুই বছরে কোম্পানির বকেয়া বাড়ে ১৬০ কোটি টাকা। বকেয়া আদায় না করলেও নিয়মিতই বকেয়া আদায়ের সভা করতেন মির্জা কামাল এবং ৮০টির বেশি সভায় প্রায় ২০ লাখ টাকার বেশি সম্মানী নিয়েছেন কমিটির সদস্যরা।
অন্যদিকে কোম্পানির ব্যাংকিং ও ইনভেস্টমেন্ট পলিসি না মেনে নিজস্ব স্বার্থে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোতে বিনিয়োগ করা হয়েছে। শুধু এস আলমের ঝুঁকিপূর্ণ তিন ব্যাংকে বিনিয়োগ করা হয়েছে প্রায় ৫০ কোটি টাকা।
মির্জা কামাল এমডি থাকায় অবস্থায় সাবমেরিন কেবল কোম্পানির আয় ও মুনাফায় ধস দেখা দেয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মির্জা কামাল এমডি থাকা অবস্থায় কোম্পানির আয় (রেভিনিউ) কমে দাঁড়ায় ৩৯৮ কোটি টাকা, যা ২০২২-২৩ হিসাব বছরে ছিল ৫১৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে আয় কমেছে ১১৩ কোটি টাকা। আয় কমে যাওয়ায় ২০২৩-২৪ হিসাব বছরে বিএসসিপিএলসির নিট মুনাফা কমে দাঁড়ায় ১৮২ কোটি টাকা। যেখানে আগের অর্থবছরে কোম্পানিটি মুনাফা করেছিল ২৭৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে মুনাফা কমে ৯৭ কোটি টাকা।
এমন একজন কর্মকর্তার পদোন্নতিতে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন পদোন্নতিপ্রাপ্ত অন্য কর্মকর্তারাও। কীভাবে এবং কার তদবিরে তিনি এই পদোন্নতি পেলেন, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলে উঠছে প্রশ্ন।
এর আগে জুলাই আন্দোলনে আন্দোলনে ইন্টারনেট বন্ধ এবং বিএসপিপিএলসিতে থাকা অবস্থায় নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার অপরাধে মির্জা কামালকে সাবমেরিন কেবলের এমডি পদ থেকে সরিয়ে দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এমডি পদ থেকে সরিয়ে নেওয়া হলেও কোনো কার্যকর শাস্তির আওতায় আনা হয়নি এই কর্মকর্তাকে।
সম্প্রতি তৃতীয় গ্রেডে পদোন্নতি পাওয়ার পর সাবমেরিন কেবলের এমডি পদে ফিরতে জোরালোভাবে চেষ্টা চালাচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে নানা অনিয়মে অভিযুক্ত মির্জা কামাল আহম্মদের বিরুদ্ধে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে মির্জা কামাল আহম্মদের মোবাইল নম্বরে কয়েকবার ফোন করলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। কিছুক্ষণ আবার কল দিলে কল ঢুকলেও তিনি কেটে দেন। তার বিরুদ্ধে ওঠা সুনির্দিষ্ট এসব অভিযোগের উত্তর জানতে চেয়ে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হয়। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি কোনো জবাব দেননি।









































