প্রচ্ছদ জাতীয় কী ঘটেছিল আপিল বিভাগে

কী ঘটেছিল আপিল বিভাগে

আদালতের কার্যক্রম শুরুর পর পরই একটি মামলায় আদেশ দেন আপিল বিভাগ। তথ্য গোপন ও প্রতারণার অভিযোগে আপিলকারী ও আইনজীবীকে ৫ লাখ টাকা করে জরিমানা (খরচা আরোপ) করা হয়। এরপর স্বাভাবিকভাবেই চলছিল অন্য মামলার কার্যক্রম। দুপুরে সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুব উদ্দিন খোকনের একটি মৌখিক আবেদন ঘিরে তৈরি হয় বিতণ্ডা। খোকন সকালে আইনজীবীকে করা জরিমানা মওকুফ করার আর্জি জানান আপিল বিভাগের কাছে। তার এই মৌখিক আবেদন শুনে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী জানিয়ে দেন আদালত যে আদেশ দিয়েছে তা পরিবর্তন হবে না। তখন মাহবুব উদ্দিন খোকন প্রধান বিচারপতিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনি দায়িত্ব নেয়ার পর আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে। বার সভাপতির এই বক্তব্যের পর প্রধান বিচারপতি খোকনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনি যা বলেছেন তা আদালত অবমাননার শামিল।

আপনি যেহেতু এত বড় কথা বলেছেন, আজকে আমি আর আদালতের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করবো না। এরপর প্রধান বিচারপতি ও অন্য চার বিচারপতি এজলাস ছেড়ে চলে যান। বন্ধ হয়ে যায় আপিল বিভাগের কার্যক্রম। পরে ঘটনার বিষয়ে বার এসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুব উদ্দিন খোকন, অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল পৃথক ব্রিফ করেন। এ ঘটনা ঘিরে গতকাল নানা আলোচনা ছিল আদালত অঙ্গনে। আপিল বিভাগে এ ধরনের ঘটনা এর আগে ঘটেছে এমনটি স্মরণ করতে পারেননি সিনিয়র অনেক আইনজীবী।

প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে আপিল বিভাগের কার্যক্রম চলার সময় সাংবাদিকরা উপস্থিত থাকতে পারেন না। সাংবাদিক সংগঠনগুলো বারবার দাবি জানালেও প্রবেশাধিকার উন্মুক্ত হয়নি। সাংবাদিকরা উপস্থিত না থাকায় দুই পক্ষের বক্তব্য এবং আইনজীবীদের বর্ণনা থেকেই ঘটনার বিষয় জানা যায়।

সকাল সাড়ে ৯টার পর প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে আপিল বিভাগের কার্যক্রম শুরু হয়। ৫ সদস্যের আপিল বেঞ্চে বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এস এম এমদাদুল হক, বিচারপতি ফারাহ মাহবুব এবং বিচারপতি মো. হাবিবুল গণি উপস্থিত ছিলেন।
কার্য তালিকার প্রথমেই ছিল যাত্রাবাড়ী থানার ৬৫ নম্বর ওয়ার্ডের নিকাহ রেজিস্ট্রার মিজানুর রহমান মুরাদের নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্ট বিভাগে রিট সংক্রান্ত আপিলের আইটেম। আপিলকারী মোহাম্মদ নুর আলম তথ্য গোপন করে একই বিষয়ে হাইকোর্ট বিভাগে একাধিক রিট আবেদন দায়ের করে আদালতের সঙ্গে প্রতারণার তথ্য তুলে ধরেন সরকার পক্ষের কৌঁসুলিরা। এই অভিযোগে রিটকারী মোহাম্মদ নুর আলম ও তার আইনজীবী সুফিয়া আহামেদকে পৃথকভাবে ৫ লাখ টাকা করে মোট ১০ লাখ টাকা খরচা আরোপ করেন আপিল বিভাগ। আগামী ৩০ দিনের মধ্যে এই অর্থ ঢাকা শিশু হাসপাতালে জমা দেয়ার নির্দেশ দেন আদালত।

আপিল আবেদনের বিষয়ে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক বলেন, ২০১৩ সালে অস্থায়ী কাজী নিয়োগকে কেন্দ্র করে এ মামলার সূত্রপাত। যাত্রাবাড়ী থানার ৬৫ নম্বর ওয়ার্ডের নিকাহ রেজিস্ট্রার মিজানুর রহমান মুরাদের নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে মো. নূর আলম ২০১৬ সালে রিট আবেদন করেন, রিট পিটিশন নম্বর ১৪৮২১। সেখানে অস্থায়ী নিয়োগ স্থায়ী করার আবেদন করা হয় এবং স্থায়ী নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তির নিয়োগ বাতিল চাওয়া হয়। ওই মামলায় নূর আলম হাইকোর্টে হেরে যাওয়ার পর বিষয়টি আপিল বিভাগে যায়। আপিল বিভাগ অস্থায়ী নিয়োগ বাতিল করে স্থায়ী নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের বহাল রাখার আদেশ দেয়। এরপর ২০১৮ সালে ১৬০৮৮ নম্বর রিট আবেদন করা হয়। আগের মামলাগুলোর তথ্য গোপন করে ২০২১ সালে ১১৪৪৬ নম্বর এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালে ৯৬৩১ নম্বর রিট আবেদন করা হয়। এসব মামলার কোনোটিতেই আগের মামলার আদেশ এবং আপিল বিভাগের আদেশের বিষয়ে বলা হয়নি। এর মধ্যে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিবের বিরুদ্ধেও আদালত অবমাননার আবেদন আনা হয়।

তিনি বলেন, বিষয়টি একদিনে নিষ্পত্তি হয়নি। টানা ৩ দিন শুনানি হয়েছে। শুনানির সময় আপিল বিভাগের রেকর্ড ও পুরনো ফাইল তলব করে দেখা হয়, একই বাদী ও একই আইনজীবী পর পর একাধিক রিট আবেদন করেছেন এবং আগের মামলাগুলোর তথ্য গোপন করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত রিট আবেদনকারী এবং তার আইনজীবীকে ৫ লাখ টাকা করে জরিমানা করেন। ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন এসব মামলায় ফাইলিং আইনজীবীর সিনিয়র হিসেবে যুক্ত ছিলেন বলে জানান তিনি।

অনীক আর হক বলেন, জরিমানা করার সময় সংশ্লিষ্ট নারী আইনজীবী আদালতে উপস্থিত ছিলেন এবং তিনি আদালতের আদেশ মেনে নেন। প্রায় তিন ঘণ্টা পর ব্যারিস্টার খোকন বিষয়টি নিয়ে আদালতে কথা বলেন। তখন ওই নারী আইনজীবী সেখানে উপস্থিত ছিলেন না।

আপিল বিভাগের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল সংবাদ সম্মেলন করে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মামলার বাদী পাঁচটি রিট দায়ের করেছেন একই আদেশ চ্যালেঞ্জ করে। …পাঁচটি রিট দায়ের করেছেন অথচ পূর্বে রিজেক্ট হওয়ার আদেশটি পরবর্তী রিটে উল্লেখ করা হয়নি। যে কারণে নারী আইনজীবীকে আজ আপিল বিভাগ ফাইন করেছেন পাঁচ লাখ টাকা এবং রিট আবেদনকারীকে পাঁচ লাখ টাকা, যে টাকা সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে ঢাকা শিশু হাসপাতালে জমা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। নারী আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী মামলায় সিনিয়র আইনজীবী ছিলেন এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন।

সকালে যখন আদেশ হয়, তখন নারী আইনজীবী আমার পাশে বসে আদেশটি শুনেছেন, উনার স্বামীও আমার পাশে বসা ছিলেন। কিন্তু আদেশ দেয়ার সময় ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। তবে আইনজীবী সুফিয়া আহমেদ তখন আমার পাশে বসেছিলেন এবং বারবার বলছিলেন, খোকন ভাই আমাকে কী বিপদে ফেলল। ওই মামলায় সকাল সোয়া নয়টার দিকে আদেশ হয়। আর এ ঘটনার (এজলাস ত্যাগ) অবতারণা হচ্ছে ১২টা ৩৫ মিনিটে। অন্য একটি মামলার সময় মাহবুব উদ্দিন খোকন ওই প্রসঙ্গে (খরচা আরোপ) বললেন যে একজন আইনজীবীকে আপনারা ফাইন করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, দেখেন, আমরা সবকিছুতে দেখে শুনে একটা আদেশ দিয়েছি, আমাদের আদেশ আমরা পরিবর্তন করব না। কারণ, ওনাদের (আদালত) বক্তব্য অনুযায়ী সিরিয়াস ফ্রড করা হয়েছে। আদালতের সঙ্গে প্রতারণা এমনকি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ইতিপূর্বের আদেশও ফ্রড করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বললেন, আপনি (মাহবুব উদ্দিন খোকন) এটা বলবেন না।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, তখন অত্যন্ত অপ্রত্যাশিতভাবে মাহবুব উদ্দিন খোকন বলে ফেললেন যে আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পরে আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে। বিষয়টি প্রধান বিচারপতি একটু লাইটলি নিলেন। তারপরে বললেন, আপনি (মাহবুব উদ্দিন খোকন) কি এটা মিন করেন? মাহবুব উদ্দিন খোকন অনেকটা সেই একই কথা বলার যখন চেষ্টা করেন, তখন প্রধান বিচারপতি বলেছেন যে আপনি (খোকন) যে কথাটা বলেছেন, সেটা অ্যাবসলিউটলি আদালত অবমাননার শামিল। যেহেতু আপনি এত বড় একটা কথা বলেছেন, আমি আজকে আর আদালতের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করবো না। এ কথা বলে উনি (প্রধান বিচারপতি) উঠে (এজলাস থেকে) গেছেন। অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, বলেন, প্রধান বিচারপতি বিচারিক শৃঙ্খলা, সততা প্রাধান্য দেন। কোনো প্রতারণা যদি দেখেন, তা সিরিয়াসলি ডিল (গুরুত্বের সঙ্গে দেখেন) করেন। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, প্রধান বিচারপতি সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবীদের অভিভাবক। আদালতে আইনজীবীদের সঙ্গে বিচারকদের ভুল বোঝাবুঝি বা মতপার্থক্য হতে পারে, কিন্তু তা সাধারণত আদালতের কার্যক্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। তিনি বলেন, ব্যারিস্টার খোকন একজন সংসদ সদস্য হওয়ায় তার কাছ থেকে এমন বক্তব্য ‘অপ্রত্যাশিত’ ছিল।

ঘটনার বিষয়ে যা বলেন ব্যারিস্টার খোকন: ঘটনার পরে ব্যারিস্টার খোকন সাংবাদিকদের বলেন, অন্য একটি মামলার কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর তিনি প্রধান বিচারপতির কাছে ওই নারী আইনজীবীর ৫ লাখ টাকা জরিমানা মওকুফের অনুরোধ করেন। তিনি বলেন, একজন জুনিয়র ল’ইয়ার, ৫ লাখ টাকা কস্ট দেয়াটা অনেক বেশি হয়ে গেছে, এটা মাফ করে দেয়া দরকার। বিষয়টি তিনি ‘ন্যায়বিচারের স্বার্থেই’ বলেছেন বলে উল্লেখ করেন খোকন।

তিনি বলেন, মামলায় আইনজীবীর জয়-পরাজয় হতে পারে, কিন্তু জুনিয়র আইনজীবীর ওপর ৫ লাখ টাকা জরিমানা অনেক বেশি। তিনি আরও বলেন, ওই কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি আপিল বিভাগে মামলা কমে যাওয়া এবং এর ফলে আইনজীবীদের আয় কমে যাওয়ার প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, আমি মাননীয় প্রধান বিচারপতিকে বললাম, যে আপনি মাননীয় প্রধান বিচারপতি হওয়ার পরে আসলে মামলা-টামলা খুব একটা হচ্ছে না আপিল বিভাগে। আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে। এই বক্তব্যের উদ্দেশ্য ছিল আপিল বিভাগে বেঞ্চের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে মামলার শুনানি কমে যাওয়ার বিষয়টি বোঝানো।

খোকন আরও বলেন, আগে আপিল বিভাগে ১১ জন বিচারপতি ছিলেন এবং তিনটি বেঞ্চে নিয়মিত মামলা শুনানি হত। এখন একটি বেঞ্চে মামলা শুনানি হওয়ায় হাজার হাজার মামলা পড়ে আছে এবং চেম্বার আদালত থেকে কোনো মামলায় স্থগিতাদেশ হলে পরে সেটি শুনানির জন্য আনা কঠিন হয়ে পড়ছে। এ সময় নিজের একটি মামলার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ওই মামলায় সর্বোচ্চ তিন মাসের সাজা হতে পারে। কিন্তু মামলাটি এক বছর ধরে আপিল বিভাগে স্থগিত রয়েছে। চারবার চেম্বার জজের কাছে শুনানির জন্য নির্ধারণ করেও মামলাটি শুনানি করাতে পারিনি।
ব্যারিস্টার খোকন দাবি করেন, প্রধান বিচারপতির সঙ্গে তার কোনো তর্ক হয়নি। আইনজীবীদের প্রতিনিধি হিসেবে তাদের স্বার্থের কথা বলা তার দায়িত্ব। তিনি বলেন, আমি তো চিন্তা করি নাই যে মাননীয় প্রধান বিচারপতি এত রিঅ্যাক্ট করবেন। উনারতো রাগ-অভিমানের ঊর্ধ্বে থাকার কথা। আর ল’ইয়ারদের প্রতিনিধি হিসেবে অবশ্যই আমার অবলিগেশন আছে উনার কাছে ল’ইয়ারদের পক্ষে আবেদন করার।