
গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গী পূর্ব থানার উত্তর বনমালা এলাকা—একসময় যেখানে ছিল একটি সাধারণ পরিবারের স্বাভাবিক জীবনযাপন। সেখানে আজ নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
একই রাতে ছোট ভাইয়ের নৃশংস হত্যা এবং বাবাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা কেবল একটি পরিবারের নয়, পুরো এলাকার মানুষকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
তদন্ত, সিসিটিভি ফুটেজ, আদালতে দেওয়া জবানবন্দি এবং পুলিশের বক্তব্য মিলিয়ে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা এক ভয়াবহ ত্রিভুজ প্রেম, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং ঠাণ্ডা মাথার পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের গল্প।
ঘটনার শুরু গভীর রাতে। বাড়ির সবাই যখন ঘুমে অচেতন, তখন বড় ছেলে সোহান (২৮) তার ছোট ভাই সাকিব (১৮)-এর ওপর হামলা চালায়।
আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, সে প্রথমে ধারাল অস্ত্র দিয়ে ছোট ভাইয়ের হাত ও পায়ের রগ কেটে দেয়, যাতে সে পালাতে না পারে। এরপর একাধিক আঘাতে নিশ্চিত করে তার মৃত্যু। এই পুরো ঘটনাটি ঘটে নিঃশব্দে—কেউ কিছু টের পায়নি। ঘরের ভেতরেই নিভে যায় একটি তরুণ প্রাণ।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। হত্যাকাণ্ডের কিছুক্ষণ পরই বাবা সোহেল রানা (৫০) ঘটনাটি দেখে ফেলেন। নিজের ছেলের হাতে আরেক ছেলের নির্মম মৃত্যু—এই দৃশ্যই তাকে পরিণত করে দ্বিতীয় শিকারে। জিজ্ঞাসাবাদে উঠে এসেছে, বিষয়টি ধামাচাপা দিতে সোহান আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং দ্রুত একজন সহযোগীকে ডেকে আনে। এরপর তারা দুজন মিলে বাবাকে জোর করে বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে যায়।
সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়ে সেই ভয়াবহ দৃশ্য—রাতের অন্ধকারে দুইজন ব্যক্তি একজন দুর্বল মানুষকে ধরে রেললাইনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তদন্তকারীরা নিশ্চিত হয়েছেন, সেই ব্যক্তি ছিলেন সোহেলের বাবা। ফুটেজে আরও দেখা যায়, রেললাইনের ওপর তাকে ফেলে রেখে দ্রুত সরে যায় তারা। কিছু সময় পর ট্রেনের নিচে পড়ে মৃত্যু হয় তার। এটি দুর্ঘটনা না পরিকল্পিত হত্যা—তা নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক রিপোর্টের অপেক্ষা করা হচ্ছে, তবে প্রাথমিকভাবে এটি হত্যারই অংশ বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঘটনার পরপরই এলাকায় গুজব ছড়িয়ে পড়ে—বাবা নাকি ছোট ছেলেকে হত্যা করে নিজেই আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু এই গল্প বেশিক্ষণ টেকেনি। কারণ, সিসিটিভি ফুটেজই ভেঙে দেয় সব মিথ্যা। সেখানে স্পষ্ট দেখা যায় বাবাকে জীবিত অবস্থায় নিয়ে যাওয়া, সোহানের উপস্থিতি এবং তার সন্দেহজনক গতিবিধি। এই প্রযুক্তিগত প্রমাণই তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং সামনে আসে প্রকৃত সত্য।
এদিকে, ঘটনার পর সোহানের আচরণ ছিল আরও রহস্যজনক। সে পালিয়ে যায়নি, বরং স্বজনদের ফোন করে হত্যার খবর জানাতে থাকে। কিন্তু তার ফোনকলের সময়, বক্তব্য এবং বাস্তব ঘটনার মধ্যে অসঙ্গতি পাওয়া যায়।
তদন্তকারীদের মতে, এটি ছিল ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার একটি পরিকল্পিত চেষ্টা, যাতে সন্দেহ অন্যদিকে ঘুরে যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তি এবং তথ্যপ্রমাণের কাছে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে যে কারণটি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে, তা হলো একটি ত্রিভুজ প্রেম। তদন্তে জানা গেছে, খালাত বোনের সঙ্গে বড় ছেলে সোহানের বিয়ে ঠিক হয়েছিল। কিন্তু সেই মেয়ের সঙ্গে গোপনে সম্পর্ক গড়ে তোলে ছোট ভাই সাকিব। বিষয়টি জানার পর থেকেই দুই ভাইয়ের মধ্যে শুরু হয় দ্বন্দ্ব। সোহান বারবার সতর্ক করলেও সম্পর্ক থামেনি। ধীরে ধীরে এই সম্পর্ক পরিণত হয় মানসিক চাপ, অপমানবোধ এবং জমে থাকা ক্ষোভে। শেষ পর্যন্ত সেই ক্ষোভই রূপ নেয় রক্তাক্ত প্রতিশোধে।
এ বিষয়ে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি (ক্রাইম) মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ত্রিভুজ প্রেমের বলি হয়ে বড় ভাই একাই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। সে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। আমরা ঘটনাটির প্রতিটি দিক গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছি।












































