
কক্সবাজারের উখিয়ায় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতির বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ৭৫ বছরের এক বৃদ্ধ, দুই গৃহবধূ ও এক শিশুসহ চারজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পরে আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
রাতে বৃদ্ধের ছেলেকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার পথে হাতকড়াসহ পালিয়ে যাওয়ার ‘খেসারত’ হিসেবে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনাটি প্রকাশ পাওয়ার পর এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নিন্দার ঝড় উঠেছে। শনিবার (১১ এপ্রিল) দিনগত রাতে রাজাপালংয়ের শেখপাড়ায় এ অভিযান চালায় উখিয়া থানা পুলিশ।
আটকরা সবাই রাজাপালং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সালাহউদ্দিন মেম্বারের পরিবারের সদস্য। আটক ব্যক্তিরা হলেন—সালাহউদ্দিনের বাবা জাফর আলম (৭৫), স্ত্রী রোজিনা আক্তার, ভাই মিজানের স্ত্রী ফারজানা হাকিম নিথর এবং ৬ বছরের ভাতিজি মাইরা মনি।
সূত্র জানায়, শনিবার রাতে সালাহউদ্দিন মেম্বারের বাড়ি ঘেরাও করে পুলিশ তার ছোট ভাই মিজানকে আটক করে। থানায় নেওয়ার পথে হাতকড়া পরা অবস্থায় মিজান পালিয়ে যান। এর পরপরই অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের আটক করে থানায় নিয়ে যায়।
উখিয়া থানার ওসি মুজিবুর রহমানের দাবি, আসামি মিজানকে পরিবারের সদস্যরা পুলিশের ওপর হামলা করে ছিনিয়ে নিতে সহযোগিতা করে পালাতে সহায়তা করেছেন। এ ঘটনায় ‘পুলিশের ওপর হামলা’সহ (পুলিশ অ্যাসল্ট) বিভিন্ন অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
মামলায় ১৫ জনকে এজাহারভুক্ত করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১০-১৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। রাতে আটক চারজনকে রোববার বিকালে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
একজন বৃদ্ধ, দুই নারী ও একটি শিশুকে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করে আটক করার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে শিশুটিকে মায়ের সঙ্গে কারাগারে পাঠানোর বিষয়টি অমানবিক দৃষ্টান্ত বলে মন্তব্য করছেন অনেকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহল থেকে তীব্র সমালোচনা ও প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর ভাতিজা ব্যারিস্টার সাফফাত ফারদিন রামিম তার ফেসবুক পোস্টে বলেন- ‘দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ৯ বছরের নিচে কোনো শিশুর কর্মকাণ্ড অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় না। সেই বিবেচনায় ৮ বছরের শিশুকে গ্রেফতার করা মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।’
উখিয়া প্রেস ক্লাবের সভাপতি সাঈদ মুহাম্মদ আনোয়ার উদ্বেগ প্রকাশ করে তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন- ‘একটি নিষ্পাপ শিশুকে থানায় আটক রেখে পরে আদালতে পাঠানো শুধু আইনের পরিপন্থি নয়, মানবিক মূল্যবোধেরও মারাত্মক অবমাননা।’
কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল মন্নান বলেন, দেশের প্রচলিত আইনে ৯ বছরের নিচে কোনো শিশুকে ফৌজদারি অপরাধে দায়ী করা যায় না। সেই প্রেক্ষাপটে একটি শিশুকে মামলার প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা বা আটক রাখা অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ বিষয়। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে মানবিক দিক ও আইনের মৌলিক নীতিগুলো অবশ্যই বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
ওসি মুজিবুর রহমান বলেন, ৬ বছরের শিশুটিকে পুলিশ আটক করেনি। তবে তার মা পুলিশের ওপর হামলার মামলায় প্রধান আসামি। তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। শিশুটিকে রাখার মতো কেউ না থাকায় নিরাপত্তার স্বার্থে মা নিজেই তাকে সঙ্গে নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। পরে তাদের আদালতে সোপর্দ করা হয় এবং আদালত আসামিদের কারাগারে পাঠিয়েছেন।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উখিয়া-টেকনাফ সার্কেল) রকিবুল হাসান বলেন, ৬ মাসের সাজাপ্রাপ্ত একজন আসামিকে ধরতে গেলে তিনি হাতকড়াসহ পালিয়ে যান। এ ঘটনায় পুলিশের ওপর হামলার মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় দুই নারী ও একজন বৃদ্ধকে আটক করা হয়েছে। পরিবারের অনুরোধে শিশুটিকে মায়ের সঙ্গে আদালতে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী সিদ্ধান্ত আদালত নেবেন।
কক্সবাজার জেলা কারাগারের ডেপুটি জেলার নোবেল দেব জানান, রাত ৮টার দিকে অন্য আসামিদের সঙ্গে বৃদ্ধ জাফর আলম, রোজিনা ও ফারজানা কারাগারে আসেন। ফারজানার সঙ্গে তার মেয়েকেও রাখা হয়েছে। মেয়ের বয়স ৬ বছর হলে তাকে কারাগারে রাখার সুযোগ নেই। বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। হাজতিদের বিরুদ্ধে পুলিশ অ্যাসল্ট, সরকারি কাজে বাধা দেওয়াসহ নানা অভিযোগ আনা হয়েছে।











































