
আঙুলে ভোটের কালির দাগ থাকতে থাকতেই নির্বাচনী অঙ্গীকারের বাইরেও আশা-জাগানিয়া নানা কাজ করে চলছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর কাজের দৌড় বুঝতে পেরে মন্ত্রীদের কয়েকজনেরও নাওয়া-খাওয়া বন্ধ প্রায়। ইতিবাচক কাজের পেছনে দৌড়াচ্ছেন তাঁরাও। কিন্তু পেশাদার কতক চাঁদাবাজ-তোলাবাজের দৌড়াদৌড়ি চলছে নানা কুকাজে।
দলীয় পরিচয়-ব্যানার ব্যবহার করে এরা যেখান দিয়ে যা পারছে তা করে চলছে। মাঝেমধ্যে হোঁচট খাচ্ছে। মারাও পড়ছে। কিন্তু দমছে না।।
পরিস্থিতির অনিবার্যতায় এদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে বিএনপি। প্রখ্যাত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলামের কাছে চাঁদা দাবির ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে শনিবার সকালে বিএনপি মিডিয়া সেলের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে এই বার্তা দিয়েছে দলটি। পোস্টে বলা হয়েছে, ‘চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স : ডা. কামরুল ইসলামের পাশে যুবদল, দ্রুত গ্রেপ্তারের আশ্বাস’।
গত বছরের মধ্যভাগে অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলামের হাসপাতালের ওপর নজর পড়ে শেরেবাংলানগর থানা যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মঈন উদ্দিন মঈনের। তাঁর নেতৃত্বে একটি চক্র প্রায় এক বছর ধরে চাপ ও ভয়ভীতি দেখাচ্ছিল। এ ঘটনায় মঈন উদ্দিন মঈনের নেতৃত্বে চাঁদাবাজচক্রের হুমকির খবর প্রকাশিতও হয়। কালের কণ্ঠের হাতে আসা একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে কর্মরত একজনকে বারবার ধমক দিচ্ছেন এক ব্যক্তি। তিনি নিজেকে যুবদল নেতা হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন।
শুধু তা-ই নয়, ভেতরে ঢুকে সৃষ্টি করেছেন আতঙ্ক। হুমকি দেওয়া এই ব্যক্তিই মঈন উদ্দিন মঈন।
অধ্যাপক কামরুল ইসলাম জানান, গত জুলাই-আগস্টের পর থেকেই বিভিন্নভাবে চাঁদা দাবি করছে চক্রটি। কখনো ভয়ভীতি দেখানো, কখনো আবার রাজনৈতিক প্রভাব সামনে এনে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি জানিয়ে শেরেবাংলানগর থানায় একটি জিডিও করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ডা. কামরুলের হাসপাতালে যুবদল পরিচয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগের পর রাতের বেলা যুবদলের সভাপতি-সেক্রেটারি গিয়ে ‘চাঁদাবাজ যুবদলের নয়’ বলার চেষ্টা করেছেন। এটি কাঙ্ক্ষিত নয়; বরং কিছুটা দায় এড়ানোর চেষ্টা। যুবদল বা কোনো সংগঠন তাদের সব কর্মীর নামধাম সংরক্ষণ করে না। একটা দলের সবার পদ-পদবিও থাকে না। এই চিকিৎসক বিএনপি বা যুবদলের যে নেতাদের কাছে অভিযোগ করেছিলেন, তাঁদের নীরবতা আজকের এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। থানার ওসি চাঁদাবাজকে রক্ষার চেষ্টা করেছেন। তিনটা পক্ষই দায়ী। বিনা পারিশ্রমিকে দুই হাজারের বেশি কিডনি প্রতিস্থাপনকারী প্রখ্যাত চিকিৎসক অধ্যাপক কামরুল ইসলামের কাছে চাঁদা দাবির ঘটনা এখন টক অব দ্য কান্ট্রি, তা কালের কণ্ঠে প্রতিবেদন প্রকাশের পর। কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনে বেরিয়ে আসে, শুধু ডা. কামরুল ইসলামের হাসপাতালে নয়, শেরেবাংলানগর থানা এলাকায় দেড় বছরের বেশি সময় ধরে অপরাধ সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন মঈন।
যুবদল নেতা পরিচয় দিয়ে হেন কোনো অপরাধ নেই, যা তিনি করেননি। হত্যা, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, সরকারি বাড়ি দখল, জমি দখল পরিণত হয়েছে নিয়মিত ঘটনায়। মঈন বাহিনীর খপ্পর থেকে মসজিদ-মাদরাসার মতো প্রতিষ্ঠানও রেহাই পায়নি। তাঁর দাপটের কাছে স্থানীয় বিএনপি নেতারাও অসহায়। ভয়ংকর এই অপরাধচক্রের কারণে আতঙ্কে দিন কাটছে স্থানীয়দের। থানা-পুলিশ সবই এত দিন ছিল মঈনের হাতের মুঠোয়। ফলে এলাকাবাসী বহু অপকর্মের সাক্ষী হলেও প্রকাশ্যে আনতে ভয় পাচ্ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নগর-মহানগর, কোথাও কোথাও উপজেলা পর্যায়েও এই এলাকার ডিশ ও ইন্টারনেট সংযোগ, গ্যাস সিলিন্ডার এবং ময়লার ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ এমন মঈনদের হাতে। এদের কথার বাইরে সেবা মেলে না। ময়লা, ঝুট, ফিল্টার পানি, ডিমের ব্যবসা—সবই তাদের কবজায়। এ ধরনের কাণ্ডকীর্তি প্রধানমন্ত্রীর অবিরাম পরিশ্রম ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের একদম বিপরীত।
একদিকে তাঁর যত প্রচেষ্টা মানুষকে আশাবাদী করছে, অন্যদিকে মঈনদের কুকর্ম দলকে-সরকারকে হতাশ করছে। ডাক্তার কামরুলকে মানুষ চেনে, সাংবাদিকরা তাঁর সম্পর্কে জানেন বলে তাঁর জন্য নিউজ করেছেন। কিন্তু যাঁরা ডাক্তার কামরুল নন—এমন চাঁদাবাজির শিকারদের বিষয়ে কি নিউজ হয়? বা হবে? এ ধরনের বিষয়কে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ইস্যু বানায়। রাজনৈতিক নতুন পথরেখাও বানিয়ে ফেলে। এ ধরনের ছোট-বড় বহু উদাহরণ আছে এ দেশে। সেই উদাহরণের আবশ্যকীয়তায় স্মরণ করতে হয় ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ক্ষমতা দখলের পেছনে এক কুখ্যাত খুনি ইমদুকে দাওয়াই বা উপলক্ষ বানানোর কথা। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর পর থেকেই ক্ষমতা দখলের উপলক্ষ খুঁজছিলেন এরশাদ। অনেক কায়দা-কানুন করে ইমদুকে দৌড়িয়ে তখনকার যুবমন্ত্রী আবুল কাশেমের বাড়িতে ঢুকিয়ে গ্রেপ্তার করে বিএনপিকে কলঙ্কিত এবং নিজের ক্ষমতা দখলের চিকন কাজটা সেরেছিলেন এরশাদ। প্রেসিডেন্ট জিয়ার শাহাদাতের পর তখন সদ্য নতুন রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি আবদুস সাত্তার। সেই ঘটনার পর দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলে পুরো মন্ত্রিসভা বাতিল করেন তিনি। আর তার কিছুদিন পর ক্ষমতা দখল করে সামরিক শাসন জারি করেন জেনারেল এরশাদ।
মঈন আর ইমদু এক নয়। পরিস্থিতিতেও অনেক তফাত। তবে গুণগতভাবে এরা একই গোত্রীয়। এ দেশে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় প্রতিনিয়ত মঈন-ইমদুদের জন্ম হয়। এরশাদ জামানায় সেই ইমদু পর্বের অবসান হয়েছে। নানা অসিলার মারপ্যাঁচে এ ধরনের ব্যক্তিরা থেকেই যায়। সরকারকে নাস্তানাবুদ এবং প্রতিপক্ষকে সুযোগ করে দিতে যুগে যুগে এদের জুড়ি নেই। ছোট-বড়, আতিপাতি ইমদুদের এখন পাওয়া যায় পাড়া-মহল্লায়, অলিগলিতেও। আবার একসময় ঘটনাচক্রে ওদের জীবন বলি হয়। সমান্তরালে সরকারেরও সর্বনাশ হয়। সেই ধারাপাতে এখন স্বস্তির খবর হচ্ছে, দেশজুড়ে এ ধরনের চাঁদাবাজদের একটি আনবায়াসড (নিরপেক্ষ) তালিকা তৈরি করছে বলে জানিয়েছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। তালিকা প্রস্তুত শেষে এতে থাকা সব অপরাধীর বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। বিএনপির পক্ষ থেকেও কড়া বার্তা এসেছে। এখন অপেক্ষা বাস্তবতা তথা অ্যাকশন দেখার।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন












































