
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ের পর সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসনের মধ্যে ক্ষমতাসীন বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ৩৬টি আসন পেতে যাচ্ছে। এ আসনের মধ্যে দলীয় ত্যাগী, যোগ্য ও নির্যাতিত নেত্রীদের পাশাপাশি বিএনপি তার প্রধান শরিকদের ত্যাগ ও আন্দোলনে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ কয়েকটি আসন ছেড়ে দিতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, এই আসনের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ আগামী ২১ এপ্রিল। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হবে ২২ ও ২৩ এপ্রিল। মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২৯ এপ্রিল এবং ৩০ এপ্রিল প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে। ভোটগ্রহণ হবে আগামী ১২ মে।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, শুধু দলের নেত্রীদের নয়, বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে বিএনপির সঙ্গে জোটগত ও যুগপৎ আন্দোলনে যুক্ত শরিক দলের মধ্যেও সংরক্ষিত নারী আসন বন্টনের চিন্তাভাবনা করছেন দলের হাইকমান্ড। সেই প্রেক্ষাপটে বেশ কয়েকটি সংরক্ষিত নারী আসন জোটের নেতাদের স্ত্রী বা কন্যারা পেতে যাচ্ছেন, বিষয়টি অনেকটা নিশ্চিত।
সূত্র জানায়, সংরক্ষিত নারী আসনে দলের কোন কোন নেত্রীকে মনোনয়ন দেওয়া হবে তা চূড়ান্ত করছেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নেতা তারেক রহমান। তিনি তার নিজস্ব বিচার-বিবেচনায় ও স্থায়ী কমিটির সদস্যদের আলোচনার প্রেক্ষিতে দলের নেত্রীদের তালিকা করছেন। এর বাইরে, বিগত দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে বিএনপির পাশে থাকা জোট শরিকদের জন্যও কয়েকটি আসন ছেড়ে দিচ্ছেন। সেই মোতাবেক সম্ভাব্য চূড়ান্ত মনোনয়ন পাওয়া নেত্রীদের কাছে ফোন ও যোগাযোগ করে তাদের পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক বায়োডাটা, জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, ছবি ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য নথি সংগ্রহ করা হচ্ছে।
গেল ৪ এপ্রিল শনিবার গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকদের কমিটি, জাতীয় স্থায়ী কমিটির দীর্ঘ বৈঠক হয়। সেই বৈঠকে আলোচনার পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে দল ও জোট থেকে মনোনয়ন চূড়ান্তকরণের একক ক্ষমতা দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর ন্যস্ত করেন স্থায়ী কমিটির সদস্যরা।
এদিকে, সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়নের বিষয়ে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, আগামী ১২ মে ভোটগ্রহণ হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে। ইতিমধ্যেই তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল অনুযায়ী বিএনপি জোট সংরক্ষিত নারী আসনে ৩৬টি আসন পাবে।
চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম স্পষ্ট করে বলেন, জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়নের ক্ষেত্রে রাজপথের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ও ত্যাগী নেত্রীরাই অগ্রাধিকার পাবেন। তিনি বলেন, ‘রাজনীতিতে যারা দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত এবং সংসদে অবদান রাখতে পারেন, তাদেরই আমরা অগ্রাধিকার দিচ্ছি। আমি মনে করি, সংসদ নেতার সিদ্ধান্ত নির্ভুল হবে এবং তিনি সব সেকশনের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করবেন।’
সূত্র জানায়, বিএনপির জোটসঙ্গীদের মধ্যে সংরক্ষিত আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন বঞ্চিত জোট গণতন্ত্র মঞ্চ থেকে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির সভাপতি আ. স. ম. আবদুর রবের সহধর্মিনী জেএসডির সহ-সভাপতি তানিয়া রব, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার স্ত্রী মেহের নিগার অথবা তার কন্যা নিলম মান্না এবং ঢাকা-১২ থেকে বিএনপি জোটের মনোনয়নপ্রাপ্ত বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকের কন্যা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক (সহযোগী অধ্যাপক) ড. মোশরেকা অদিতি হক, নির্বাচনের কয়েক দিন আগে নিজদল বিলুপ্ত করে বিএনপি থেকে কিশোরগঞ্জ-৫ আসন থেকে ধানের শীষে নির্বাচন করা সৈয়দ এহসানুল হুদার সহধর্মীনি রোকসানা শারমিন বিএনপির হাইকমান্ডের তালিকায় প্রাধান্য পাচ্ছেন।
বিএনপির ঘনিষ্ট শরিক ১২ দলীয় জোটের শরিক জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমেদের কন্যা জয়া কাজীর নাম বিবেচনায় রয়েছে। অন্যদিকে সমমনা জোট থেকে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষে নির্বাচন করা এনপিপির সাবেক চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদের স্ত্রীর নামও বিবেচনায় রয়েছে।
এর বাইরে গণসংহতি আন্দোলন থেকে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকিরের স্ত্রী তাসলিমা আখতার ও সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত দলের আরেক নেতা আরিফুল ইসলামের স্ত্রী রেবাকা নীলের নাম আলোচনায় থাকলেও সাকিরের মন্ত্রীত্বের কারণে তারা চূড়ান্ত মনোনয়ন নাও পেতে পারেন।
জোটশরিকদের বাইরে বিশিষ্ট পেশাজীবীদের সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন দিয়ে সম্মানিত করতে পারে ক্ষমতাসীন দল। এদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. তাজমেরী এস. এ. ইসলাম। তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য। একাডেমিক ক্ষেত্রে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ গত ৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেছে।
আরও রয়েছেন কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ ছাত্র-সংসদের সাবেক ভিপি (১৯৯৬ ব্যাচ) অধ্যাপক নাজমা সুলতানা ঝংকার, বারডেম জেনারেল হাসপাতাল ও ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজের শিশু রোগ (Pediatrics) বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. তাহমিনা বেগম। তিনি দেশে নবজাতক, শিশু-কিশোর রোগ এবং অটিজম বিশেষজ্ঞ হিসেবে সুপরিচিত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষক ডা. নাহারিন খান, জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের পরিচালক পলিকল্পনা ডা. সৈয়দা তাজনিন ওয়াইরিস সিমকি সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যপদ পেতে পারেন।
জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়নের ক্ষেত্রে রাজপথের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ও ত্যাগী নেত্রীরাই অগ্রাধিকার পাবেন। রাজনীতিতে যারা দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত এবং সংসদে অবদান রাখতে পারেন, তাদেরই আমরা অগ্রাধিকার দিচ্ছি। আমি মনে করি, সংসদ নেতার সিদ্ধান্ত নির্ভুল হবে এবং তিনি সব সেকশনের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করবেন—মো. নূরুল ইসলাম, চিফ হুইপ
এদিকে, খোদ নিজ দলের প্রার্থী চূড়ান্ত করতে অনেকটা হিমশিম খেতে হচ্ছে দলটির নীতিনির্ধারকদের। প্রার্থী বেশি ও বিগত প্রায় দেড় যুগেরও বেশি যেসব নারী নেত্রী রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন, দলের কর্মসূচি সম্পাদনে ভূমিকা রেখেছেন, পুলিশী ও নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন, কারাগারে গেছেন, রিমান্ড সহ্য করেছেন তাদের অধিকাংশই দলের হাইকমান্ডের দিকে তাকিয়ে আছেন। এসব নারী নেত্রীদের প্রত্যাশা, দল তাদের ত্যাগের ‘ন্যায্য’ মূল্যায়ন করবে। হাইব্রিডদের কারণে যেন তাদের অবমূল্যায়ন না করা হয়।
জানা যায়, বিএনপি তথা মহিলাদলের নেত্রীদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস, সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শিরিন সুলতানা, নীলুফার চৌধুরী মনি, রেহানা আখতার রানু, ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নিপুন রায় চৌধুরী, বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী বেবী নাজনীন এবং রুমানা ইসলাম কনক চাপা, মহিলাদলের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক হেলেন জেরিন খান, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেত্রী শাম্মী আক্তার, সাবেক এমপি নিলোফার চৌধুরী মনি এবং রেহেনা আক্তার রানু। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের স্ত্রী হাসনা জসিমউদ্দিন মওদুদ এবং বিএনপির এক সময়ের প্রয়াত মহাসচিব আবদুস সালাম তালুকদারের মেয়ে ব্যারিস্টার সালিমা বেগম অরুনি এবং বিএনপি দলীয় সাবেক হুইপ সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের মেয়ে ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা।
এর বাইরে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দুঃসময়ে পাশে থাকা লন্ডন বিএনপির সাবেক সভাপতি প্রয়াত কমর উদ্দিন আহমেদের মেয়ে সাবরিনা খান এবং বিএনপির সাবেক মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের পরিবার থেকে তার পুত্রবধূ খাদিজাতুল কোবরা সুমাইয়া বা অন্য কোনো সদস্যের নাম আলোচনায় রয়েছে। সাবেক ছাত্রদল নেত্রীদের মধ্যে ঢাবি ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী শাহনুর নার্গিস, ইডেন কলেজ ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী সেলিনা সুলতানা নিশিতা, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য অ্যাডভোকেট আরিফা সুলতানা রুমা, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি, বিএনপির প্রয়াত নেতা নাসিরুদ্দিন আহমেদ পিন্টুর স্ত্রী নাসিমা আক্তার কল্পনা, মরহুম শফিউল বারী বাবুর স্ত্রী বীথিকা বিনতে হোসাইন, নেওয়াজ হালিমা আর্লি, ছাত্রদল নেত্রী মানসুরা আক্তার, পাবনার সাঁথিয়া উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক খায়রুন নাহার ও সেলিমুজ্জামান সেলিমের স্ত্রী সাবরিনা শুভ্র।
এর বাইরে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে পরাজিত মায়ের ডাকের সংগঠক সানজিদা ইসলাম তুলি, ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াংকা, সাবিরা সুলতানা, নাদিরা চৌধুরী ও একুশে পদকপ্রাপ্ত নৃত্যশিল্পী প্রয়াত বেগম রাহিজা খানম ঝুনুর মেয়ে নৃত্যশিল্পী ফারহানা চৌধুরী বেবী আলোচনায় রয়েছেন।
আরও পড়ুন: লন্ডনে তারেক রহমানকে জুলাই আন্দোলনের ‘ট্রফি’ দিয়ে নির্বাচনের তারিখ নিয়ে আসেন ড. ইউনূস
সংরক্ষিত আসনে আলোচনায় থাকা রোকসানা শারমিন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘বিগত শাসনামলে আমার স্বামী সৈয়দ এহসানুল হুদা আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন এবং হামলা-মামলা ও জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন। আমরাও পরিবার হিসেবে নানা প্রতিকূলতা সহ্য করেছি। কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে তিনি নির্বাচন করেছেন। আমি নিজেও নারী সমাজকে সংগঠিত করতে কাজ করেছি। দল যদি আমাকে সুযোগ দেয়, তাহলে শহীদ জিয়া, বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের আদর্শ বাস্তবায়নে কাজ করব।’
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য আরিফা সুলতানা রুমা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আমি চাই গত ১৭ বছর যারা রাজপথে ছিল, ত্যাগ-তিতীক্ষা রয়েছে তারা সংরক্ষিত মহিলা আসনে মনোনীত হোক। দল সেই বিবেচনায় মনোনয়ন দেবে। আমি আশাবাদী। হাইব্রিডদের ভিড়ে যেন আমরা হারিয়ে না যাই। আমি দলের জন্য জেল খেটেছি, ডিবি কার্যালয়ে রিমান্ডে নির্যাতিত হয়েছি। সব কর্মসূচি পালন করেছি। দলের জন্য আমাদের ত্যাগের মূল্যায়ণ আশা করি।’
সম্ভাব্য প্রার্থী বীথিকা হোসাইন বলেন, ‘আমার স্বামী প্রয়াত শফিউল বারী বাবু দলে অবদান রেখেছেন। বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে জাতীয়তাবাদী দলের যারা নির্যাতিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের পাশে থেকেছি। সরকারের অংশ হতে পারলে মানুষের জন্য আরও ভালোভাবে কাজ করার সুযোগ পাব।’
বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বলেন, ‘সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থী বাছাই ও চূড়ান্ত করবে বিএনপির স্থায়ী কমিটি। আমি দলের চেয়ারম্যানের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে বলতে পারি—তিনি সময়োপযোগী সংসদে কার্যকর ভূমিকা রাখতে যোগ্যদের বাছাই করবেন।’








































