প্রচ্ছদ জাতীয় তিনবারের স্পিকার আজ কারাবন্দি, রাজনীতির নির্মম বাস্তবতা?

তিনবারের স্পিকার আজ কারাবন্দি, রাজনীতির নির্মম বাস্তবতা?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের নিউজফিডে মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) হঠাৎ ভেসে ওঠে ৪৩ বছর আগের একটি ছবি। ছবিতে দেখা যায়, রাজধানীর হলিক্রস স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষায় ঢাকা বোর্ডে মানবিক বিভাগে প্রথম হওয়া এক শিক্ষার্থী—পাশে বসে আছেন তার বাবা-মা।

ছবিটি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে। কারণ, সেই মেধাবী শিক্ষার্থী আর কেউ নন, আওয়ামী সরকারের আমলের তিন তিনবারের জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। যিনি শুধু এসএসসিতেই নয়, এইচএসসি, বিশ্ববিদ্যালয় এবং দেশ-বিদেশের শিক্ষাজীবনে ধারাবাহিক সাফল্যে সাক্ষর রেখেছেন। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই সাফল্যের গল্পে যুক্ত হয়েছে ভিন্ন এক অধ্যায়—গ্রেফতার ও কারাবন্দি হওয়ার বাস্তবতা।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে টানা তিনবার জাতীয় সংসদের স্পিকার থাকা শিরীন শারমিন চৌধুরীকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যাচেষ্টা ও ভাঙচুরের অভিযোগে দায়ের করা একটি মামলায় মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাকে আদালতে হাজির করে রিমান্ড আবেদন করা হলে আদালত তা নামঞ্জুর করেন। একই সঙ্গে জামিন আবেদনও খারিজ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।

‘কখনো ফুলের মালা, কখনো জেলখানা’—রাজনীতির নির্মম সত্য
রাজনীতিতে বহুল প্রচলিত একটি প্রবাদ—‘কখনো ফুলের মালা, কখনো জেলখানা’। ক্ষমতায় থাকাকালে একজন রাজনীতিবিদ সম্মান, প্রভাব, নিরাপত্তা ও প্রটোকলের মধ্যে থাকেন। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান থেকে দলীয় কর্মসূচি—সবখানেই থাকে তার উপস্থিতি ও গুরুত্ব। কিন্তু ক্ষমতার পালাবদলে সেই অবস্থান দ্রুত বদলে যেতে পারে। একসময়কার প্রভাবশালী ব্যক্তিই হয়ে উঠতে পারেন মামলার আসামি, কাটাতে পারেন আত্মগোপনের জীবন। শিরীন শারমিন চৌধুরীর বর্তমান পরিস্থিতি যেন সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।

দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু
গ্রেফতারের পরপরই বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে সর্বত্র আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। পাড়া-মহল্লার চায়ের দোকান থেকে শুরু করে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে—৫ আগস্টের পর তিনি কোথায় ছিলেন? আত্মগোপনে, নাকি কোনো নিরাপদ স্থানে? আরও একটি বিষয় আলোচনায় এসেছে—বিগত সরকারের অনেক শীর্ষনেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও শিরীন শারমিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে তেমন অভিযোগ কখনো জোরালোভাবে শোনা যায়নি।

শিক্ষাজীবন: সাফল্যের উজ্জ্বল ধারাবাহিকতা
শিরীন শারমিন চৌধুরী ১৯৬৬ সালের ৬ অক্টোবর ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা রফিকুল্লাহ চৌধুরী ছিলেন সিএসপি কর্মকর্তা ও সাবেক সচিব। মা প্রফেসর নাইয়ার সুলতানা ছিলেন ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ ও পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য।

শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন অনন্য মেধাবী—

যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব এসেক্স থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন
ভোরে আটক বিকেলে কারাগারে, শিরীন শারমিনকে ঘিরে দিনভর যা হলো

রাজনৈতিক ক্যারিয়ার: ইতিহাস গড়া পথচলা
২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরে ২০১৯ সালে পুনরায় স্পিকার নির্বাচিত হন। এর আগে তিনি মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করে তিনি রাজনীতিতে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণআন্দোলনের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রেক্ষাপটে তার জীবনেও নেমে আসে অনিশ্চয়তা। একসময় যে ব্যক্তি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনসভা পরিচালনা করেন, আজ তিনি কারাগারে—এ বাস্তবতা আবারও মনে করিয়ে দেয় রাজনীতির অমোঘ সত্য: এখানে সাফল্য ও পতন, সম্মান ও অপমান—সবই পাশাপাশি চলে।