
২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম নিয়ে এখনো রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। এ সময়ের স্বাস্থ্য খাতের ব্যবস্থাপনা বিশেষভাবে সমালোচনার মুখে পড়ে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, দায়িত্ব পালনকালে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের সিদ্ধান্ত, দক্ষতা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে; তাঁর বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা ও অনিয়মের অভিযোগও সামনে এসেছে।
সাবেক এই স্বাস্থ্য উপদেষ্টা ছিলেন উন্নয়ন খাতের একজন পেশাজীবী, যার দীর্ঘ কর্মজীবন কেটেছে ক্ষুদ্রঋণভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংকে।
সেখানে তিনি মাঠ পর্যায়ের নারী উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং সংগঠন পরিচালনার বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন। উন্নয়ন প্রশাসনে তাঁর অভিজ্ঞতা থাকলেও চিকিৎসা, জনস্বাস্থ্য বা হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট কোনো পেশাগত সংশ্লেষ তাঁর ছিল না, যা পরবর্তী সময়ে আলোচনার কেন্দ্রে আসে।
খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা তাঁর দায়িত্বকালে দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে কার্যত পঙ্গু করে দিয়েছেন। যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ছিল স্বেচ্ছাচারিতা, ছিল ঘনিষ্ঠজনদের নিয়ে গড়া সিন্ডিকেটের অদৃশ্য নেটওয়ার্ক।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, উপদেষ্টা দীর্ঘ সময়েও স্বাস্থ্য খাত সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ধারণা অর্জন করতে পারেননি। কেউ কোনো পরামর্শ দিলে তা গুরুত্ব পেত না। পুরো মন্ত্রণালয় এক ব্যক্তির সিদ্ধান্তে চলছিল।
বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ও ড্যাবের সাবেক মহাসচিব ও বর্তমান মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেনও একাধিকবার পরামর্শ দিতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরেছেন।
এ জেড এম জাহিদ হোসেন গতকাল সোমবার তাঁর এক বক্তব্যে বলেন, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস যাঁকে যেখানে বসিয়েছিলেন তাঁরা ঠিকভাবে কাজ করেননি। অন্তর্বর্তী সরকারের হাম প্রতিরোধের সার্বিক প্রস্তুতি পর্যালোচনা করলেই হামের প্রাদুর্ভাবের প্রকৃত কারণ বেরিয়ে আসবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এক বক্তব্যে তিনি বলেন, ১৭ বছর স্বাস্থ্যব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়েছে। সর্বত্র আওয়ামী লীগের প্রেতাত্মারা বসে আছে। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের অপসারণ করা না হলে স্বাস্থ্য খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব নয়।
নূরজাহান বেগম প্রভাবশালী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আত্মীয় হওয়ায় তিনি কার্যত জবাবদিহির বাইরে থাকতেন। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল সীমিত এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতেন এককভাবে।
বদলি বাণিজ্য : পছন্দের পোস্টিং পেতে মোটা অঙ্ক
নূরজাহান বেগম উপদেষ্টা থাকাকালে মন্ত্রণালয়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। এই সিন্ডিকেটের মূল সদস্যরা ছিলেন নূরজাহান বেগমের একান্ত সচিব (যুগ্ম সচিব) ড. মোহাম্মদ মঞ্জুরুল ইসলাম, যিনি আর্থিক লেনদেনের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি; স্বাস্থ্য উপদেষ্টার এপিএস তুহিন ফারাবী বদলি ও কেনাকাটায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতেন। এ ছাড়া সিন্ডিকেটে নাম ছিল এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব ডা. মাহমুদা মিতু, যিনি কেনাকাটা ও অন্যান্য প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন।
এ ছাড়া উপদেষ্টার স্বামী এবং ছেলেও সরাসরি দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলেও জানান একাধিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। তাঁরা বলেন, স্বাস্থ্য উপদেষ্টার স্বামী সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক খন্দকার আসাদুজ্জামান নিয়োগ বাণিজ্যে প্রভাব বিস্তার করতেন এবং ছেলে অন্তু বিভিন্ন ‘ক্লায়েন্ট’ সংগ্রহ ও যোগাযোগ রক্ষার দায়িত্বে ছিলেন। স্বামী ও ছেলে উভয়েই আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ফলে পুরো ব্যবস্থাটি অনেকের কাছে একটি ‘পারিবারিক ক্ষমতা কাঠামো’ হিসেবে প্রতীয়মান হতো। এ বিষয়ে কথা বললে বদলি ও বিভাগীয় শাস্তির হুমকি আসত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ঢাকা থেকে সব অভিজ্ঞ চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীকে একযোগে ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়। এতে রাজধানী শহরের জরুরি সেবা একেবারে অচল হয়ে পড়ে।
দুদকের জালে নূরজাহান বেগমের সাবেক দুই সহকারী
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের সাবেক দুই ব্যক্তিগত কর্মকর্তা তুহিন ফারাবী ও মাহমুদুল হাসানের নামে থাকা সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ জারি করে। সূত্রের ভাষ্য, স্বাস্থ্য উপদেষ্টার কার্যালয়ে দায়িত্ব পালনের সময় কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরকারি বরাদ্দের অপব্যবহার, নিয়োগ বাণিজ্য ও সরবরাহ কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ওই অভিযোগের ভিত্তিতেই তুহিন ফারাবী ও মাহমুদুল হাসানের সম্পদ যাচাই শুরু করে দুদক।
তুহিন ফারাবীর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, স্বাস্থ্য উপদেষ্টার দপ্তরে কাজ করার সময় ক্ষমতার অপব্যবহার ও তদবির বাণিজ্যের মাধ্যমে নামে-বেনামে শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছেন। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় নিজের, স্ত্রী ও সন্তানদের জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, আয়করের হালনাগাদ নথি এবং ব্যাংক হিসাবের বিবরণী জমা দিতে বলা হয়।
অন্যদিকে, ডা. মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধেও ক্ষমতার অপব্যবহার ও টেন্ডারবাজির মাধ্যমে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। তাঁকেও নিজের ও পরিবারের জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, আয়কর নথি এবং ব্যাংক বিবরণীসহ হাজির হতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
এরপর গত ২৭ মে তুহিন ফারাবী ও মাহমুদুল হাসানের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা এবং তাঁদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ব্লকের নির্দেশ দেন ঢাকা মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক মো. জাকির হোসেন গালিব।
তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি করেছিলেন হাসনাত
এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ গত বছর চাঁদপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এক পথসভায় অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের পদত্যাগ দাবি করেছিলেন। স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও চিকিৎসা সম্পর্কে তিনি ‘কিছু বোঝেন না’ বলেও মন্তব্য করেছিলেন হাসনাত।
হাসনাত আবদুল্লাহ আরো বলেছিলেন, ‘এই সরকারের কাছে অনেক প্রত্যাশা ছিল। অভ্যুত্থানের পর আমরা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা আগের মতো, আইন-শৃঙ্খলাব্যবস্থাও আগের মতো। একজন স্বাস্থ্যমন্ত্রী (উপদেষ্টা) আছেন, চেনেন উনাকে? উনি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভাই-ব্রাদার কোটায় আসছেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের স্বজনপ্রীতির সবচেয়ে বড় উদাহরণ স্বাস্থ্য উপদেষ্টা। সব সময় বলে আসছি, এই স্বাস্থ্য উপদেষ্টার কোনো প্রয়োজন নেই।’
হামসহ ১০টি রোগের টিকা সংকট
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পূর্ণ প্রস্তুতি ছাড়াই চতুর্থ সেক্টর প্রোগ্রাম (স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি) কর্মসূচির অধীন অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) ব্যবস্থা বাতিল করে দেওয়া হয়। এর ফলে দেশে হামসহ ৮-১০টি রোগের টিকার চরম সংকট দেখা দেয়। তাতে ২০২৫ সালে টিকাদানের হার নেমে আসে ৫৭.১ শতাংশে, যা গত আট বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ফলে বর্তমানে হামের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়েছে এবং শিশুমৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, আগে ইপিআইয়ের আওতায় টিকা সংগ্রহ ও বিতরণে ইউনিসেফ ও গাভীর সহায়তায় লাইন ডিরেক্টরের মাধ্যমে দ্রুত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতো। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ওপি ব্যবস্থা বাতিল করে নতুন প্রকল্প দলিল প্রস্তুত, অনুমোদন, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ ও তহবিল ছাড়ে বিলম্ব করে। ফলে টিকা সংগ্রহ প্রক্রিয়া পুরোপুরি বিঘ্নিত হয়। এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ডা. মোজাহেরুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশে হামের এমন পরিস্থিতির জন্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার ও তার স্বাস্থ্য বিভাগ দায়ী। কেন তারা শিশুদের সুরক্ষার বিষয়টি নিয়ে অবহেলা করল। কেন টিকা দিতে পারল না। কেন সময়মতো টিকা কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব হলো না, তা নিয়ে সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। এই গাফিলতির জন্য দায়ীদের বিচার হওয়া উচিত। কারণ এটা সরকারের রুটিন কাজ। এটি নির্দিষ্ট সময়ে সম্পন্ন করা সরকারের দায়িত্ব। সরকারে যারাই থাকুক এই ব্যর্থতার দায় তাদেরই নিতে হবে। সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার চেষ্টা করেও সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম ও তাঁর বিশেষ সহকারী অধ্যাপক সাইদুর রহমান এবং মাহমুদা মিতুর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এমনকি মেসেজ পাঠালেও তাঁরা সাড়া দেননি।










































