প্রচ্ছদ জাতীয় সরকার ও বিরোধী দলে যুদ্ধ কেন

সরকার ও বিরোধী দলে যুদ্ধ কেন

রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের পর দেশে একটি পরিবর্তন এসেছে। আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদ পরাজিত হয়েছে এবং শেখ হাসিনা সদলবলে ভারতে পালিয়ে গেছেন।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে একটি সুষ্ঠু, সুন্দর নির্বাচন হয়েছে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে ত্রয়োদশ সংসদ গঠিত হয়েছে এবং নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। শুরু হয়েছে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা।

ত্রয়োদশ সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশন শুরু হয় ১২ মার্চ ২০২৬। এরপর ১৫ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত ১৩ দিনের বিরতি ছিল। ২৯ মার্চ থেকে আবার অধিবেশন শুরু হয়েছে। ৫ এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র সাত কার্যদিবস চলেছে। আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত এ অধিবেশন চলার কথা।

ত্রয়োদশ সংসদকে ঘিরে মানুষের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী। তবে সংসদের মাত্র সাত কার্যদিবসের মধ্যেই এর গায়ে লেগেছে বিভাজনের তপ্ত হাওয়া। সংসদের ভেতরে আলোচনার টেবিল ছাপিয়ে বিরোধী দল রাজপথে পা বাড়িয়েছে। বিরোধী দল কেন রাজপথে, তা বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে সরকারি দল কেন বিরোধী দলকে সংসদে ধরে রাখতে ব্যর্থ হলো? জুলাই সনদ ও গণভোটের দাবিতে বিরোধী দলের অনঢ় অবস্থান ও কয়েক দফা ওয়াকআউট, অন্যদিকে ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ নিয়ে সরকারের ভূমিকা এ সংকটের সৃষ্টি করেছে। বিরোধী দল থেকে বলা হচ্ছে, সরকার রাষ্ট্র সংস্কার থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে। আর সরকারের বক্তব্য হচ্ছেÑবিরোধী দলের এ দাবি মোটেও ঠিক নয়। তারা জুলাই সনদ নিয়ে যে ঐকমত্যে এসেছে, সে অবস্থানেই আছে। সরকার সুচিন্তিতভাবেই সংসদে তার ভূমিকা রাখছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংসদ নিয়ন্ত্রণ করছে বলে বিরোধী দলের দাবি ঠিক নয়। বরং বিরোধী দলই সংস্কারের নামে প্রাধান্য বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে সংসদে ও বাইরে।

সংবিধান নিয়ে খালেদা জিয়া কী বলেছিলেন

সংবিধান ছুড়ে ফেলা নিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার পুরোনো একটি মন্তব্য বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে, বাহাত্তরের সংবিধান বাতিল বা সংস্কার বিতর্কের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি সামনে এসেছে। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের নেতাদের অনেকেই খালেদা জিয়ার ওই বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিচ্ছেন। তারা বলছেন, খালেদা জিয়া বাহাত্তরের সংবিধান ছুড়ে দেওয়ার কথা বলেছিলেন, বিষয়টা কতটা সঠিক? খালেদা জিয়া কী সংবিধান ছুড়ে ফেলার কথা বলেছেন? তিনি কি ‘বাহাত্তরের সংবিধান’ কথাটি উল্লেখ করেছিলেন?

খালেদা জিয়া সংবিধান ছুড়ে ফেলার কথাটি বলেছেন। তবে তিনি বাহাত্তরের সংবিধান শব্দটি বলেননি। তার বক্তব্যটি প্রধানত ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাসের প্রেক্ষাপটে তিনি দিয়েছিলেন। শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিধান সংবিধানে অত্যন্ত কুৎসিত এবং একদলীয় মানসিকতা নিয়ে যুক্ত করে, তখন তিনি এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘হাসিনার সংবিধান থাকবে না। সংবিধান নিয়ে তারা যা খুশি তা করেছে। ইনশাআল্লাহ ক্ষমতায় গেলে এই সংবিধান ছুড়ে ফেলে দেওয়া হবে।’ তার বক্তব্যের মূল সুর ছিল পুরো সংবিধান বা বাহাত্তরের প্রণীত সংবিধান নয়, সংবিধানে যেসব বিতর্কিত সংশোধনী আনা হয়েছে, তা ছুড়ে ফেলে দেওয়া। শেখ হাসিনা নিজের ক্ষমতা সংহত করে যে সংশোধনী যুক্ত করেছেন, সেই একদলীয় সংবিধান বদলে ফেলা। অথচ এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ ও তাদের অন্য নেতারা খালেদা জিয়ার বক্তব্যের রেফারেন্স টেনে দাবি করছেন, খালেদা জিয়া নিজেও বাহাত্তরের সংবিধান ছুড়ে ফেলে দেওয়ার কথা বলেছিলেন, যা বর্তমান সংবিধান বাতিলের দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানও একই বক্তব্য দিয়েছেন। বিএনপি থেকে অবশ্য স্পষ্ট করা হয়েছে, খালেদা জিয়া পুরো সংবিধান ছুড়ে ফেলে দেওয়ার কথা বলেননি। তিনি মূলত শেখ হাসিনার আমলে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের বিরোধিতা করে ওই একদলীয় সংশোধনীগুলো ছুড়ে ফেলে দেওয়ার কথাই বুঝিয়েছেন। তার বক্তব্যকে খণ্ডিতভাবে বিরোধী দল প্রচার করছে।

স্বাধীনতার পর বাহাত্তরে সংবিধান রচিত হয়েছে। এর ভালোমন্দ পর্যালোচনা করে দেশের জন্য ভালো এবং সময়োপযোগী যেসব সংশোধনী আনা প্রয়োজন, তা আলোচনা করে আনা যায়। এটি পুরোপুরি বাতিল করার বিষয় আনা হলে তা নিয়ে বিতর্ক তো উঠবেই। শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালে একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা সংবিধানে সংযোজন করেছিলেন। জিয়াউর রহমানের সরকার তা বাতিল করেছিলেন। সংবিধানে বিসমিল্লাহির রাহমানির ও আল্লাহর ওপর বিশ্বাস সংযোজন করেছিলেন। দেশের জন্য ও মানুষের জন্য প্রয়োজন এমন বিষয় সংবিধানে তো সংযোজন হতেই পারে।

রাজনীতি আবার কেন অসহিষ্ণু

সরকারি দল বিএনপি এবং বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১১টি দলের জোট বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনকে সরগরম করে তুলছে। সরকারি দল দোষ করলে বিরোধী দল সমালোচনা করবে, প্রতিবাদ করবে সেটা যুক্তিযুক্ত। দেশের স্বার্থ প্রাধান্য পেলে সেটা অবশ্যই ভালো একটা দিক। কিন্তু আক্রমণ বা প্রতি আক্রমণ কিংবা অসহিষ্ণুতা যদি জাতীয় স্বার্থকে বিঘ্নিত করে, সেটি কখনোই কাম্য হতে পারে না।

বর্তমানে রাজনীতির ক্ষেত্রে একটা প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে, বিরোধী দলের নেতারা কথায় কথায় বিএনপিকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে তুলনা করছেন, বিএনপিকে ভারতের দালাল হিসেবে চিহ্নিত করছেন, তারেক রহমানকে শেখ হাসিনার সঙ্গে তুলনা করে তাকেও পালাতে বাধ্য করা হবে বলে বক্তব্য দিচ্ছেন। এগুলো অসহিষ্ণুতারই বহিঃপ্রকাশ। এতে বিএনপির মধ্যেও একপ্রকার জেদের সৃষ্টি হচ্ছে। একসময়ের সহায়ক শক্তি সম্পর্কে বিতৃষ্ণা সৃষ্টি হচ্ছে। এই প্রবণতা বাংলাদেশের নবজাতক গণতন্ত্রের জন্য একটি বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। বিএনপিকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে তুলনা করে যেমন সংঘাত উসকে দেওয়া হচ্ছে, তেমনি বিএনপির কঠোর প্রতিক্রিয়াও দূরত্ব বাড়াচ্ছে।

বিএনপি একটি দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাসসম্পন্ন দল। তাদেরকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে ঢালাওভাবে আক্রমণ করা কোনোভাবেই ঠিক হচ্ছে না। ‘আওয়ামী লীগ যে স্টাইলে চলত, বিএনপিও সেভাবে চলছে’Ñএ ধরনের তকমা দেওয়া অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। আর বিএনপিকেও বুঝতে হবে, ১৫ বছরের স্বৈরশাসনের পর মানুষের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী। ছোটখাটো সমালোচনাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে না নিয়ে সেগুলো জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে গ্রহণ করার মতো রাজনৈতিক দূরদর্শিতা দেখাতে হবে। বিরোধী দলকে আস্থায় নিতে হবে। জাতীয় জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ব্যাপারে বিরোধী দলের প্রাজ্ঞ এবং অভিজ্ঞ নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করলে দোষ কী? এতে বিরোধী দল নিজেদের সম্মানিতবোধ করবে এবং সরকারের প্রতি বিদ্বেষভাব দূর হবে।

মনে রাখতে হবে, জুলাই ছাত্র গণঅভ্যুত্থান কোনো একক দল বা গোষ্ঠীর বিজয় নয়। এটি ছিল একটি দীর্ঘ অত্যাচারী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতা ও সব রাজনৈতিক শক্তির সম্মিলিত বিস্ফোরণ। আজ যদি এই বিপ্লবের অংশীদাররা একে অন্যের দিকে কাদা ছোড়াছুড়িতে লিপ্ত হয়, তবে পর্দার আড়াল থেকে সেই পরাজিত শক্তিই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে, হাসবে এবং ফিরে আসার নীলনকশা করবে। সময় এসেছে সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ প্রাধান্য দেওয়া।

জুলাই ছাত্র গণঅভ্যুত্থান ছিল সবার

চব্বিশের ছাত্র গণঅভ্যুত্থান ১৫ বছরের আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপ। এ আন্দোলনে নানা মতাদর্শের ছাত্ররা যেমন জড়িত, তেমনি জড়িত সাধারণ ছাত্র, রাজনৈতিক শক্তি এবং পেশাজীবী সমাজ। এই গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। সাংবাদিক হিসেবে এর সঙ্গে আমরাও জড়িত ছিলাম। সেখানে আমরা রাজপথে সাধারণ জনগণ ও সহযোদ্ধাদের দেখেছি, সেখানে কোনো নির্দিষ্ট দলের ট্যাগ ছিল না। যেমন ছিল বিএনপি, তেমনি ছিল জামায়াতে ইসলামী এবং অন্যান্য দল। লন্ডন থেকে বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানেরও একটি বিশেষ ভূমিকা ছিল। আমরা দেখেছি, তারেক রহমান তার মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকে পাশে বসিয়ে রেখে ছাত্রনেতা, ছাত্র সমন্বয়ক এবং তার দলের ছাত্রনেতাদের সঙ্গে আন্দোলন নিয়ে কথা বলেছেন, প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বুঝিয়েছেন, দলের শীর্ষ নেতৃত্ব সপরিবারে এই আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। জাইমাকে পাশে বসানোর কারণ ছিল, নতুন প্রজন্মকে গুরুত্ব দেওয়া। জাইমা রহমানের উপস্থিতি মূলত তরুণ qর আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একটি সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা হিসেবেই দেখা হয়েছিল।

১৫ বছরের আন্দোলন নানাভাবে হয়েছে। ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরশাসনের অপকর্মগুলো এক্সপোজ হয়েছে। শেখ হাসিনার সরকারটি পচতে পচতে দুর্গন্ধময় হয়েছে। এরপর দরকার ছিল একটা বড় ধাক্কা দেওয়া। সেই ধাক্কাটাই চব্বিশের ছাত্র গণঅভ্যুত্থান। সবাই মিলেই পরিকল্পনা হয় কোনো রাজনৈতিক দল কিংবা ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীর ব্যানারে আন্দোলন হবে না। তাহলে শেখ হাসিনার সরকার সুযোগ নেবে। আন্দোলনের সামনে থাকবে একান্তই নতুন ছাত্ররা, সাধারণ ছাত্র ও সাধারণ মানুষ। এভাবেই আন্দোলনকে রূপ দেওয়া হয়। তবে ভেতরে সবাই অংশগ্রহণ করেছিলেন। যেমন ছিল বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, তেমনি ছিল ছাত্রদল, যুবদল ও ছাত্রশিবির। ছিলেন সাংবাদিক, আইনজীবী ও চিকিৎসক, কৃষিবিদ, শিক্ষকসহ নানা পেশার মানুষ। ফলে আন্দোলন সফল হয়েছে। জুলাই আন্দোলনে নিহতদের মধ্যে বিএনপির ৪২২ জন হত্যার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ছাত্রদল, যুবদল নেতাকর্মীরা রয়েছেন। জামায়াতে ইসলামী থেকে বলা হয়েছে, জুলাই আন্দোলনে জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের একটি বড় অংশ হত্যার শিকার হয়েছে। তারা শহীদদের নিয়ে ছয় খণ্ডের বইও প্রকাশ করেছে।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, জুলাই ছাত্র গণঅভ্যুত্থানে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্টে ১৪০০ ছাত্র-জনতা হত্যার তথ্য রয়েছে। আন্দোলনে ২৫ হাজারের মতো মানুষ আহত হয়েছে। তাদের কারো চোখ নেই, কারো হাত-পা নেই কিংবা নেই অন্য কোনো অঙ্গ। অনেকেই চিরতরে পঙ্গু হয়েছে।

সংকট সৃষ্টি নয়, রাজনৈতিক সমঝোতা করুন

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিয়ে নতুন ত্রয়োদশ সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

সংবিধানের নিয়ম অনুযায়ী সংসদ না থাকলে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। বিগত সরকার সে অনুযায়ী দেশের স্বার্থেই ওই অধ্যাদেশগুলো জারি করেছে। নিয়ম অনুযায়ী সংসদ বসার ৩০ দিনের মধ্যে অধ্যাদেশ সংসদ পাস করলে তা আইনে পরিণত হবে, অন্যথায় অধ্যাদেশের কার্যকারিতা শেষ হয়ে যাবে। ফলে সংসদে অধ্যাদেশ উত্থাপিত হয় এবং এগুলোর ভাগ্য নির্ধারণের জন্য সংসদ থেকে একটি বিশেষ কমিটি করে দেওয়া হয়। কমিটিতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী তথা বিরোধী দলের সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বিশিষ্ট আইনজ্ঞ অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীনের নেতৃত্বে কমিটি কয়েকটি সভায় মিলিত হয়ে অধ্যাদেশগুলোর ব্যাপারে রিপোর্ট তৈরি করে গত ২ এপ্রিল ২০২৬ সংসদে সুপারিশ আকারে পেশ করেছেন। ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি অধ্যাদেশ কোনো পরিবর্তন ছাড়াই হুবহু বিল আকারে সংসদে তোলার সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ। ১৫টি অধ্যাদেশ প্রয়োজনীয় সংশোধনীর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংসদে বিল আকারে তোলার কথা বলা হয়েছে। মোট ২০টি অধ্যাদেশ বর্তমান অবস্থায় সংসদে অনুমোদিত হচ্ছে না। ফলে সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী এগুলো নির্দিষ্ট সময়ের পর বাতিল বা তামাদি হয়ে যাবে। এই ২০টি অধ্যাদেশের ভাগ্য আবার দুভাগে বিভক্ত। ১৬টি অধ্যাদেশ এখনই পাস না করে আরো শক্তিশালী করে পরে নতুন বিল আকারে আনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গণভোট অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং তথ্য অধিকার অধ্যাদেশ অন্যতম। স্থায়ীভাবে চারটি অধ্যাদেশ রহিত ও হেফাজতের জন্য এখনই সংসদে বিল আনার সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ অন্তর্ভুক্ত।

কমিটির সুপারিশের ওপর বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর তিনজন সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান ও গাজী নজরুল ইসলাম ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত দিয়েছেন। তারা বিশেষ করে, গুম প্রতিরোধ, গণভোট এবং মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত ১১টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারমূলক অধ্যাদেশ বহাল রাখার দাবি জানিয়েছেন।

জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় বিরোধীদলীয় জোটের দাবি হচ্ছে, গণভোটের রায় মেনে অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে এবং এর মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার করা প্রয়োজন। এ দাবিতে বিরোধী দল সংসদে প্রতিবাদ জানিয়ে বক্তব্য দেয়, ওয়াকআউট করে এবং রাজপথে আন্দোলনের সূচনা করে। ইতোমধ্যে গত শনিবার তারা বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে। তারা জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা বা ‘জুলাই সনদ’ দ্রুত কার্যকর করার দাবি জানায়। তারা এ কথাও বলে, কোনো নির্দিষ্ট দলকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য জুলাই বিপ্লব হয়নি। জুলাই বিপ্লব ছিল ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা ভেঙে নতুন ব্যবস্থা গড়ার জন্য। দাবি পূরণ না হলে আগামীতে কঠোর আন্দোলনেরও হুমকি দেয় তারা।

সরকারি দল বিএনপির পক্ষ থেকে সংসদে ও সংসদের বাইরে এ নিয়ে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। তারা বলেছে, বিরোধী দল এমন বক্তব্য দিচ্ছে, বিএনপি জুলাই সনদের বিরোধী। কিন্তু বিএনপিই সবার আগে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে এবং ঐকমত্য কমিশনে জুলাই সনদের বিষয়ে ঐকমত্যে শামিল হয়েছে। বেশিরভাগ বিষয়ে সবাই একমত হয়েছি। কয়েকটি বিষয়ে বিএনপি ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে। বিএনপি থেকে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, নির্বাচনে বিএনপি প্রয়োজনীয়সংখ্যক আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে জুলাই সনদের ব্যাপারে আমরা যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সেভাবে তা কার্যকর করা হবে। অর্থাৎ, যেসব বিষয়ে সবাই একমত, সেগুলো হয়ে যাবে। বিএনপি যেসব বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে, সেভাবে করবে। তাহলে এখানে বিএনপির দোষ কোথায়?

বিরোধী দলের বক্তব্য অনুযায়ী কোনো নির্দিষ্ট দলকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য জুলাই আন্দোলন হয়নি। এখানে কথা হচ্ছে, কোনো না কোনো দল তো সরকারে বসবেই। সেটা তো জনগণের এখতিয়ার। তারা কাকে ক্ষমতায় বসাবে। একটি স্বচ্ছ নির্বাচন হয়েছে। সেই নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয়েছে এবং সরকার গঠন করেছে। বিএনপি তো গায়ের জোরে ক্ষমতায় বসেনি। তারাও তো জুলাই আন্দোলনেরই শক্তি। তবে সরকারি দল হিসেবে বিএনপিকে এককভাবে শুধু বিএনপি নিয়ে চিন্তা করলে চলবে না। সবাইকে গুরুত্ব দিয়েই চিন্তা করতে হবে। আওয়ামী ফ্যাসিবাদ থেকে শিক্ষা নিতে হবে। দেশের স্বার্থের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে বিরোধী দলকে আস্থায় নিয়ে কাজ করতে হবে। সংসদ বসার এক মাসের মধ্যেই বিরোধী দল কেন রাজপথে যাবে। বিরোধী দলকে বুঝতে হবে, তারা এটা ঠিক করছেন না। সরকারকেও তাদের আস্থায় নিতে হবে। বিরোধিতার জন্যই বিরোধিতা করা যাবে না। গঠনমূলক বিরোধী দল হতে হবে। তাদের ছায়া সরকারের ভূমিকা পালন করতে হবে। তেমনি সরকারি দলকেই বুঝতে হবে বিরোধী দলকে যাতে সংসদে ধরে রাখা যায়। সংসদে তাদের পর্যাপ্ত আলোচনা করা এবং বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। তারা যেন রাজপথে যেতে না পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে।

ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ পরবর্তী রাজনীতিতে চব্বিশের জুলাই ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের সহযোগী শক্তিগুলোর মধ্যে যে ঐক্য বজায় থাকার কথা ছিল, সেখানে ফাটল ধরাচ্ছে ‘জুলাই সনদ’ ও ‘গণভোট ইস্যু’। ওই আন্দোলনের প্রধান দুই শক্তি হচ্ছে বর্তমানে রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকা বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট, যারা সংসদে বিরোধী দল। বর্তমানে ১১-দলীয় জোটের রাজপথের বিক্ষোভ এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সংসদীয় সিদ্ধান্তগুলো দেশের রাজনীতিতে একটি নতুন সংকট তৈরি করেছে। এ সংকট থেকে উত্তরণের উপায় হচ্ছে, দলীয় অনঢ় অবস্থান নয় (উভয়ের ক্ষেত্রে), প্রয়োজন জুলাই আন্দোলনের সেই বৃহত্তর জনআকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা।

বিএনপি শক্তিশালী আইন করার কথা কেন বলছে

অনেকে মনে করেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, গুম প্রতিরোধ, দুর্নীতি দমন কমিশন শক্তিশালীকরণ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়-সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো বাতিল বা কার্যকর করা না হলে দেশ আবার পুরোনো আইন ও ব্যবস্থার দিকে ফিরে যাবে। এতে জনগণের আস্থা অর্জিত হবে না। অতীতে সংস্কারের সুযোগ এলেও তা কাজে লাগানো হয়নি। এটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনারও পরিপন্থী।

তবে সরকারি দল বিএনপির অবস্থান হচ্ছে, আইনপ্রয়োগের মূল ক্ষেত্র বিচার বিভাগকে আগে ঠিক করতে হবে, তারপর শক্তিশালী আইন পাস করতে হবে। অন্যথায় ফ্যাসিস্ট মানসিকতার কর্মকর্তাদের হাতে ভালো আইনও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। এ বিষয়ে বিএনপির বেশ কয়েকজন নীতিনির্ধারকের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা বলেন, সরকার এসেছে খুব অল্পদিন হয়েছে। সংসদ বসেছে এক মাসও হয়নি। এখনই বিএনপিকে স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী তকমা দেওয়া কি ঠিক হচ্ছে? বিএনপি তো বাংলাদেশের স্বার্থকে সবসময় মূল্য দিয়ে এসেছে। ষষ্ঠবারের মতো ক্ষমতায় এসেছে। বিএনপি কী করতে পারে, মানুষ তো জানে। বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অনেক অধ্যাদেশের আইনি ভিত্তি বা সংজ্ঞা শক্তিশালী নয়, যতটা একটি দীর্ঘমেয়াদি আইনের হওয়া উচিত। বর্তমান বিচারক বা কর্মকর্তাদের অধীনে এই দুর্বল আইনগুলো কার্যকর করলে হিতে বিপরীতও হতে পারে। নতুন বিচারক নিয়োগ বা পুরোনোদের বিষয়ে বিএনপির কিছুটা অসন্তুষ্টি বা সতর্কতা রয়েছে। আইনের সঠিক প্রয়োগের জন্য যে ধরনের ‘মাইন্ডসেট’ প্রয়োজন, তা বর্তমান বিচার বিভাগে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই তড়িঘড়ি করে কোনো অধ্যাদেশকে স্থায়ী আইনে রূপান্তর করলে বর্তমান বিচারিক কাঠামোতে (যেখানে এখনো আগের আমলের ‘ফ্যাসিস্ট প্রভাব’ রয়ে গেছে) তার অপব্যবহার হতে পারে। তাই আগে একটি ‘নিরপেক্ষ বিচার বিভাগ’ নিশ্চিত করার ওপর বিএনপি জোর দিচ্ছে। স্বতন্ত্র ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’ গঠনের বিধানে তাই বিএনপি সুচিন্তিতভাবে করতে চাচ্ছে। বিএনপির বক্তব্য হচ্ছেÑসরকারি দল হিসেবে তাকে ইমোশনকে প্রাধান্য দিলে চলবে না। দেশের ভবিষ্যৎ স্বার্থ বিবেচনা করে প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে হবে।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, আমার দেশ