প্রচ্ছদ জাতীয় আমাদের মানবিকতা কি কেবল ‘সুন্দর’ পথশিশুদের জন্য?

আমাদের মানবিকতা কি কেবল ‘সুন্দর’ পথশিশুদের জন্য?

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া আট বছর বয়সী পথশিশু ফায়জা আক্তার মাইশা এখন টক অফ দ্য কান্ট্রি। ডাগর চোখ আর মিষ্টি হাসির এই ‘ফুলকুমারী’র ভিডিও ভাইরাল হতেই চারদিকে পড়ে গেছে শোরগোল। চার বছর আগে মাকে হারানো আর বাবার অবহেলার শিকার মাইশা থাকতো নানীর সঙ্গে, জীবন চলত রাস্তায় ফুল বিক্রি করে।

ইতোমধ্যেই সিলেটের বিশিষ্ট ব্যক্তি ও ফাহিম আল চৌধুরী ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ফাহিম আল চৌধুরী শিশুটির আজীবন শিক্ষা ও আবাসনের দায়িত্ব নিয়েছেন। পুলিশ প্রশাসনও তাকে খুঁজে বের করে সংবাদ সম্মেলন করেছে। মাইশার জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি নতুন জীবনের শুরু, কিন্তু এই ঘটনার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক কদর্য সামাজিক বাস্তবতা।

নেটিজেনদের একটি বড় অংশ প্রশ্ন তুলছেন— মাইশা আজ সাহায্য পাচ্ছে কারণ সে দেখতে ‘সুন্দর’ এবং ‘কিউট’। কিন্তু পাশের গলিতেই ধুলোবালি মেখে পড়ে থাকা যে শিশুটির গায়ের রঙ কালো বা মুখশ্রী সাধারণ, তার দিকে কি আমাদের ক্যামেরা ঘোরে?

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একজন ব্যবহারকারী আক্ষেপ করে লিখেছেন, “আমাদের দেশে পথশিশুর দায়িত্ব নেওয়ার মতো মানুষের অভাব নেই, কিন্তু শর্ত একটাই— শিশুটিকে হতে হবে অসম্ভব সুন্দর। তা না হলে তার কপালে ভিক্ষাও জোটে না।”

মাইশার দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা আসার পর এখন শুরু হয়েছে এক ধরণের ‘মানবিকতার প্রদর্শনী’। কন্টেন্ট ক্রিয়েটর, কিছু অতি-উৎসাহী সাংবাদিক এবং রাজনীতিবিদরা এখন সোনা-দানা আর উপহার নিয়ে ছুটছেন মাইশার সাথে একটি ছবি বা ভিডিও তোলার জন্য। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এটি কি মাইশার প্রতি ভালোবাসা, নাকি মাইশাকে ব্যবহার করে নিজেদের ‘ভাইরাল’ করার চেষ্টা? পথশিশু ছেলেদের ক্ষেত্রে কেন এই একই উন্মাদনা দেখা যায় না? আমাদের মানবিকতা কি কেবল লেন্সের ফোকাস আর লাইক-কমেন্টের ওপর নির্ভরশীল? আমাদের সমাজে সত্যিই কারোর যদি অসহায় পথ শিশুদের পাশে মানবিক সহায়তা নিয়ে দাঁড়ানোর মহৎ উদ্দেশ্য থেকে থাকে, তাহলে এমন সহানুভূতি প্রাপ্য শিশু হাতের নাগালে খুঁজে পাওয়া তার পক্ষে কি কঠিন কিছু?

সচেতন নেটিজেনরা বলছেন, প্রতিটি শিশুই সুন্দর, প্রতিটি শিশুই একেকটি সম্ভাবনা। অন্ন, বস্ত্র এবং শিক্ষার অধিকার পাওয়ার কথা প্রতিটি প্রাণচঞ্চল শিশুর। কিন্তু সমাজ যখন কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্য দেখে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়, তখন সেই সাহায্য কি সত্যিই মানবিকতা, নাকি কেবলই এক ধরণের ‘নান্দনিক বিলাসিতা’? মাইশার কপাল হয়তো ফিরেছে, কিন্তু ফুটপাতে ঘুমিয়ে থাকা বাকি হাজার হাজার ‘অসুন্দর’ মাইশাদের কী হবে? আমাদের মানবিকতা যেন কেবল ক্যামেরার এঙ্গেল বা ফিল্টারের ওপর ভিত্তি করে না হয়।

একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, “মনে রাখা প্রয়োজন: মানুষ সৌন্দর্যের বশ হতে পারে, কিন্তু মনুষ্যত্ব যেন কেবল সৌন্দর্যের কাছে বন্দি না থাকে। প্রতিটি শিশুরই প্রয়োজন একটু ভালোবাসা আর নিরাপদ আশ্রয়— কোনো ভাইরাল ট্যাগ ছাড়াই।”