
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার প্রভাবে বাংলাদেশেও জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইনডিপেনডেন্ট’ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীলতার কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে জ্বালানিশূন্য হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বেশিরভাগ জাহাজের জন্য বন্ধ থাকা হরমুজ প্রণালি ইরান ফের খুলে দেবে কি না, তা নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মধ্যে তেলের দাম অনেক বেড়ে গেছে। পারস্য উপসাগরকে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্তকারী এই প্রণালি দিয়েই এশিয়ার অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৯০ শতাংশ পরিবাহিত হয়।
সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের বাংলাদেশ তার জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশের জন্য আমদানির ওপর নির্ভর করে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানিতে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটায় বাংলাদেশ যানবাহনের জন্য জ্বালানি রেশন, ডিজেল বিক্রিতে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ করে দিয়েছে। মোটরসাইকেল আরোহী এবং বিভিন্ন পরিবহনের চালকরা সীমিত পরিমাণ জ্বালানি পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে সারা রাত অপেক্ষা করছেন। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার পর বেশ কিছু ফিলিং স্টেশন বাঁশের ব্যারিকেড দিয়ে তাদের গেট বন্ধ করে দিয়েছে, আর জ্বালানি সরবরাহকারী পাম্পগুলো নীল প্লাস্টিকে মুড়িয়ে রাখা হয়েছে, যা সরবরাহ সংকটের তীব্রতাকেই প্রতিফলিত করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজধানীর বাইরের এলাকাগুলোতে এই সংকট আরও প্রকট; সেখানে এক থেকে দুই লিটারের প্লাস্টিকের বোতলে অনানুষ্ঠানিকভাবে অনেক বেশি দামে জ্বালানি বিক্রি হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নবনির্বাচিত সরকার এই পরিস্থিতির একটি সমাধান খুঁজে বের করতে হিমশিম খাচ্ছে। বাংলাদেশ এখন ক্রমবর্ধমান জ্বালানি খরচ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ এবং এই জ্বালানি সংকটের মধ্যে প্রথম দেশ হিসেবে জ্বালানি সরবরাহ শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কার মুখোমুখি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মাসের শেষের দিকে বাংলাদেশের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে প্রায় ৮০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল মজুত ছিল, যা দেশকে মাত্র দুই সপ্তাহের কিছু বেশি সময় সচল রাখতে সক্ষম। ডিজেলের মজুদের অবস্থাও প্রায় একই রকম। ঢাকা এখন সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, আজারবাইজান, কাজাখস্তান, অ্যাঙ্গোলা ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করে জ্বালানি আমদানিতে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছে। রাশিয়া থেকে ৬ লাখ টন ডিজেল আমদানির জন্য ভারত যে ধরনের ছাড় পেয়েছে, বাংলাদেশও যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অনুরূপ সুবিধা চেয়ে আবেদন করেছে।
বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের এক কর্মকর্তা দ্য ইনডিপেনডেন্টকে বলেন, ‘পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। স্পট মার্কেট থেকে কেনাকাটা আমাদের কোষাগার শূন্য করে দিচ্ছে, কিন্তু সরকারের কিছু করার নেই। আমাদের হাতে ১০ দিনেরও কম সময়ের মজুত আছে।’
দেশের গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বাংলাদেশ চড়া দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সংগ্রহের জন্য ব্যয়বহুল স্পট মার্কেটের দিকে ঝুঁকেছে। দুই দিনের প্রচেষ্টায় সরকারি জ্বালানি সংস্থা পেট্রোবাংলা বুধবার ১ মার্চের তুলনায় প্রায় ২.৫ গুণ বেশি দামে দুটি এলএনজি কার্গো নিশ্চিত করেছে।
বিশেষজ্ঞরা এই সংকট ঘনীভূত হওয়ার জন্য অনানুষ্ঠানিক সিন্ডিকেটগুলোকেও দায়ী করছেন, যারা জ্বালানি মজুত করছে। বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির যুগ্ম আহ্বায়ক মিজানুর রহমান রতন বলেন, ‘আমরা সীমিত সরবরাহ পাচ্ছি এবং পাম্পগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।’ তিনি ইনডিপেনডেন্টকে বলেন, ‘পাম্পগুলোতে চরম বিশৃঙ্খলা চলছে। অকটেন বা পেট্রোল না পেয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হওয়া ক্ষুব্ধ গ্রাহকদের হাতে আমাদের কর্মীরা লাঞ্ছিত হচ্ছেন। মানুষের জ্বালানি মজুত বন্ধ করা উচিত। যেহেতু প্রতিটি যানবাহনের জন্য সীমিত পরিমাণ বরাদ্দ করা হয়েছে, চালকরা তাদের বাইকের ট্যাংক খালি করে আবারও লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। আমরা আমাদের পাম্প এবং কর্মীদের সুরক্ষার জন্য সরকারকে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেছি।’
গ্লোবাল থিঙ্ক ট্যাংক ‘ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস’-এর প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, ‘আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতার কারণে এশিয়ায় বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হতে পারে। বাংলাদেশ তার প্রাথমিক জ্বালানির ৬২ শতাংশেরও বেশি আমদানির ওপর নির্ভর করে। তাই কোনো ব্যাঘাত ঘটলে তা শেষ পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে।’
তিনি সতর্ক করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্য সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে কোম্পানিগুলো হয় উচ্চমূল্যে জ্বালানি কিনবে অথবা সরবরাহ কমিয়ে দেবে, যার ফলে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং লোডশেডিং শুরু হবে। তার মতে, সরকারের উচিত করোনা মহামারির সময়ের পরীক্ষিত ব্যবস্থা অনুসরণে জ্বালানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া, যেমন—যেসব প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত আর্থিক লেনদেনের প্রয়োজন নেই তাদের জন্য ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বা বাসা থেকে কাজের নির্দেশ দেওয়া।’
এদিকে, বাংলাদেশি এক কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে দ্য টেলিগ্রাফ বলেছে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ‘কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশ কার্যত অচল হয়ে যেতে পারে।’
তবে বিশ্লেষকদের এমন শঙ্কার বিপরীতে বাংলাদেশ সরকার দাবি করেছে, ‘বাংলাদেশে কোনো জ্বালানি সংকট নেই।’ জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই—এই মুহূর্তে বাংলাদেশে কোনো জ্বালানি সংকট নেই। প্রকৃতপক্ষে আমরা গত বছরের তুলনায় সরবরাহ বাড়িয়েছি।’










































