
রাত তখন প্রায় ১২টা। কুইন্সের উডসাইডে রুজভেল্ট অ্যাভিনিউ আর ৬২ স্ট্রিটের মোড়ে একটি কেক হাতে ক্রসওয়াক দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিলেন ১৯ বছরের নিশাত জান্নাত। কাজ শেষে সবে ট্রেন থেকে নেমেছেন, বাড়ি ফিরছেন — ছোট বোনের জন্য কেক হাতে নিয়ে। ঠিক সেই মুহূর্তে পশ্চিমমুখী রুজভেল্ট অ্যাভিনিউ ধরে আসা রয়্যাল ওয়েস্ট সার্ভিসেসের একটি বিশালাকার গারবেজ ট্রাক ডান দিকে মোড় নিতে গিয়ে ক্রসওয়াকে পা রাখা নিশাতকে সজোরে ধাক্কা দেয়। ঘটনাস্থলেই ইএমএস কর্মীরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার বাড়ি ছিল মাত্র দশ মিনিটের হাঁটাপথ দূরে, ৫৫তম স্ট্রিটে।
সেই রাতে বড় বোন নওশিন জান্নাত (২১) বাড়িতে ছোট বোনের অপেক্ষায় বসে ছিলেন। রাত বাড়তে লাগল, নিশাতের ফোনে কল যাচ্ছে কিন্তু ধরছেন না। বুকের ভেতর অজানা আশঙ্কা ঘনিয়ে আসতে লাগল। রাত প্রায় দুটোয় নওশিন নিশাতের মোবাইলের লোকেশন ট্র্যাক করে ছুটে গেলেন সেই মোড়ে। মা-বাবাসহ দৌড়ে গিয়ে দেখলেন চারদিকে শুধু পুলিশের গাড়ি। নিশাতের নিথর দেহ ঘিরে তখন বিলাপে ভারী হয়ে উঠেছে আশেপাশের এলাকা।
নিশাতের চাচা জামাল আহমেদ শিমু সোমবার সকালে জানিয়েছেন, পরিবারের উডসাইডের বাড়িতে বিলাপ চলছে, নিশাতের বাবা-মা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছেন। “ঘরের ভেতর সবাই কাঁদছেন। কিছুই আর আগের মতো নেই।”
নিশাত জান্নাত ছিলেন জ্যামাইকার পারসন্স বুলেভার্ডে একটি পার্কিং গ্যারেজের পার্ট-টাইম রিসেপশনিস্ট। কালো ইউনিফর্ম পরে প্রতিদিন কাজে যেতেন। রোববার রাত ১১টার দিকে কাজ শেষে ট্রেনে উঠলেন, উডসাইড স্টেশনে নামলেন। বাড়ি ফেরার আগে ভাবলেন, ছোট বোনের জন্য কেক নিয়ে যাই। সেই ভাবনাটুকুই তার শেষ ভাবনা হয়ে গেল।
বোন নওশিন বিলাপ করতে করতে বলছিলেন, “নিশাত ছিল অসম্ভব আশাবাদী একটি মেয়ে। সে সবসময় বলত, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো। সে বলত — আশা রাখো। মৃত্যু যেকোনো সময় আসতে পারে, তাই প্রস্তুত থাকো। বর্তমানেই বাঁচো, এই মুহূর্তের জন্য বাঁচো। অতীত বা ভবিষ্যতে আটকে থেকো না।” থামলেন একটু, তারপর ফুঁপিয়ে উঠলেন, “সে নিজেই জানত না যে তার সময় এত কম।”
নিশাতরা চার বোন ছিলেন। দুটি ছোট—একজনের বয়স ৯, আরেকজনের মাত্র ৪। যে ছোট বোনের জন্য কেক আনতে বেরিয়েছিলেন, সে আজ আর তার দিদিকে ফিরে পাবে না।
নিশাতের বাবা হেলাল আহমদ উডসাইডের বায়তুল জান্নাহ মসজিদের ইমাম। যে মানুষটি প্রতিদিন মুসল্লিদের সান্ত্বনা দেন, আজ তার নিজের বুকের মানিক চলে গেছে। পরিবারটি ২০১৭ সালে অভিবাসী ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন। তাদের দেশের বাড়ি সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঢাকা দক্ষিণের রায়গড় গ্রামে। আমেরিকায় এসে একটু ভালো থাকার স্বপ্ন বুকে বেঁধেছিলেন এই পরিবার। সেই স্বপ্নের সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রদীপটি আজ নিভে গেল একটি রাস্তার মোড়ে।
নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের হাইওয়ে ডিস্ট্রিক্টের কলিশন ইনভেস্টিগেশন স্কোয়াড ঘটনাটি তদন্ত করছে। ট্রাকটির চালক, ৩৮ বছর বয়সী এক নারী, ঘটনার পর ঘটনাস্থলেই ছিলেন এবং সামান্য আঘাতের জন্য চিকিৎসা নেন। এ পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
রয়্যাল ওয়েস্ট সার্ভিসেসের মূল প্রতিষ্ঠান ওয়েস্ট কানেকশনসের এক মুখপাত্র বিবৃতিতে বলেছেন, “কুইন্সে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনায় আমরা গভীরভাবে শোকাহত। নিহতের পরিবার ও সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানাচ্ছি।” তিনি আরও বলেন, চলমান তদন্তে তারা পুলিশকে পূর্ণ সহযোগিতা করছেন।
নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে এই মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই শোকের ঢেউ বইতে শুরু করেছে। উডসাইড ও জ্যাকসন হাইটসের বাংলাদেশি বাসিন্দারা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—প্রাইভেট গারবেজ ট্রাকের চালকদের প্রশিক্ষণ ও নজরদারি নিয়ে। নিউইয়র্কে বছরের পর বছর ধরে গারবেজ ট্রাক দুর্ঘটনায় পথচারীর প্রাণহানি ঘটছে, কিন্তু জবাবদিহিতা কমই হচ্ছে।
নিশাতের জানাজা মঙ্গলবার জোহরের নামাজের পর উডসাইডের বায়তুল জান্নাহ মসজিদে অনুষ্ঠিত হওয়ার পর তাকে নিউজার্সির মুসলিম কবরস্থানে সমাহিত করা হবে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
নিশাত জান্নাত মাত্র ১৯ বছর বয়সে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু তার কথাগুলো রয়ে গেছে — “বর্তমানেই বাঁচো, এই মুহূর্তের জন্য বাঁচো।” সেই মুহূর্তে তিনি বেঁচে ছিলেন। ছোট বোনের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছিলেন। এর চেয়ে সুন্দর মুহূর্ত আর কী হতে পারে।











































