
সব কিছুর হিসাব সব সময় মিলে না। আবার সময়ও থেমে থাকে না। দেখতে দেখতে মাস চলে গেল। একটি সরকারের জন্য এক মাস তেমন কোনো দীর্ঘ সময় নয়। তারপরও দেশ-বিদেশের সাধারণ মানুষ ও কূটনৈতিক অঙ্গনের নজর ছিল শুরুটা কেমন হয়, তা দেখার দিকে। কেমন গেল বাংলাদেশের বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের প্রথম মাস? ঘরে বাইরে চ্যালেঞ্জ নিয়েই পথচলা শুরু করতে হয়েছে।
প্রথমেই ছিল সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার চ্যালেঞ্জ। এমপি, মন্ত্রীদের শপথ, রাষ্ট্রপতির স্বাভাবিক অংশগ্রহণ, উচ্চকক্ষ-নিম্নকক্ষ, জুলাই সনদ বিতর্ক, কাঠামোগত পরিবর্তন না করে মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত ধারা বজায় রাখা। সব কিছু মোকাবিলা করতে হয়েছে।
সমস্যার অনেকটাই কেটেছে এখন। নিজেদের মতো পথ খুঁজে নিয়েছে বিএনপি সরকার। রাজনৈতিক দলীয় সরকার যেমন হওয়ার তেমনই হয়েছে। বিরোধীদের আপত্তি উপেক্ষা করে চাণক্য নীতি প্রয়োগের মাধ্যমে মন্ত্রিসভা গঠন ও সংসদ কার্যক্রম শুরু করেছে । বড় ধরনের কোনো সংকট ছাড়াই নিজেদের ভেতরে একটি স্বস্তি এনেছে। স্বাভাবিক গতিতে শুরু করেছে দেশ পরিচালনা।
১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেয়। ভূমিধস বিজয় অনেক সময়ই একটি দলের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়, ইতিহাস তাই বলে। কারণ মানুষের প্রত্যাশাও থাকে অনেক বেশি। শুরুতে শঙ্কা ছিল, দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ভিন্ন। প্রতিটি খাতে চ্যালেঞ্জ ছিল তীব্র। প্রশ্ন ছিল সরকার তা সামাল দিতে পারবে তো?
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা। চারদিকে ‘মব ভায়োলেন্স’, নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার প্রবণতা, হানাহানি ছিল সাধারণ চিত্র। চাঁদাবাজির অভিযোগও ছিল, এমনকি দলের কিছু নেতা কর্মীর বিরুদ্ধেও। আইনের শাসন অনেকটাই ভেঙে পড়েছিল। গণপিটুনি বা মব ভায়োলেন্স বন্ধ করে আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পুলিশ বাহিনীকে সক্রিয় করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
১৮ মাসে অনেক মানুষের মানসিকতায় পরিবর্তন এসেছিল। অনেকে ভেবেছিলেন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে দীর্ঘ সময় লাগবে। কিন্তু নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আশার আলো তৈরি হয়েছে। মব ভায়োলেন্স রোধে কঠোর পদক্ষেপ প্রচণ্ড গরমে এক পশলা বৃষ্টির মতো স্বস্তি। এখন আইনের শাসন ধীরে ধীরে ফিরছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী প্রশংসা পাচ্ছেন। মব ভায়োলেন্স প্রায় ৯০ শতাংশ কমেছে। কোনো মিডিয়া হাউজ এখন হামলার ভয় করছে না।
নিরীহ, অপরাধে জড়িত নন, এমন আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মীও ঘরে ফিরতে শুরু করেছেন। কারাগার থেকে বিনা বিচারে আটক অনেক মানুষ মুক্তি পেয়েছেন। যদিও কিছু ক্ষেত্রে কারাগারের গেটে পুনরায় আটক হওয়ার ঘটনাও আছে, তবুও প্রথম মাসে আইন-শৃঙ্খলার পরিস্থিতির উন্নতি দৃশ্যমান।
সরকারের সামনে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। রমজান মাস মোটামুটি ভালোভাবেই সামাল দিয়েছে। সিন্ডিকেট ভেঙে মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। বিচ্ছিন্ন অভিযোগ থাকলেও ঈদ মোটের ওপর ভালোভাবেই কেটেছে।
যুদ্ধ-পরিস্থিতির অর্থনীতি সামলেও সরকার এগোচ্ছে। তেলের সংকট থাকলেও দাম বাড়েনি; নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে। জ্বালানির দামের ওপর অন্যান্য পণ্যের মূল্য নির্ভরশীল, তাই এটি গুরুত্বপূর্ণ। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখা এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ভাঙা ছিল জরুরি। সরকার এ বিষয়ে সতর্ক ছিল।
নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে বিএনপি সরকারও কাজ শুরু করেছে। চালু করেছে ফ্যামিলি কার্ড, ধর্মীয় নেতাদের সম্মানী ভাতা। প্রতিটি মন্ত্রণালয় ১৮০ দিনের মধ্যে অ্যাকশন প্ল্যান নিয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সবচেয়ে বেশি কঠিন।
বৈদেশিক সম্পর্ক তলানিতে নেমে গিয়েছিল। প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক ছিল না। গত ১৮ মাসে ভারতবিরোধী প্রচারণা বেড়েছিল। বিদেশে শ্রমশক্তি রপ্তানিও ব্যাহত হয়েছিল। এখন ধীরে ধীরে সেই জটিলতা কাটতে শুরু করেছে। তবে এক মাসে সবকিছু বোঝা বা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, সময় লাগবে ক্ষত কাটতে।
প্রশাসন ও মাঠপর্যায়ে কিছু দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার চেষ্টা চলছে। অভিজ্ঞ সাবেক কর্মকর্তাদের সচিব পদে আনা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে ভালো কাজের প্রত্যাশা রয়েছে। তবে প্রশাসনে এনিয়ে ভারসাম্যহীনতা তৈরির শংকা আছে।
শিক্ষাঙ্গনের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরানোও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। শিক্ষামন্ত্রী অভিজ্ঞ, এই চ্যালেঞ্জ তিনি কতটা সামাল দিতে পারেন, সেটি দেখার বিষয়। কারণ শিক্ষাঙ্গনে এখনও সংকটের শেষ নেই।
কাজ করতে গেলে ভুল হবেই। তবুও মন্ত্রীদের আরও সতর্ক হতে হবে। অপ্রয়োজনীয় বক্তব্য এড়িয়ে চলা জরুরি। কাজী জাফরুল্লাহকে স্বাধীনতা পদক দেওয়ার বিষয় বা বাংলা একাডেমি পুরস্কার নিয়ে অহেতুক বিতর্ক তৈরি না করাই ভালো ছিল। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এগোলে ভবিষ্যৎ ইতিবাচক হয়। কেউ অবশ্য ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না।
লেখক: সাবেক সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন












































