
মাথার ওপর গণহত্যার মামলার বিচারের খড়্গ নিয়ে কারাগারে আরেকটি ঈদ পার করতে চলেছেন আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ (এমপি) বহু নেতাকর্মী। ঈদুল ফিতরের দিন এসব বন্দির জন্য পায়েস, পোলাও, মুরগির রোস্ট, রুই মাছ, গরুর মাংসসহ নানা পদের বিশেষ খাবারের আয়োজন করছে কারা কর্তৃপক্ষ। তবে এতসব সুস্বাদু খাবারের আয়োজন স্বস্তি আনতে পারছে না সাবেক মন্ত্রী আনিসুল হক, আমির হোসেন আমু, হাসানুল হক ইনু, রাশেদ খান মেনন, জুনাইদ আহমেদ পলক ও মেয়র আতিকুল ইসলামদের। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ঈদ এলে নেতাকর্মীদের বহর নিয়ে ঈদগাহে নামাজ আদায়, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎসহ গণভবনে থাকত মন্ত্রী-এমপিদের রাজসিক এক মিলনমেলা। তবে মাথার ওপর গণহত্যার বিচারের খড়্গ ও কীভাবে কারামুক্ত হবেন—এসব ভাবতে ভাবতেই দিন পার হচ্ছে তাদের। এবারের ঈদেও স্ত্রীর সঙ্গে পলকের, মেয়ের সঙ্গে আতিকের, ছেলেসহ পরিবারের অনেকের সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের দেখা না হওয়ার দুঃখ সইতে হবে।
কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দুইশর বেশি ‘ভিআইপি’ আসামি দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি রয়েছেন। তাদের মধ্যে সাবেক মন্ত্রী, এমপি, আমলা, হেভিওয়েট হিসেবে পরিচিত নেতাকর্মীসহ ১৬১ জন কারাগারে ডিভিশন (প্রথম শ্রেণির বন্দি হিসেবে উন্নত সুযোগ-সুবিধা) পেয়েছেন। তবে এসব আসামির মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে—এমন ৬০ জনের মতো আসামিকে ঢাকার কেরানীগঞ্জে বিশেষ কারাগারে রাখা হয়েছে। তারা সবাই ঈদের দিন একসঙ্গে নামাজ আদায়ের সুযোগ পাবেন। এ সময় নিজেদের মধ্যে কুশল বিনিময় করারও সুযোগ পাবেন। ঈদের দিন ও পরের দুদিন আসামিরা পরিবারের সদস্য ও স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও মোবাইল ফোনে কথা বলারও সুযোগ পাবেন। তবে ফোনে কথা বলার ক্ষেত্রে নিরাপত্তার স্বার্থে ‘ভিআইপি’ বন্দিদের আগেই নম্বর জমা দিতে হবে। ঈদের দিন সব বন্দির জন্য বিশেষ খাবারেরও আয়োজন করা হয়েছে।
কারা অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি উন্নয়ন ও গণমাধ্যম) জান্নাত-উল ফরহাদ জানিয়েছেন, ঈদের দিন সকালের নাশতায় আসামিদের জন্য থাকবে পায়েস বা সেমাইয়ের সঙ্গে মুড়ি। দুপুরের খাবারের তালিকায় রাখা হয়েছে পোলাও, গরুর মাংস, একটি মুরগির রোস্ট, সালাদ, মিস্টি, পান এবং সুপারি। অন্য ধর্মাবলম্বী বন্দিদের জন্য গরুর মাংসের পরিবর্তে খাসির মাংস পরিবেশনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এ ছাড়া রাতের খাবারে বন্দিদের জন্য সাদা ভাত, আলুর দম এবং রুই মাছ ভাজা থাকবে বলে জানানো হয়েছে। ঈদের দিন ও পরের দুদিন বাইরে থেকে স্বজনদের আনা খাবারও কারাগারে বসে খেতে পারবেন আসামিরা।
বিশেষ কারাগারে ভিআইপি বন্দিদের ঈদের নামাজ: ঢাকার কেরানীগঞ্জে বিশেষ কারাগারে থাকা অন্তত ৬০ জনের মতো ‘ভিআইপি’ আসামি ঈদের দিন একসঙ্গে নামাজ আদায় করবেন। বিশেষ কারাগারে রয়েছেন—আওয়ামী লীগ সরকারের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সাবেক বাণিজ্যবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক মন্ত্রী আনিসুল হক, হাসানুল হক ইনু, রাশেদ খান মেনন, জুনাইদ আহমেদ পলক, আমির হোসেন আমু, আব্দুস শহীদ, নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন, কামরুল ইসলাম, টিপু মুনশি, সাধন চন্দ্র মজুমদার, সাবেক নৌমন্ত্রী শাহজাহান খান, নুরুজ্জামান আহমেদ, আব্দুর রাজ্জাক, গোলাম দস্তগীর গাজী, উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী, নূরুল ইসলাম সুজন, ফরহাদ হোসেন, জাকির হোসেন, সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলাম, সাবেক ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু, সাবেক উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়, সাবেক প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব.) এ বি তাজুল ইসলাম, দীপংকর তালুকদার, মাহবুব আলী, শহীদুজ্জামান সরকার, ডা. এনামুর রহমান, জাহিদ ফারুক শামীম, সাবেক হুইপ আ স ম ফিরোজ, সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক এবং আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ। এ ছাড়া সাবেক এমপিদের মধ্যে বিশেষ কারাগারে রয়েছেন—সাদেক খান, ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন, হাজী সেলিম, মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ, আলী আজম মুকুল, কাজী জাফর উল্যাহ, শাহজাহান ওমর, আব্দুস সালাম মুর্শেদী, শাহে আলম তালুকদার।, নাসিমুল আলম, শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, কামরুল আশরাফ খান পোটন, গোলাম কিবরিয়া টিপু, আব্দুল্লাহ আল জ্যাকব, ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু, মোরশেদ আলম, সিরাজুল ইসলাম মোল্লা, সোলাইমান সেলিম, আব্দুর রহমান বদি ও ইকরামুল করিম চৌধুরী। অন্যদিকে গ্রেপ্তার পুলিশ কর্মকর্তা ও আমলাদের ভেতরে রয়েছেন সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, অব্যাহতিপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান, সাবেক ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া, সাবেক এএসপি জাবেদ ইকবাল, শেখ হাসিনার সাবেক মুখ্য সচিব ও উপদেষ্টা কামাল আব্দুল নাসের চৌধুরী ও সাবেক মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ।
এই ঈদেও স্ত্রীর সঙ্গে দেখা হচ্ছে না পলকের: সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখী কালবেলাকে জানিয়েছেন, ঈদে কেরানীগঞ্জের বিশেষ কারাগারে পলকের সঙ্গে দেখা করতে যাবেন তার মা, ভাই ও তিন বোন। ঈদের দিন কারাগারে ভালো খাবার রান্না হওয়ায় দ্বিতীয় দিনে পলকের পছন্দের খাবার রান্না করে নিয়ে যাবেন স্বজনরা। আইনজীবী রাখী বলেন, ‘কারাগারে ভালো খাবারের কথা বলা হলেও স্বাদ বাইরের খাবারের মতো হয় না। অনেকদিন ধরে তারা কারাগারে আটক আছেন। সবাই জামিন পেয়ে দ্রুত মুক্তির অপেক্ষায় আছেন।’
জানা গেছে, এই ঈদেও স্ত্রী আরিফা জেসমিন কনিকার সঙ্গে দেখা হবে না পলকের। দুদকের মামলা থাকায় আগেই বিদেশে পলাতক রয়েছেন জেসমিন। স্ত্রীর সঙ্গে দেখা না হওয়ায় পলকের আফসোসটাই বেশি।
দীপু মনির সাক্ষাতের অপেক্ষায় স্বামীসহ মেয়ে: এই ঈদেও কাশিমপুর মহিলা কারাগারে সাবেক শিক্ষা ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. দীপু মনির সঙ্গে দেখা করবেন তার একমাত্র মেয়ে তানি দীপাভলী নাওয়াজ ও হুইলচেয়ারে চলাচল করা স্বামী তৌফিক নাওয়াজ। দীপু মনির আইনজীবী গাজী ফয়সাল ইসলাম বলেন, ‘অনেকদিন হলো মা মেয়েকে জড়িয়ে ধরতে পারেন না। ভালো খাবার দিলেও পাখি যেমন খাঁচায় থাকতে চায় না। তেমনই বিচারের জন্য কারাগারে আটকে রেখে ভালো খাবার দিলেও এসব বন্দির জন্য তা আনন্দের নয়। সবাই মুক্তির অপেক্ষায় আছেন।’
সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার ঈদেও সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলাম তার মেয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সাবেক চিফ হিট অফিসার বুশরা আফরিনের সঙ্গে দেখা করতে চান। কিন্তু দুর্নীতির বিভিন্ন অভিযোগ থাকায় দেখা করবেন না বুশরা। একসময় টাকার তোষকে ঘুমানো আর ঈদে নতুন টাকার বান্ডিল ছাড়া উপহার না নেওয়া আমির হোসেন আমু কারাগারের কাঠের চৌকিতে থেকে ঈদের দিনে স্বজনদের দেখা পাওয়ার প্রতীক্ষা করছেন। কারাগারে রোগ ও অসুস্থতা জেঁকে বসেছে সাবেক খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদারসহ অনেকেরই। কারাগারে সবসময় চুপচাপ থাকেন প্রায় শতাধিক মামলার আসামি সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। সবসময় মুক্তির অপেক্ষায় থাকেন বলে তার আইনজীবীরা জানিয়েছেন। দুদকের অভিযোগ থাকায় চাইলেও বিদেশে থাকা ছেলে শায়ান ফজলুর রহমানসহ পরিবারের অনেকের সঙ্গে দেখা হচ্ছে না সালমান এফ রহমানের। ভিন্ন কারাগার হওয়ায় ঈদের দিনে দেখা হওয়ার সুযোগ হচ্ছে না পিতা হাজী সেলিম ও পুত্র সোলাইমান সেলিমের। এ ছাড়া কাশিমপুরে একই কারাগারে থাকলেও নারী ও পুরুষের ভবন আলাদা হওয়ায় ঈদে দেখা হওয়ার সুযোগ নেই সাংবাদিক দম্পতি ফারজানা রুপা ও শাকিল আহমেদের। তাদের সন্তান ও পরিবারের সদস্যরা পৃথকভাবে দেখা করবেন।









































