প্রচ্ছদ জাতীয় কাউন্সিলে ছাত্রদলের কমিটি গঠন করতে চায় বিএনপি

কাউন্সিলে ছাত্রদলের কমিটি গঠন করতে চায় বিএনপি

সিলেকশনের পরিবর্তে সরাসরি কাউন্সিলের মাধ্যমে ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সংগঠনকে গতিশীল করতে কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠনের তোড়জোড় চলছে।

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ছাত্রদলের শীর্ষনেতারা। এ সময় দলীয় প্রধান কাউন্সিলের মাধ্যমে ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের তাগিদ দেন। একই সঙ্গে দেশের সব মহানগর-জেলাসহ ইউনিট কমিটিগুলো সাজানোর কথা বলেন। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী জুন-জুলাইয়ে ছাত্রদলের কাউন্সিল হতে পারে।

জানা গেছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় নতুন নেতৃত্ব গঠনের বিষয়ে বিএনপির ভেতরে তৎপরতা শুরু হয়েছে। নতুন নেতৃত্বে আসতে ছাত্রদলের সম্ভাব্য নেতারা এখন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও লবিং-তদবিরে ব্যস্ত সময় পার করছেন। একই সঙ্গে কাউন্সিলে নেতা নির্বাচন করার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশীরা সারা দেশের বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন। ইতোমধ্যে সংগঠনের শীর্ষ দুই পদে ডজনখানেক নেতার নাম আলোচনায় এসেছে।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানান, ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠনের ব্যাপারে এখনো কোনো আলাপ-আলোচনা হয়নি। এ ব্যাপারে আমি কিছু জানি না। কমিটির বিষয়টি সম্পূর্ণ হাইকমান্ডের এখতিয়ার।

ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির বলেন, সংগঠনের নতুন কমিটি হতে সময় লাগবে। তেমন তৎপরতাও দেখছি না। ভবিষ্যতে সংগঠনের অভিভাবক বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে দায়িত্ব দেবেন, তা পালন করব ইনশাল্লাহ।

২০২৪ সালের মার্চে রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে সভাপতি এবং নাছির উদ্দিন নাছিরকে সাধারণ সম্পাদক করে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। এ কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সংগঠনটির ভরাডুবির পর তৃণমূলের নেতাকর্মীরা ছাত্রদলের কমিটি পুনর্গঠনের দাবি তুলেছেন। নেতৃত্বের দৌড়ে থাকা পদপ্রত্যাশীরা বিভিন্ন ক্যাম্পাসে শোডাউন, শিক্ষার্থীদের নিয়ে ইফতার মাহফিল আয়োজন এবং দলীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন।

এদিকে ছাত্রদল নেতাদের দাবি, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী আমলে ছাত্রদলের পরীক্ষিত, যোগ্য ও নির্যাতিত এবং যাদের সাংগঠনিক দক্ষতা রয়েছে, তাদের মাধ্যমেই নতুন কমিটি গঠন করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী শিক্ষার্থীদের নতুন ধারার রাজনীতির সঙ্গে মানানসই ও বিচক্ষণ নেতৃত্ব নির্বাচন করা জরুরি। কমিটি গঠনে যেন কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব না থাকে। যারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কাজ করবেন এবং কোনো ধরনের ‘কোরামবাজি’ না করে সংগঠনকে শক্তিশালী করবেন, তাদের নিয়েই নতুন কমিটি গঠন করলে সংগঠন ভালো করবে।

নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় ফিরবে কি নেতৃত্ব?

২০১৯ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ছাত্রদলের ইতিহাসে প্রথমবার সরাসরি ভোটের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কাউন্সিলে ডেলিগেটদের সরাসরি ভোটে ফজলুর রহমান খোকন সভাপতি এবং ইকবাল হোসেন শ্যামল সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ছাত্রদলের পুরোনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সাড়ে ছয় বছর পর আবার কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করতে চাইছে বিএনপির হাইকমান্ড। সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নয়, ভোটের মাধ্যমে কমিটি গঠনের বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

অনেকের মতে, ছাত্রদলের নিয়মিত কাউন্সিল হলে সংগঠনের কার্যক্রম আরো গতিশীল হবে এবং নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত হবেন। এতে রাজপথে পরীক্ষিত নেতাদের মূল্যায়ন সম্ভব হবে এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক পক্ষপাতিত্বের সুযোগ কমে যাবে।

গত বছরের ডিসেম্বরে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে কাউন্সিলের মাধ্যমে শাখা ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়। এরও আগে কাউন্সিলের মাধ্যমে উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়, শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এবং সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটি- চারটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি গঠন করা হয়।

শীর্ষ নেতৃত্বের আলোচনায় যারা

সংগঠন সূত্রমতে, নতুন কমিটিতে ২০০৮-০৯ থেকে ২০১১-১২ সেশনের নেতাদের মধ্য থেকে নেতৃত্ব আসার সম্ভাবনা বেশি। ছাত্রদলের শীর্ষপদে আলোচনায় আছেন- ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার দুবারের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবিএম ইজাজুল কবির রুয়েল, সহসভাপতি মনজুরুল আলম রিয়াদ, সহসভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি খোরসেদ আলম সোহেল, কাজী জিয়াউদ্দিন বাসেত, ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহীম খলিল, মোমিনুল ইসলাম জিসান, রাজু আহমেদ, গাজী মো. সাদ্দাম হোসেন, সালেহ মো. আদনান, সাহিত্য ও প্রকাশনাবিষয়ক সম্পাদক মিনহাজ আহমেদ প্রিন্স, সাংগঠনিক সম্পাদক আমান উল্লাহ আমান।

এদের মধ্যে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে আটটি মামলার আসামি এবং তিনবার গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণ করেন ইজাজুল কবির রুয়েল। তিনি রাজপথের সক্রিয়, ত্যাগী এবং নির্যাতিত ছাত্রনেতা হিসেবে বিভিন্ন মহলে পরিচিত। ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবরের পর তার নেতৃত্বে রাজধানীতে ৪০টির বেশি মিছিল হয় বলে জানান রুয়েল। একাধিক মামলার আসামি হয়ে শেখ হাসিনার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তিনি।

সহসভাপতি মনজুরুল আলম রিয়াদ আগে কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং অমর একুশে হলের সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দুই মামলায় ছয় মাসের বেশি কারাভোগ করেছেন।

আলোচনায় আছেন খোরসেদ আলম সোহেল। তিনি সাতটি মামলায় দীর্ঘদিন কারাভোগ করেছেন এবং একাধিকবার রিমান্ডে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সময় পল্টন থানার একটি মামলার আসামি সালেহ আদনান। তিনিও রাজপথের সক্রিয় নেতা।

এছাড়া আলোচনায় ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে তিনটি মামলায় চারবার হামলার শিকার হন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম খলিল। তিনি তৃণমূল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল কমিটি ও বিশ্ববিদ্যালয় কমিটিতে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে ঢাবিতে এমফিলে অধ্যয়নরত। ভোটাধিকার আন্দোলনেও তার সক্রিয় ভূমিকায় একাধিকবার ছাত্রলীগের রোষানলে পড়েন।

ঢাবির বাইরে আলোচনায় যারা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে কয়েকজন সম্ভাব্য প্রার্থী আলোচনায় আছেন। তারা হলেন- ছাত্রদলের বর্তমান কমিটির সহসভাপতি ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল, কাজী জিয়াউদ্দিন বাসেত, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহরিয়ার হক মজুমদার শিমুল এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক এম রাজীবুল ইসলাম তালুকদার বিন্দু।

এদের মধ্যে ডা. আউয়াল আন্দোলন-সংগ্রামে আহতদের চিকিৎসাসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি রাজপথের কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলেন। এছাড়া কাজী জিয়াউদ্দিন বাসেত ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় থাকার কারণে তার বিরুদ্ধে ৯টি মামলা রয়েছে এবং রিমান্ডে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে দুটি মামলায় সাজাভোগ করেছেন এবং কয়েকটি মামলা বিচারাধীন। ২০১৫ সালে অবরোধের সময় পুলিশের গুলিবিদ্ধ হয়ে একটি চারতলা বাসায় আশ্রয় নেন। এখানে পুলিশ গিয়ে মৃত ভেবে চারতলা থেকে তাকে নিচে ফেলে দেয়। এসময় তিনি গুরুতর আহত। এ ঘটনায় তিনি ১০ মাস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এছাড়াও ২০২৩ সালে দুইদিন পুলিশ গুম রেখে অস্ত্র মামলায় কোর্টে চালান দেয়।

ঢাবিকেন্দ্রিক নেতৃত্বের অবসান চান অনেকে

ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে দীর্ঘদিন ধরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক নেতৃত্বের প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে। বিগত চার থেকে পাঁচটি কমিটিতে সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদ-বিশেষ করে সভাপতি, সিনিয়র সহসভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক ঢাবি শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকেই বেছে নেওয়া হয়েছে। এতে সংগঠনের ভেতরে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্যাম্পাস থেকে উঠে নতুন নেতৃত্ব তৈরির স্বাভাবিক ধারায়ও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে।

ছাত্রদলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা বলছেন, কার্যত সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রধান উৎস হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেই ধরা হয়। ফলে দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতাকর্মীরা আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকলেও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নির্ধারণের সময় তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয় না।

ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহরিয়ার হক মজুমদার শিমুল বলেন, ঢাবিকে বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে অন্যদের উপেক্ষা করা হলে বিষয়টি আর ন্যায়সংগত থাকে না। ছাত্রদলের ১১৮টি ইউনিট রয়েছে। নেতৃত্বের সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরির জন্য শীর্ষ পাঁচ পদের মধ্যে অন্তত দুই থেকে তিনটি পদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থেকে দেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।