প্রচ্ছদ জাতীয় ‘সময় শেষ’, সংবিধান সংস্কার পরিষদের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন

‘সময় শেষ’, সংবিধান সংস্কার পরিষদের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুসারে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকার শেষ দিন ছিল গতকাল রোববার। অধিবেশনে সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পাল্টাপাল্টি যুক্তি দিয়েছেন। জামায়াত আমির জানান, নির্বাচনের ফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের কথা রয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে এ অধিবেশন ডাকা হয়নি। এরপর বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অস্তিত্ব না থাকায় প্রধানমন্ত্রীও সেটা রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দিতে পারেন না। রাষ্ট্রপতিও সেই অধিবেশন আহ্বান করতে পারেন না বিধায় তা করেননি। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে সংবিধান সংস্কার পরিষদের ভবিষ্যৎ কী?

এ বিষয়ে কথা হয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের সঙ্গে। তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের ভবিষ্যৎ তো খুব একটা আশাবাদী মনে হয় না। আদেশ অনুযায়ী তো প্রত্যেকেই (সংসদ সদস্য) দুটো শপথ নেওয়ার কথা এবং ৩০ দিনের মধ্যে এ সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা ডাকার কথা। এটাতো ডাকা হয়নি এবং ডাকা হবে বলে আমার মনে হয় না। আজকে (গতকাল) তো দিন শেষ। এখন এটা জটিলতা সৃষ্টি হলো।’

তিনি বলেন, ‘এখন এর পরিণতি কী হবে আমরা জানি না। সবকিছু সম্মিলিতভাবে করা উচিত ছিল। তার পরিবর্তে এখনই যে আমাদের মধ্যে একটা বিভক্তি হলো। এটা কারও জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না। আমি আশা করি, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো এ ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা করে একটা সমাধানে পৌঁছাবে।’

এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘এই যে ৩০ দিনের কথা আপনারা বলছেন, এ কথা তো কোথাও নেই। ৩০ দিনের মধ্যে করতে হবে, এটা না করলে শেষ হয়ে যাবে, এ জিনিসটাই তো আইনে এক্সিস্ট করে না। কী কী জিনিস বাস্তবায়ন করবে, এ ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্য পোষণ করেছে। ঐকমত্য পোষণ করা আর সেটির লিগাল ভ্যালিডিটি হওয়া তো ভিন্ন জিনিস।’

তিনি বলেন, ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিষয়টি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এর মাধ্যমে নিয়ে আসা হয়েছে। এ ধারণাটার তো আসলে সাংবিধানিক কোনো ভিত্তি নেই। কারণ, সংবিধান সংস্কার পরিষদ বিষয়টি সংবিধানে নেই। সংবিধান যদি সংস্কার করতে হয়, এর একটা মেকানিজম আছে। সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ বলে দিচ্ছে যে, কীভাবে সংবিধান সংস্কার করা যাবে। অথবা কীভাবে সংবিধানে অ্যামেন্ডমেন্ট (সংশোধনী) নিয়ে আসা যাবে। এখন সংবিধান যদি সংস্কার করতে চান, সেটা জুলাই সনদের ভিত্তিতে হোক বা অন্য আরও অধিকতর সংশোধনীতে হোক; সেটা সবসময় করতে পারেন টু-থার্ড মেজরিটিতে।’

একই ধরনের কথা বলেন নির্বাচন কমিশনের সাবেক যুগ্ম সচিব (আইন) ড. মো. শাহজাহান। তিনি বলেন, ‘এ আদেশ সংবিধানের সঙ্গে যায় না। রাষ্ট্রপতি অধিবেশন যে আহ্বান করবেন, এ বিষয়টা তো সংবিধানে নেই। এ অধিবেশন আহ্বান করতে হলে আগে সংবিধান সংস্কার করে ওখানে বিষয়টি যুক্ত করতে হবে। তারপর অধিবেশন আহ্বানের বিষয়টি আসবে।’

তাহলে এর ভবিষ্যৎ কী—জানতে চাইলে ড. শাহজাহান বলেন, ‘ভবিষ্যৎ হচ্ছে শূন্য। সংস্কারের ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে ঠিক আছে। কিন্তু সরকার সব সংস্কার মানতে বাধ্য নয়। কারণ তারা নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। তো নোট অব ডিসেন্ট চাপিয়ে দেবেন কেন?’

তিনি আরও বলেন, ‘গণভোটের বিষয়টিও সংবিধানে নেই। আগে গণভোটের বিষয়টাও সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তারপর সংবিধান সংস্কার পরিষদ। সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিষয়টি সংবিধানেই নেই। সেটার জন্য রাষ্ট্রপতি কেন আলাদা অধিবেশন ডাকবে? রাষ্ট্রপতিকে সংসদ অধিবেশনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকার ক্ষমতা দেওয়া নেই। আর আদেশের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করা যায়? এটা তো সুপ্রিম ল অব ল্যান্ড। সুপ্রিম হচ্ছে কনস্টিটিউশন। ছেলেকে দিয়ে বাপের নাম পাল্টায় ফেলা যায় না।’