প্রচ্ছদ জাতীয় সব শেষ হয়ে গেল, আমি এখন কার মুখ চেয়ে বাঁচব?

সব শেষ হয়ে গেল, আমি এখন কার মুখ চেয়ে বাঁচব?

একটি আনন্দঘন বিয়ের উৎসব যে এভাবে লাশের মিছিলে পরিণত হবে, তা কল্পনাও করতে পারেননি আশরাফুল আলম জনি। যে বাড়িতে নতুন বউ বরণ করে নেওয়ার উৎসব হওয়ার কথা ছিল, সেই বাড়িতেই এখন ৯টি লাশের সারি।

শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে যখন একের পর এক স্বজনের জানাজা হচ্ছিল, তখন জনির বিলাপ উপস্থিত শতশত মানুষের চোখে জল এনে দিয়েছে।

পরিবারের ৯ সদস্যকে চিরতরে হারিয়ে বাকরুদ্ধ জনি বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। চেতনা ফিরলেই গুমরে কেঁদে উঠে বলছিলেন, “আমার তো সব শেষ হয়ে গেছে। এক নিমেষেই স্ত্রী, তিন সন্তান, ভাই আর বোনদের হারালাম। আমি এখন কার মুখ চেয়ে বাঁচব?”

জনির জীবন থেকে এক নিমিষেই মুছে গেছে সব আনন্দ। দুর্ঘটনায় তিনি হারিয়েছেন প্রিয়তমা স্ত্রী ফারহানা সিদ্দিকা পুতুলকে। হারিয়েছেন কলিজার টুকরো তিন সন্তান— আলিফ, আরফা ও ইরামকে। এমনকি যে ছোট ভাইয়ের বিয়ের আনন্দ নিয়ে ফিরছিলেন, সেই বর সাব্বিরও এখন কবরে। বোন ঐশী আর ভাগনে ফাহিমকেও কেড়ে নিয়েছে এই ঘাতক মহাসড়ক।

মোংলা পৌরসভার শেলাবুনিয়া গ্রামে জনির বাড়িতে এখন স্বজনদের ভিড়, কিন্তু সেখানে কোনো কথা নেই। জনির আহাজারি আর কান্নায় পুরো এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। পাড়া-প্রতিবেশীরা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন।

স্থানীয়রা বলছেন, এমন মর্মান্তিক দৃশ্য তারা আগে কখনও দেখেননি। একই পরিবারের ৯ জন সদস্যের এক সঙ্গে চলে যাওয়া কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না কেউ।

বিয়ের পর নতুন ভাই-বউকে নিয়ে সুন্দর আগামীর পরিকল্পনা ছিল জনির পরিবারের। কিন্তু খুলনা-মোংলা মহাসড়কের রামপাল উপজেলার বেলাই ব্রিজ এলাকা সেই সব স্বপ্নকে রক্তে রঞ্জিত করে দিয়েছে। ৯টি কবরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জনি এখন এক জীবন্ত লাশ। তার এই আর্তনাদ যেন আজ পুরো মোংলাবাসীর হৃদয়ে হাহাকার হয়ে বাজছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আলী আজম জানান, খুলনা-মোংলা মহাসড়কটি অত্যন্ত ব্যস্ত হলেও এটি এখনো চার লেনে উন্নীত করা হয়নি। ফলে সরু রাস্তায় প্রায়ই এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। এলাকাবাসী দ্রুত সড়কটি প্রশস্ত করা এবং এই দুর্ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন জানিয়েছেন, নিহতদের পরিবারকে জেলা প্রশাসনের ত্রাণ তহবিল, জেলা পরিষদ এবং সড়ক পরিবহন আইনের আওতায় আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে। ইতোমধ্যে নিহত মাইক্রোবাস চালকের পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার খুলনার কয়রা থেকে বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে বরযাত্রীবাহী মাইক্রোবাসটি মোংলায় ফিরছিল। পথে রামপাল উপজেলার বেলাই ব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে একটি স্টাফ বাসের সঙ্গে সেটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়, যা এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির জন্ম দেয়।

সূত্র : কালবেলা