প্রচ্ছদ জাতীয় অদক্ষ হাতে সংসদের সাউন্ড মাইকে ফুটে উঠল লজ্জা

অদক্ষ হাতে সংসদের সাউন্ড মাইকে ফুটে উঠল লজ্জা

ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে বৃহস্পতিবার প্রথমবার বক্তব্য দিতে গিয়ে মাইক বিভ্রাটের মুখে পড়েন নবনির্বাচিত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। একপর্যায়ে হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করে অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করেন তিনি। নতুন সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশন চলাকালে ব্যবহৃত এমন বিভ্রাটের কারণে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে গণপূর্ত অধিদপ্তর। এ নিয়ে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা ক্ষোভ প্রকাশ করে সংসদে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়াও জানান।

সংসদের অধিবেশনের মাইক বিভ্রাটের কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, এ ধরনের কাজে অভিজ্ঞতা না থাকা ঠিকাদারের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত সংসদ ভবনের সংস্কার কাজ করার কারণে এমন পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। সূত্র বলছে, সংসদ ভবনে হেডফোন ও গুজনেক মাইক্রোফোনের কাজ করেছে আমানত এন্টারপ্রাইজ, যাদের আগে সংসদে কাজের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। দীর্ঘদিন ধরে সংসদে কাজ করা কোম্পানিকে বাদ দিয়ে এই আমানত এন্টারপ্রাইজকে কাজ দেওয়া হয়।

গত ৫ আগস্ট ২০২৪-এ সংঘটিত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় জাতীয় সংসদ ভবনের প্ল্যানারি হলের উল্লিখিত সাউন্ড সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সিস্টেমটি ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে চালু করা হয়েছিল এবং মাত্র দুই বছর ছয় মাস ব্যবহার করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি ‘শিওর’-এর তৈরি করা এই সিস্টেমের স্বাভাবিক কার্যকাল ধরা হয় ১০ বছর।

আগের দফায় কাজটি করেছিল কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেড। ক্ষতিগ্রস্ত সাউন্ড সিস্টেম মেরামতের জন্য ৫ আগস্টের পর কোম্পানিটির পক্ষ থেকে বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী এনে সিস্টেম পর্যবেক্ষণ করানো হয়। পরে এ কোম্পানিকে বাদ দিয়ে আমানত এন্টারপ্রাইজকে দেওয়া হয় কাজ। অভিযোগ উঠেছে, কমিশন নিয়ে অনভিজ্ঞ কোম্পানি আমানত এন্টারপ্রাইজকে কাজ দেওয়া হয়। আর কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেডকে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ দেন নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন।

কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী (সিইও) প্রকৌশলী জাহিদুর রহমান জোয়ারদার বলেন, আমি বিদেশ থেকে একজন অভিজ্ঞ পর্যবেক্ষক দিয়ে পর্যবেক্ষণ করিয়ে প্রতিবেদন পেশ করেছিলাম। কিন্তু সুকৌশলে আমাকে বাদ দিয়ে আমানত এন্টারপ্রাইজকে কাজ দেওয়া হয়। অথচ দীর্ঘদিন ধরে আমরা সংসদে কাজ করছি। গত সংসদের সব কাজ আমাদের কোম্পানি করেছে।

এ বিষয়ে কথা বলতে আমানত এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার দুলাল মিয়াকে একাধিকবার ফোন দিলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।

সংসদ ভবনের উপসহকারী প্রকৌশলী শামসুল আলম বলেন, সংসদে এসি, এমপিদের অফিসে এসি, লাইট, মাইক্রোফোন, অডিও সিস্টেম, হেডফোনসহ মোট ১২ কোটির কাজ বরাদ্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে হেডফোন ও গুজনেক মাইক্রোফোনের জন্য সংসদে সাড়ে ৪ কোটি টাকার কাজ করানো হয়েছে। এখনো কিছু কাজ বাকি।

গণপূর্ত অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, অতীতের মতো এবারও যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় অডিও ব্র্যান্ড ‘শিওর’-এর তৈরি হেডফোন ও গুজনেক মাইক্রোফোন বসানো হয় সংসদে। তবে অনভিজ্ঞ ঠিকাদার দিয়ে কাজ করানোর কারণে ঠিকমতো হেডফোন ও গুজনেক মাইক্রোফোন স্থাপন করা হয়নি। অনভিজ্ঞ কোম্পানিকে কাজ দেওয়ার বিষয়টি গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন। তবে এ বিষয়ে দায় নিতে রাজি নন কোনো কর্মকর্তা।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা (সংসদে দায়িত্বপ্রাপ্ত) জানান, গুজনেক মাইক্রোফোনের দাম ৫৫ থেকে ৬০ হাজার টাকা এবং হেডফোনের দাম ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা। মাইক্রোফোন, ওয়্যারলেস অডিও সিস্টেম ও হেডফোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটি ‘শিওর’ থেকে আগেও আনা হয়েছে। কিন্তু আগে কখনো এ ধরনের সমস্যা হয়নি। এবার যা হয়েছে, সেটা দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী জানেন।

এ বিষয়ে কথা বলতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের (সংসদে দায়িত্বপ্রাপ্ত) নির্বাহী প্রকৌশলীর নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে পরিচয় দিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিলেও সাড়া দেননি তিনি।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশন চলাকালে ব্যবহৃত হেডফোন ও মাইক্রোফোন কাজ করেনি—এটা আমি শুনছি। কিন্তু এ বিষয়ে আমি জানি না, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী জানেন, কাজ করানোর সময় তিনি দায়িত্বে ছিলেন।

পরে এই বিষয়ে কথা বলতে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলামকে (ই/এম) একাধিকবার ফোন করলেও তিনি ধরেননি। এ ছাড়া এ কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. মাহবুব হোসেনকে একাধিকবার ফোন দিলে তিনিও রিসিভ করেনি।

জানতে চাইলে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওল বলেন, এর দায় আমার না, তাই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করব না।

জানা গেছে, সংসদের প্রথম অধিবেশনে প্রথমবার বক্তব্য দিতে গিয়ে মাইক বিভ্রাটের মুখে পড়েন নবনির্বাচিত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। একপর্যায়ে জোহরের আজান শুরু হলে তিনি ২০ মিনিটের জন্য অধিবেশন মুলতবি করেন। তখন তাকে একটি হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করতে দেখা যায়। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পর সংসদের অধিবেশনে আধা ঘণ্টার বিরতি দেওয়া হয়। এ সময় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সংসদ ভবনে তার কার্যালয়ে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথ পড়ান।

বিরতির পর দুপুর ১২টা ৫৭ মিনিটে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ তার আসনে বসেন। দিনের কর্মসূচি শুরু করার আগে তিনি মাইক অন করলেও সেটি কাজ করছিল না। এতে সংসদ সচিব কানিজ মওলাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তৎপর হয়ে ওঠেন। বারবার মাইক পরীক্ষা করা হলেও সেটি সচল করা সম্ভব হয়নি। পরে স্পিকারের কাছে একটি হ্যান্ডমাইক দেওয়া হয়। তখন সংসদ সদস্যদের ধন্যবাদ জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে না। সবাইকে একটু ধৈর্য ধরতে হবে।’

সংসদ অধিবেশনের পর হেডফোনের মান নিয়ে সমালোচনা করেন ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য মীর আহমেদ বিন কাসেম। তিনি সামজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লেখেন, হেডফোনটির সাউন্ড কোয়ালিটি এতটাই নিম্নমানের, এটি ব্যবহার করতে গিয়ে তার কানে ও মাথায় ব্যথা শুরু হয়েছে। অধিবেশন চলাকালে বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য অভিযোগ করেন, তাদের ব্যবহৃত হেডফোন ঠিকভাবে কাজ করছিল না।

সূত্র : কালবেলা