
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসছে আজ বৃহস্পতিবার। আর শুরুর দিনই সংসদ সদস্য (এমপি) এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দ্বৈত শপথসহ কয়েকটি ইস্যুতে বেশ উত্তপ্ত হতে পারে অধিবেশন কক্ষ। সংশ্লিষ্ট একাধিক পক্ষ থেকে এমনটিই আভাস পাওয়া গেছে। যেসব বিষয় নিয়ে প্রথম দিনই অধিবেশন কক্ষ সরগরম হয়ে উঠতে পারে তার মধ্যে অন্যতম হলো গণভোটে জনগণের রায় বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্রপতির অভিশংসন প্রস্তাব। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এই দুটি বিষয়কে মূল এজেন্ডায় রাখা হচ্ছে বলে একাধিক সংসদ সদস্য ও দল সূত্রে জানা গেছে। তা ছাড়া উচ্চকক্ষ গঠন নিয়েও দেখা দিতে পারে বড় জটিলতা। প্রথম অধিবেশন হওয়ায় সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা মেনে উদ্বোধনী অধিবেশনে ভাষণ দেওয়ার কথা রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের। এ নিয়ে ঘোরতর আপত্তি জানিয়ে আসছে বিরোধী দল। তার অভিশংসন ও গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন তারা। বিরোধী দলের একাধিক দায়িত্বশীল নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাষ্ট্রপতির বক্তব্যকালীন সময় সংসদ বর্জন তথা ওয়াকআউট করবেন বিরোধী দলের সদস্যরা।
এদিকে গণভোটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ ও জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ বাতিল চেয়ে উচ্চ আদালতে যে রিট হয়েছে, তার সঙ্গে বিএনপির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তিনি বলেন, ‘বিএনপি ষড়যন্ত্রমূলকভাবে জুলাই সনদকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য ও সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতা করার জন্য আদালতে গিয়েছে। তারা এক ধরনের ডুয়েল গেম খেলছে।’
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হওয়ার মধ্য দিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন বর্তমান সরকারের জন্য বাধ্যতামূলক হয়েছে উল্লেখ করে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ বলেন, ‘আদালতে একে চ্যালেঞ্জ করার মধ্য দিয়ে বিএনপি নিজের সরকারকেই চ্যালেঞ্জ করল বলে আমরা মনে করছি। কারণ এই একই সনদের ভিত্তিতেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।’
যদিও দ্বৈত শপথ ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে রয়েছে বিপরীতধর্মী মত। গণভোটের মাধ্যমে জনগণের রায় বাস্তবায়নে গুরুত্ব দেন সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিষয়টি গণভোটে স্বীকৃতি মিলেছে। গণভোটের মাধ্যমে জনগণের রায় সংবিধানের চেয়ে কম নয়। আমি মনে করি, আরও বেশি।’
অন্যদিকে বিদ্যমান সংবিধানে না থাকায় এখনি দ্বৈত শপথ নেওয়ার যৌক্তিকতা দেখছেন না সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক। তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিয়ে বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান পরিপন্থি কোনো কাজ করেননি। যেহেতু সংবিধানে এখন নেই, তাই শপথ নেওয়ার প্রশ্ন আসে না।’
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে সংকট তৈরি হয়েছে। আর এ সংকট কতটা ঘনীভূত হবে, সংসদ অধিবেশন শুরুর পর তা বোঝা যাবে।’
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। সংবিধানে বলা আছে, কোনো সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষিত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠানের জন্য সংসদের অধিবেশন আহ্বান করা হবে। তারই ধারাবাহিকতায় আজ প্রথম অধিবেশন আহ্বান করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তবে এই রাষ্ট্রপতি ইস্যুতেও উত্তপ্ত হতে পারে অধিবেশন।
জানা গেছে, প্রথম অধিবেশনেই রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসিত করার প্রস্তাব তুলবে জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধীদলীয় জোট। জোটের একাধিক নেতা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব কালবেলাকে বলেন, ‘প্রথম অধিবেশনেই রাষ্ট্রপতির অভিশংসনের প্রস্তাব উত্থাপনের ব্যাপারে ইতিবাচক ১১ দলীয় জোট। জোটের সব দল এ প্রস্তাব উত্থাপনের ব্যাপারে ইতিবাচক থাকবে বলে আমরা মনে করি।’
রাষ্ট্রপতির ভাষণ বর্জনের ইঙ্গিত দেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল আমিন। তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিস্টের দোসর হিসেবে আমরা রাষ্ট্রপতিকে সংসদে দেখতে চাই না। তার ভাষণের জন্যও আমরা প্রস্তুত নই। আমরা তার অভিশংসন প্রস্তাব করব।’
সংসদের প্রথম অধিবেশনেই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে অভিশংসন করে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন এনসিপি আহ্বায়ক ও সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করে তাকে দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার করা—এটা আমরা মনে করি এই নতুন সরকারের দায়িত্ব। এই রাষ্ট্রপতি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়েছেন, নেতিবাচক কথাবার্তা বলেছেন। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধেও বক্তব্য দিয়েছেন। কাজেই আমরা মনে করি ফ্যাসিস্ট সময়ের চিহ্ন যে রাষ্ট্রপতি, তাকে দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার করা প্রয়োজন। এবং তিনি যে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, সেটাতেও আসলে শপথ লঙ্ঘন হয়েছে। ফলে কোনোভাবেই এ রাষ্ট্রপতি আর এ দায়িত্বে, এ পদে থাকার যোগ্য নন।’
এ প্রসঙ্গে ১১ দলীয় জোটের এক সংসদ সদস্য বলেন, ‘প্রথম অধিবেশনেই আমরা রাষ্ট্রপতির অভিশংসন ও গণভোট নিয়ে কথা বলব। কেন সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ সরকারদলীয় সদস্যরা নেননি এবং কেন এই পরিষদ গঠন হয়নি, তা নিয়ে আমরা প্রশ্ন তুলব। রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় আমরা ওয়াকআউট করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে।’











































