
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর বিশেষ সাঁড়াশি অভিযানে অধরাই রয়েছে মূলহোতারা। তারা গোপন সুড়ঙ্গ দিয়ে পালিয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। গতকাল সোমবার ভোর ৬টা থেকে শুরু হওয়া অভিযান বিকেল পর্যন্ত চলে। ভোরে জঙ্গল সলিমপুরের চারপাশ ঘিরে ফেলে যৌথ বাহিনী। এমন চিত্র দেখ হতভম্ব স্থানীয় বাসিন্দারা।
প্রশাসনিক কাঠামোতে জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান সীতাকুণ্ড উপজেলার আওতায় হলেও ওই এলাকায় প্রবেশ করতে হয় চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ থানার বাংলাবাজার এলাকা দিয়ে। বায়েজিদ লিংক রোড দিয়ে ভাটিয়ারি যাওয়ার পথে ডান দিকে জঙ্গল সলিমপুর। খাসজমির ৩ হাজার ১০০ একরজুড়ে টিলা কেটে গড়ে তোলা এ এক ‘দুর্ভেদ্য সাম্রাজ্য’।
অভিযানের সময় এলাকায় প্রবেশ ও বের হওয়ার পথগুলোতে বসানো হয়েছে তল্লাশিচৌকি, যাতে অভিযান শুরুর পর কেউ পালিয়ে যেতে না পারে। যৌথ বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে অভিযানে অংশ নেন। অতীতে এলাকাটিতে অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবারের অভিযানে ভিন্ন কৌশল নিয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আহসান হাবীব পলাশের নেতৃত্বে অভিযানটি পরিচালিত হয়। এ সময় চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. নাজিমুল হক এবং চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ নাজির আহমেদ খান সরেজমিন উপস্থিত থেকে সার্বিক অভিযান তদারকি ও দিকনির্দেশনা দেন। এ ছাড়া সাতজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অভিযান কার্যক্রমে দায়িত্ব পালন করেন।
চট্টগ্রাম জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গণমাধ্যম) মো. রাসেল কালবেলাকে জানিয়েছেন, অভিযানে সেনাবাহিনীর ৪৮৭ জন, জেলা পুলিশের ১৪৬, চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) ৮০০, আরআরএফ চট্টগ্রামের ৪০০, ফেনী জেলা পুলিশের ১০০, পার্বত্য জেলার ৩০০, এপিবিএনের ৩৩০, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ১২২ এবং র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) ৩৭১ জন সদস্যসহ মোট ৩ হাজার ১৮৩ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য অংশ নেন।
এ ছাড়া অভিযানকে কার্যকর ও নিরাপদভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে তিনটি হেলিকপ্টার, ১৫টি এপিসি, র্যাব ও সিএমপির তিনটি ডগ স্কোয়াড এবং ১২টি ড্রোন ব্যবহার করা হয়। আধুনিক প্রযুক্তি ও বিশেষ কৌশল প্রয়োগ করে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা জঙ্গল সলিমপুর এলাকার বিভিন্ন পাহাড়ি ও দুর্গম স্থানে একযোগে অবস্থান নেন। সন্দেহভাজন আস্তানা, ঝুঁকিপূর্ণ বসতি, পাহাড়ি পথ, গোপন স্থাপনা এবং অপরাধীদের সম্ভাব্য অবস্থানগুলোতে তল্লাশি চালানো হয়। অভিযানে বিভিন্ন স্থান থেকে ১২ জনকে আটক করা হয়। উদ্ধার করা হয় একটি পিস্তল, একটি এলজি, চারটি কার্তুজ, ১১টি ককটেল, ১৭টি দেশীয় অস্ত্র, ১৯টি সিসি ক্যামেরা, দুটি ডিভিআর, একটি পাওয়ার বক্স ও দুটি বাইনোকুলার।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রাসেল জানান, উদ্ধারকৃত আলামত থেকে ধারণা করা হচ্ছে সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা, এলাকায় নজরদারি স্থাপন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্যে এসব ব্যবহার করা হতো। অভিযান পরিচালনাকালে কোনো প্রকার হতাহতের ঘটনা ঘটেনি এবং সার্বিক পরিস্থিতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি আরও জানান, অভিযান শেষে জঙ্গল সলিমপুর ছিন্নমূল ও আলীনগর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা; অপরাধীদের ফের সংগঠিত হওয়ার সুযোগ বন্ধ করা এবং স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতিক্রমে ওই এলাকায় দুটি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে।
গতকাল ভোরে শুরু হওয়া অভিযানের সময় পাহাড়ি অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়। কোথাও রাস্তার ওপর ট্রাক রেখে, কোথাও কালভার্ট ভেঙে, নালার স্ল্যাব তুলে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। এসব প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে ধাপে ধাপে অভিযান অগ্রসর হয়। কর্মকর্তাদের ধারণা, অভিযানের খবর আগেই পেয়েছেন জঙ্গল সলিমপুরে থাকা সন্ত্রাসীদের একটি অংশ। তাই রাতেই এসব প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়।
তথ্যমতে, জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের দুটি পক্ষ রয়েছে। একটি পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন মোহাম্মদ ইয়াসিন এবং অপর পক্ষে রোকন উদ্দিন। ইয়াসিন গত জানুয়ারিতে ওই এলাকায় অভিযানে যাওয়া এক র্যাব কর্মকর্তাকে হত্যার মামলায় প্রধান আসামি। জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকায় রয়েছে তার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অভিযানের আগে যেসব প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে, এর উদ্দেশ্য আলীনগরে যৌথ বাহিনীর প্রবেশ ঠেকানো। আলীনগরে প্রবেশের মূল রাস্তাতেই ট্রাকটি রাখা হয়। কালভার্টটিও আলীনগরের কাছে। অভিযান পরিচালনার সময় সেখানে সাংবাদিকদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাঁজোয়া যানও রাখা হয়েছে বায়েজিদ লিংক রোড এলাকায়।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসান বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান বাধা দিতে ছিন্নমূলের পর আলী নগরের শুরুতে একটি বড় ট্রাক আড়াআড়ি করে রেখে দেওয়া হয়েছে। কিছু দূরে খালের ওপর কালভার্ট ভেঙে দেওয়া হয়েছে, যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো গাড়ি প্রবেশ করতে না পারে। খালে ইট-বালু-সিমেন্ট দিয়ে ভড়াট করে গাড়ি প্রবেশ করানো হয়েছে।’
অভিযান শুরুর আগে কীভাবে এসব ঘটল জানতে চাইলে নাজমুল হাসান বলেন, ‘এটি অনেক বড় অভিযান। এখানে বিভিন্ন বাহিনীর লোকজন আছে। জঙ্গল সলিমপুর এলাকা যারা নিয়ন্ত্রণ করে তাদের সিএনজি অটোরিকশার চালক থেকে শুরু করে বিভিন্ন সোর্স রয়েছে। তাদের মাধ্যমে কোনোভাবে হয়তো জেনে গেছে।’
২০২২ সালে খাস জমি দখলমুক্ত করে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার, স্পোর্টস ভিলেজ, ক্রিকেট স্টেডিয়াম, আইকনিক মসজিদ, ইকো পার্কসহ বিভিন্ন স্থাপনা করার পরিকল্পনা নিয়েছিল সরকার। তখন উচ্ছেদ অভিযানে বারবারে বাধার মুখে পড়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। টানা উচ্ছেদ অভিযানে সেখানে ‘পাহাড় ব্যবস্থাপনা ক্যাম্প ও চেকপোস্ট’ বসিয়েছিল জেলা প্রশাসন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেখানে আবারও ‘স্থানীয় সন্ত্রাসীদের’ তৎপরতা বেড়ে যায়। কয়েকবার সংঘর্ষ ও খুনোখুনির ঘটনা ঘটে। ২০২৫ সালের ৪ অক্টোবর ভোরে জঙ্গল সলিমপুরের আলিনগর এলাকায় ইয়াছিন ও রোকন-গফুর বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে ব্যাপক গোলাগুলি হয়। তখন গুলিবিদ্ধ হয়ে রোকন বাহিনীর এক সদস্য নিহত হন। আহত হন বেশ কয়েকজন। এ ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে সাংবাদিকরা সেখানে গিয়েছিলেন; কিন্তু স্থানীয়দের হামলার শিকার হন দুই সাংবাদিক।
চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি অভিযানে গিয়ে নিহত হন র্যাব-৭-এর উপসহকারী পরিচালক (নায়েব সুবেদার) মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া। এরপরেই নতুন করে আলোচনায় আসে জঙ্গল সলিমপুর। সে সময় নিহত র্যাব সদস্যের জানাজায় এসে বাহিনীপ্রধান এ কে এম শহীদুর রহমান জঙ্গল ছলিমপুরে যৌথ বাহিনীর অভিযান করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে থাকায় ওই সময় আর অভিযান চালানো হয়নি।
সূত্র : কালবেলা













































