
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামালপুরের পাঁচটি আসনে বিএনপি বিজয় পেলেও ভোটের হিসাবে দেখা যাচ্ছে, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা সামনে এসেছে। দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত এ জেলায় প্রথমবারের মতো উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে জামায়াতে ইসলামীর ভোট। অতীতে যেসব নির্বাচনে দলটি এককভাবে অংশ নিয়েছিল, সেসব নির্বাচনে তারা সাধারণত শতকরা তিন থেকে চার ভাগের বেশি ভোট পায়নি। কিন্তু এবার কয়েকটি আসনে বিএনপির সঙ্গে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছে জামায়াত। এ পরিবর্তনের কারণ নিয়েই এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে আলোচনা ও বিশ্লেষণ।
রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলার পাঁচটি আসনের মধ্যে ভোটার উপস্থিতির তারতম্যও লক্ষণীয়। জামালপুর-৪ আসনে সর্বোচ্চ শতকরা ৬৭ ভাগ ভোট পড়েছে। বিপরীতে সবচেয়ে কম ভোট পড়েছে জামালপুর-৫ সদর আসনে, যেখানে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৫৯ শতাংশ। জামালপুর-১, জামালপুর-৩ এবং জামালপুর-৪ আসনে প্রায় ৬৫ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন।
ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, জামালপুর-১ দেওয়ানগঞ্জ-বকশীগঞ্জ আসনে বিএনপি প্রার্থী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৬৫৬ ভোট পেয়ে দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের নাজমুল হক সাঈদী দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৯৭ হাজার ৮২০ ভোট। তবে বকশীগঞ্জ উপজেলায় বিএনপি মাত্র ৬ হাজার ভোটের ব্যবধানে জামায়াতের চেয়ে এগিয়ে ছিল।
জামালপুর-২ ইসলামপুর আসনে জেলার সর্বোচ্চ ভোট পড়েছে শতকরা ৬৭ দশমিক ৬৬ ভাগ। এখানে বিএনপি প্রার্থী সুলতাম মাহমুদ বাবু ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ৯৫ হাজার ৮৬০ ভোট পেয়ে দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের মো. ছামিউল হক দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৬২ হাজার ৪৩৪ ভোট।
জামালপুর-৩ মেলান্দহ-মাদারগঞ্জ আসনে ১৯৯১ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা সংসদ সদস্য ছিলেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম। এবার প্রথমবারের মতো এখানে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপি প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল। তিনি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ২ লাখ ৭ হাজার ৪১২ ভোট পেয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের মুজিবুর রহমান আজাদী পেয়েছেন ৮১ হাজার ৪৩০ ভোট।
জামালপুর-৪ সরিষাবাড়ী আসনে বিএনপি ফরিদুল কবির তালুকদার শামীম ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৪০৬ ভোট পেয়ে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের অ্যাডভোকেট আব্দুল আওয়াল দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৪৪ হাজার ৯৪৭ ভোট।
অন্যদিকে জামালপুর-৫ সদর আসনে বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট ওয়ারেছ আলী মামুন ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ১ লাখ ৯৯ হাজার ৩৪৪ ভোট পেয়ে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুস সাত্তার দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ১ লাখ ১৩ হাজার ২০১ ভোট।
উল্লেখ্য, এ আসনে ১৯৯১ সালে বিএনপি জয়লাভ করেছিল। এর আগে বা পরে কোনো নির্বাচনে দলটি এখানে জয় পায়নি।
ফল বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, জামালপুর-১, জামালপুর-২ এবং জামালপুর-৫ আসনে বিএনপির সঙ্গে জামায়াত তুলনামূলক শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছে। জামালপুর-১ আসনে বিএনপির রশিদুজ্জামান মিল্লাত পেয়েছেন শতকরা ৬১ ভাগ ভোট, যেখানে দাঁড়িপাল্লা পেয়েছে শতকরা ৩৪ ভাগ। জামালপুর-২ আসনে দাঁড়িপাল্লা পেয়েছে শতকরা ৩৮ ভাগ ভোট এবং ধানের শীষ পেয়েছে শতকরা ৫৮ ভাগ। জামালপুর-৩ আসনে বিএনপির মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল পেয়েছেন শতকরা ৬৪ ভাগ ভোট, আর জামায়াতের প্রার্থী পেয়েছেন শতকরা ২৫ ভাগ ভোট। জামালপুর-৪ আসনে জেলা বিএনপির সভাপতি ফরিদুল কবির তালুকদার শামীম পেয়েছেন সর্বোচ্চ শতকরা ৭৪ ভাগ ভোট, সেখানে জামায়াতের প্রার্থী পেয়েছেন শতকরা ২২ ভাগ। জামালপুর-৫ সদর আসনে জামায়াতের ভোট জামালপুর-১ আসনের মতোই শতকরা ৩৪ ভাগ হলেও বিএনপির ওয়ারেছ আলী মামুন পেয়েছেন শতকরা ৬০ ভাগ ভোট। এ ফল ঘিরে স্থানীয় রাজনীতিতে নানা ব্যাখ্যা সামনে আসছে। বিএনপি নেতাদের কেউ কেউ মনে করছেন, আওয়ামী লীগের প্রভাব এবং স্থানীয় রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে কিছু এলাকায় জামায়াতের ভোট বেড়েছে। আবার বিশ্লেষকদের মতে, ভোটের মাঠে নতুন সমীকরণও তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে নির্বাচনের ফলে।









































