
দীর্ঘ দুই দশক পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। সরকারের বয়স মাত্র ১৮ দিন। এখন সবার নজর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে কে হতে যাচ্ছেন স্পিকার? বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। এ নিয়ে দলের নীতিনির্ধারণীর আলোচনা-পর্যালোচনা শেষ পর্যায়ে।
বিএনপির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্র ও সংসদের শীর্ষ পদগুলোতে অভিজ্ঞ ও রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মুখ বসাতে চাইছে দলটি। বিএনপির সর্বোচ্চ ফোরামে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর নাম ওঠে এসেছে। সেখান থেকেই একজনকে জাতীয় সংসদের ১৩তম স্পিকার হিসেবে বেছে নেবে দলটি। এর আগে বিএনপি সরকার গঠন করার পর পঞ্চম, ষষ্ঠ ও অষ্টম সংসদে স্পিকার নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল আইনজীবীদের মধ্য থেকে। এবারও যাদের নাম আলোচিত হচ্ছে তাদের মধ্যে রয়েছেন একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী। গুরুত্বপূর্ণ এই সাংবিধানিক পদের জন্য দলের দুই হেভিওয়েট নেতার নাম সবচেয়ে জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছে। তারা হলেন—বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য প্রবীণ রাজনীতিবিদ ড. আবদুল মঈন খান এবং ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন। এছাড়াও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. ওসমান ফারুকের নামও শোনা যাচ্ছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন ১২ মার্চ বা এর দু-এক দিন আগে বসতে পারে। ওই অধিবেশনের শুরুতেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে। জুলাই জাতীয় সনদের সমঝোতার প্রতি সম্মান জানিয়ে সংসদের ডেপুটি স্পিকার পদে বিরোধী দল থেকে একজনকে নেওয়া হবে। এ জন্য প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নাম প্রস্তাব করতে বলা হয়েছে।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে চতুর্থ জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হয়েছিলেন মির্জা গোলাম হাফিজ। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে পঞ্চম সংসদে শেখ রাজ্জাক আলীকে স্পিকার নিয়োগ দেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে অষ্টম জাতীয় সংসদে ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকারকে স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
প্রথম সারির একটি গণমাধ্যমকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, স্পিকার হওয়ার মতো যোগ্য বেশ কয়েকজন নেতা বিএনপিতে আছেন, যেমন খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আবদুল মঈন খান ও জয়নুল আবেদীন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খানের জন্ম পহেলা জানুয়ারি ১৯৪৭। সে হিসেবে তার বয়স ৭৯ বছর ২ মাসের বেশি। নরসিংদী জেলায় জন্ম নেয়া মঈন খান নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার বাবা আব্দুল মোমেন খান বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় খাদ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। বাবার হাত ধরেই রাজনীতিতে আসেন তিনি। নরসিংদী-২ থেকে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন প্রবীণ এই রাজনীতিক। বেগম খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায়ও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই শিক্ষক ও প্রবীণ রাজনীতিকের একটি বড় প্লাস পয়েন্ট হলো- ব্যক্তিগত ইমেজ সবার কাছে গ্রহণযোগ্য। প্রবীণ এই নেতা এখনো কোনো দাপ্তরিক দায়িত্ব পাননি। রাজনৈতিক মহলের ধারণা, সংসদ পরিচালনায় তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও মার্জিত ব্যক্তিত্ব স্পিকার পদের জন্য তাকে অন্যতম দাবিদার করে তুলেছে। Politics
জয়নুল আবেদীন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যানের পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সভাপতি, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি। তিনি সুপ্রিম কোর্ট বারেরও সাবেক সভাপতি। বিএনপি চেয়ারপারসন প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া ও চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আইনজীবী হিসেবে আদালতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ৭ জুলাই ১৯৫৩ সালে বরিশালের মুলাদীতে তার জন্ম। প্রায় ৭৩ বছর বয়সে প্রথম তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। আইন পেশায় দীর্ঘ সম্পৃক্ততা এবং সংবিধান ও সংসদীয় বিধিবিধান বিষয়ে দক্ষতার কারণে তিনিও আলোচনায় আছেন।
এছাড়া আলোচনায় আছেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. ওসমান ফারুকের নাম। ১৯৪০ সালের ১৮ জুলাই কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানী ড. মুহাম্মদ ওসমান গনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। ২০০১ সালে বিএনপিতে যোগ দিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে কিশোরগঞ্জ-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন, যা বর্তমানে কিশোরগঞ্জ-৩ (করিমগঞ্জ-তাড়াইল) আসন হিসেবে পরিচিত। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে মামলা হলে তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। দীর্ঘ ৮ বছর পর ২৫ অক্টোবর ২০২৪ এ দেশে ফিরেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ড. ওসমান ফারুক। ড. ওসমান ১৯৭০ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে হিসেবে যোগ দেন। বিশ্বব্যাংকের সাবেক এই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা ও সংসদীয় কার্যক্রমে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাকে আলোচনার টেবিলে রেখেছে। ১২ মার্চ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে অভিজ্ঞতা, জ্যেষ্ঠতা, রাজনৈতিক কৌশল—সব মিলিয়ে সংসদের শীর্ষ পদে বিএনপি সরকার কাকে বেছে নেন।
এদিকে ডেপুটি স্পিকার পদে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির-বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থর নাম জোড়ালো ভাবে শোনা যাচ্ছে। বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী, ডেপুটি স্পিকারদের একজন সরকারদলীয় ব্যতীত বিরোধী দলের মধ্য থেকে মনোনীত করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। সে ক্ষেত্রে জামায়াতের সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে একজনকে ডেপুটি স্পিকার করার বিষয়েও আলোচনা চলছে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জোবায়ের বলেন, চীন মৈত্রী সম্মেলনের ইফতারের পর সরকারি এবং বিরোধী দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা চা চক্রে বিএনপির পক্ষ থেকে আমাদের জানানো হয়েছে। পরে তারা আবার আনুষ্ঠানিকভাবে বলেছেন। শিগগিরই আমরা সিদ্ধান্ত জানাব। তবে দলের সিনিয়র কাউকে এই পদে রাখা চিন্তা রয়েছে। আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও জামায়াতের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান মাওলানা আব্দুল হালিম জানান, শুধু ডেপুটি স্পীকার নয়, পুরো জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নকেই গুরুত্ব দিচ্ছে জামায়াত। সনদ অনুযায়ী ডেপুটি স্পীকার হবে বিরোধী দল থেকে আর বিএনপির ইশতেহার অনুযায়ী-দুজন ডেপুটি স্পীকার হবেন।
জামায়াতের বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে জানা গেছে, সিনিয়র নেতাদের মধ্যে জামায়াতের নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, চট্টগ্রামের শাহজাহান চৌধুরী, ঢাকা-১২ এর সাইফুল আলম মিলনসহ বেশ কয়েকজন থেকেই বেছে নেবেন কে হবেন ডেপুটি স্পীকার।












































