
জুলাই শহীদ হিসেবে গেজেটে নাম রয়েছে আল হামীম সায়মনের। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই তার মৃত্যুর পর মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের জুলাই অভ্যুত্থান শাখা প্রকাশিত গেজেটের ৮৪৪ জনের তালিকায় ১০৭ নম্বরে স্থান পায় তার নাম। তবে সম্প্রতি তার মৃত্যু নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন—তিনি কি সত্যিই আন্দোলনে শহীদ হয়েছিলেন, নাকি অন্য কারণে মৃত্যু হয়েছিল?
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন চরচা’র অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। জুলাই শহীদ হিসেবে গেজেটে নাম থাকা আল হামীম সায়মনের মৃত্যুকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক।
অভিযোগ উঠেছে, তিনি আন্দোলনে নিহত হননি বরং ভিন্ন এক ঘটনায় তার মৃত্যু হয়েছিল। মৃত্যুর পর সায়মনের মরদেহ দাফন করা হয় তার গ্রামের বাড়ি দাউদকান্দিতে। সরকারঘোষিত সহায়তা হিসেবে তার পরিবার পায় ৩০ লাখ টাকা। তার হত্যার অভিযোগে একটি মামলাও দায়ের করা হয়, যেখানে এক থেকে দেড়শ অজ্ঞাতনামা আসামিকে খোঁজা হচ্ছে।
প্রায় দুই বছর ধরে বিষয়টি নিয়ে কোনো বিতর্ক ছিল না। কিন্তু নতুন করে ওঠা অভিযোগ বলছে, জুলাই আন্দোলনে অংশ না নেওয়া সায়মনকে ‘জুলাই শহীদ’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করতে প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। এমন অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধানে নেমে উঠে আসে ভিন্ন চিত্র।
অনুসন্ধান সূত্রে জানা যায়, সায়মন একটি বারে অতিরিক্ত মদ্যপানের পর অসুস্থ হয়ে পড়েন।
হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। পরে পরিবারের উদ্যোগে ও কাগজপত্রের ব্যবস্থাপনায় তাকে জুলাই শহীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় এমন অভিযোগই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে।
আন্দোলনে না গিয়েও জুলাই শহীদ সায়মন
২০২৪ সালের ১৮ জুলাই, বৃহস্পতিবার। এদিন কোটাবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পুরো দেশ ছিল রণক্ষেত্র। রাজধানীর বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের কর্মীদের দিনভর সংঘর্ষ চলে।
এদিকে রাজধানীর সবুজবাগ থানার ৭৩ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণগাঁও এলাকার আল হামীম সায়মন বিকেল ৩টার দিকে একটি ফোনকল পেয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যান। তারপর আর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি তার। রাত সাড়ে ১০টা নাগাদ পরিবার জানতে পারে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রাখা আছে সায়মনের মরদেহ।
পরদিন ভোরে মরদেহ নিয়ে এসে এলাকায় জানাজা শেষে দাউদকান্দির গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয় সায়মনকে। এর কিছুদিন পর জুলাই শহীদ হিসেব স্বীকৃতি পান আল হামীম সায়মন। সরকারের সর্বোচ্চ আন্তরিকতায় ৩০ লাখ টাকার অনুদান পায় তার পরিবার, সামনে মিলবে আবাসনও।
সায়মনের মৃত্যু নিয়ে ২০২৫ সালের ৩০ জুন রাজধানীর রামপুরা থানায় হত্যা মামলা করেন তার বাবা কামরুজ্জামান। এতে অভিযোগ করা হয়, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই রামপুরা এলাকায় ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা তাকে পিটিয়ে হত্যা করে। মামলার পর গত ৮ মাসে শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে রামপুরা থানা পুলিশ।
জুলাই শহীদ হিসেবে সায়মনের নাম গেজেটভুক্ত হলে প্রতিবেশী এবং বন্ধুদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। সায়মনকে যারা চেনেন, তারা জানেন সায়মন কখনো জুলাই আন্দোলনে অংশ নেননি। উল্টো তিনি ছিলেন জুলাইবিরোধী। সায়মন নিজে স্বক্রিয় ছিলেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে। দীর্ঘদিন সবুজবাগ থানার ৭৩ নং ওয়ার্ডের শেখ রাসেল জাতীয় শিশু কিশোর পরিষদের এডহক কমিটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন শেষে ২০২৪ সালে চূড়ান্ত কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন সায়মন। এ সম্পর্কিত দাপ্তরিক নথি সংগ্রহ করেছে চরচা। সায়মনের ফেসবুক প্রোফাইলে এখনো শেখ রাসেল জাতীয় শিশু কিশোর পরিষদের মহাসচিব কে এম শহীদুল্লার সঙ্গে তার ছবি দেখা যায়।
সায়মনের স্থানীয় একাধিক বন্ধু ও প্রতিবেশী চরচাকে জানান, জন্মগত কিছু শারীরিক ত্রুটির কারণে সায়মন ছিলেন কিছুটা দুর্বল প্রকৃতির। তবে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকায় তিনি ছিলেন জুলাই আন্দোলনের ঘোর বিরোধী। মৃত্যুর দিন পর্যন্ত নিজের ফেসবুক আইডিতে জুলাই আন্দোলনবিরোধী স্ট্যাটাস দেন সায়মন। তবে সায়মন মারা যাওয়ার পর তারই আইডি থেকে আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট সকল পোস্ট ডিলিট করে দেয় তার পরিবারের সদস্যরা।
সায়মনের বাসার পাশের এক বন্ধু নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরচাকে বলেন, “আমরা আন্দোলন নিয়ে কিছু কইলেই সায়মন আমাগো ধমকাইতো, হ্যায় কইতো শেখ হাসিনা এই দেশের মালিক। তোরা কোন ফাউ (বাজে) কথা কইবিতো একেকটারে লটকামু। ওর এমন ধামকিতে (বকাঝকায়) আমরা হাসতাম, আরও বেশি মজা নিতাম ওর লগে। ওয় প্রতিবন্ধী তো, ওরে আমরা গুনতাম না। অয় যে কত বড় আওমী লীগ আছিল, হেইডা বুঝতেন ওর আইডির পোস্টগুলা দেখলে। অহন তো নাই, সব ফালায় দিছে অর বাপে।”
স্থানীয় কয়েকজন দোকানি জানান, সায়মনের শারীরিক প্রতিবন্ধকতার জন্য এলাকার সকলেই তাকে স্নেহ করতেন। স্থানীয় মুদি ব্যবসায়ী করিম হাজী চরচাকে বলেন, “ওর নাম ঠিকমতো আমি জানতাম না। তবে সবসময় চোখের সামনে দেখতাম দুর্বল একটা ছেলে, তাই মায়া করতাম। ’২৪ সালে জানলাম আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে। তখন হাসাহাসিও করছি–ওর শরীর চলে না, রাজনীতি করবে কী? বলতাম, আমার কাছ থেকে দুধ কলা নিয়ে বেশি করে খাও মিয়া, না হলে স্লোগান দিবা কীভাবে? মাঝেমধ্যে আসত আমার কাছে–কী একটা সংগঠনের নাকি নেতা হয়েছে, বলত অনুষ্ঠান করার জন্য চাঁদা লাগবে। খুশি হয়ে দিয়ে দিতাম ৫০–১০০ টাকা। ওকে চিনতাম এভাবেই। হঠাৎ শুনি স্ট্রোক করে মারা গেছে। আবার এখন শুনি জুলাই শহীদ। কীভাবে কী হলো, কিছুই বুঝলাম না।”
একটি চায়ের দোকানে কথা হয় স্থানীয়দের সঙ্গে। তাদের দাবি–সায়মনের মৃত্যু হয় অতিরিক্ত মদ্যপানে। এ তথ্য যেন ছড়িয়ে না পড়ে, এ জন্য তড়িঘড়ি করে হাসপাতাল থেকে মরদেহ নিয়ে আসে তার বাবা কামরুজ্জামান। স্থানীয় নূর মসজিদে গোসল এবং জানাজার পর গ্রামে নিয়ে দাফন করা হয় সায়মনের মরদেহ।
এ বিষয়ে কথা হয় সায়মনের বাবা কামরুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি নিজেও জানান, ১৮ জুলাইয়ের আগে কখনো আন্দোলনে যাননি সায়মন। তিনি বলেন, “আমার ছেলে এর আগে এসবে যায় নাই। ওই দিনও সারাদিন ঘরে। বিকালে একটা ফোন আসল, ‘আসতেছি’ বলে বাসা থেকে বেরিয়ে গেল। তারপর তো শুনলাম রামপুরা ব্রিজের ওপর আন্দোলনে গিয়েছিল। সেখানে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে।”
স্থানীয়দের অভিযোগ–সায়মন জুলাই শহীদ নন–এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “এলাকার মানুষ শয়তান। তারা আমার আর আমার ছেলের ক্ষতি করতে চায়। আমার ছেলে জুলাই শহীদ। এটা সরকারের কাছেই প্রমাণ আছে। এলাকার মানুষের কথায় কাজ হবে না।”
মৃত্যুর কারণ নিয়ে বিতর্ক, হয়নি ময়নাতদন্ত
দক্ষিণগাঁও নূর মসজিদে ১৯ জুলাই জানাজার নামাজ হয় সায়মনের। তার আগে এই মসজিদেই গোসল করানো হয় সায়মনকে। জানাজা পড়িয়ে আরও একদিন মসজিদের হীমঘরে রাখা হয় সায়মনের মরদেহ। তারপর গ্রামে নিয়ে দাফন করা হয় তাকে। মসিজদের মোয়াজ্জিন নূর ইসলাম চরচাকে জানান, “আমাদের নূর মসজিদে লাশ সংরক্ষণের ব্যবস্থা আছে।
ছেলেটির গোসল আমাদের এখানে করানো হয়। জানাজার নামাজ আমি নিজে পড়াই এবং ৫০০ টাকা করে দৈনিক হাদিয়ায় দুদিন আমাদের ফ্রিজে লাশ রাখা ছিল।” তার মৃত্যুর কারণ কী ছিল–জানতে চাইলে তিনি বলেন, “প্রথমে তো শুনেছিলাম অসুস্থ ছিল। পরে শুনলাম মদ খেয়ে মারা গেছে। কয়েকদিন আগে সিআইডি থেকে লোক এসেছিল এই বিষয় জানতে। তাছাড়া আর কিছু জানা নেই।”
আল হামীম সায়মনের মৃত্যু নিয়ে এমন বিতর্ক থাকার পরও মৃত্যুর সঠিক কারণ কেন জানা যায়নি এবং ময়নাতদন্ত কেন হয়নি তার খোঁজ শুরু করে চরচা। নজর দেওয়া যাক তার ডেথ সার্টিফিকেটে। ১৮ জুলাই রাত ১০টা ২০ মিনিটে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যু সনদে মৃত্যুর কারণের ঘরে চিকিৎসক লেখেন–“Brought In Death. Cause of death will be ascertained after post mortem. H/O Physical Assault”। অর্থাৎ, সায়মনকে মৃত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। তার মৃত্যুর কারণ ময়নাতদন্ত ছাড়া জানা সম্ভব নয়। তাই ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করা হয়। সেই সঙ্গে উল্লেখ করা হয়–রোগীর স্বজনের কাছ থেকে শারীরিক নিপীড়নের তথ্য মিলেছে।
এ ছাড়া হাসপাতালের বহির্বিভাগে সায়মনের ভর্তির টিকিটের ছবিও সংগ্রহ করেছে চরচা। তাতে দেখা যায়, চিকিৎসক সায়মনের টিকিটে উল্লেখ করেন–রোগীকে চিকিৎসা দেওয়ার সময় তার শরীরে রক্তচাপ, হার্টবিট এবং কোন অক্সিজেনের সরবারহ পাওয়া যায়নি; তাই তিনি মৃত। পাশে বুলেট ইনজুরি উল্লেখ করে এটি পুলিশ কেইস হিসেবে গ্রহণের জন্য টিকিটে নির্দেশনা সিল দিয়ে দেন চিকিৎসক।
মৃত্যু সনদে পরিষ্কার উল্লেখ থাকার পরও ময়নাতদন্ত ছাড়াই সায়মনের মরদেহ ভোর রাতে হাসপাতালের মর্গ থেকে নিয়ে আসে স্বজনরা। কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব? তা জানতে কথা হয় সায়মনের বন্ধু মো. শুভর সঙ্গে। তিনি চরচাকে জানান, সায়মনের মতো তিনিও স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বন্ধুর মৃত্যুর পর খবর পেয়ে হাসপাতালে গিয়ে সেখানে সায়মনের বাবা আর বোনকে দেখতে পান। সায়মনের বাবা শুভকে অনুরোধ করেন, যেকোনো মূল্যে সায়মনের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়া নিয়ে যেতে হবে। বাধ্য হয়ে সবুজবাগ এলাকার স্থানীয় কাউন্সিলরের সহায়তা নেন শুভ।
শুভ বলেন, “আঙ্কেলের কান্নাকাটি দেখে আমি আমাদের একজন কাউন্সিলর বড় ভাইকে সব ঘটনা জানাই। তিনি সায়মনের বাবাকে আর বোনকে সবুজবাগ থানায় পাঠিয়ে থানায় ফোন করে বলেন, যেন তাদের সাহায্য করা হয়। তারপর তারা থানায় গিয়ে ভোররাতে একজন পুলিশ সদস্যসহ হাসপাতালে ফিরে আসেন। এই পুলিশ সদস্য মর্গে আমাদের সামনে সুরতহাল তৈরি করেন। পুলিশ সদস্য আমাদের সাহায্য নিয়ে সায়মনের সব কাপড় খুলে সারা শরীর চেক করেন এবং আমাদের দেখান। আমরা কোনো আঘাত তার শরীরে খুঁজে পাইনি। ওর শরীরে যে কোনো ধরনের আঘাতের চিহ্ন নেই, এই মর্মে আমরা নিজেরা সুরতহাল প্রতিবেদনে স্বাক্ষী দিই। সে সময় পুলিশ সায়মনের বাবাকে জিজ্ঞেস করেন যে, কীভাবে মারা গেছে? আঙ্কেল বলেন, ‘আমার ছেলে অসুস্থ ছিল। স্ট্রোক করে মারা গেছে।’ এরপর পুলিশ ময়নাতদন্ত ছাড়া লাশ নেওয়ার ব্যবস্থা করে।”
সেদিন সবুজবাগ থানা থেকে সায়মনের বাবার সঙ্গে হাসপাতালে গিয়েছিলেন উপপরিদর্শক বিমল মধু। চরচাকে তিনি বলেন, “সায়মনের বাবা ওই রাতে হাসপাতালে গিয়ে জানান, তার ছেলে অসুস্থ ছিল। স্ট্রোক করে মারা গেছে। কিন্তু হাসাপাতালে পোস্টমর্টেমের জন্য আটকে রেখেছে। তিনি থানায় এসে কান্নাকাটি করে ছেলের লাশ ছাড়িয়ে দিতে আমাদের কাছে অনুরোধ করেন। তার ‘ছেলের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে, এবং ভবিষ্যতে এ নিয়ে কোনো অভিযোগ করবেন না’ মর্মে সবুজবাগ থানায় প্রত্যয়নপত্র দেন তিনি। এরপর আমি তাদের সঙ্গে হাসপাতালের মর্গে গিয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করি।”
সায়মনের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন মিলেছিল কি না, জানতে চাইলে উপপরিদর্শক বিমল বলেন, “আঘাতের চিহ্ন পেলে কি আমি এই বডি নিতে দিতাম। কোনো চিহ্ন ছিল না। একেবারে স্বাভাবিক মৃত্যু মনে হয়েছে। শুধু পেট একটু ফোলা মনে হয়েছে। আমি সুরতহালেও তা উল্লেখ করেছি।”
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের মর্গে সায়মনের মরদেহের সুরতহালের সময় নিয়ম মেনে কিছু ছবি তুলে রাখেন বিমল মধু। কয়েকটি ছবি সংগ্রহ করেছে চরচা। ছবিতে সায়মনের শরীরে কোনো আঘাত দৃশ্যমান হয়নি।
হাসপাতালের টিকিটে কেন ‘বুলেট ইনজুরি’
সুরতহালে শরীরে আঘাত না মিললেও চিকিৎসক টিকিটে বুলেট ইনজুরির কথা লিখলেন কেন, তা জানা দরকার। এদিন সায়মনকে প্রাথমিক পরীক্ষা করে মৃত ঘোষণা করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. আব্দুল্লাহ আল বাকি এবং মৃত্যু সনদ তৈরি করেন ডা. শারমিন আক্তার।
ডা. শারমিন চরচাকে বলেন, “সেদিন প্রচুর হতাহত ঢাকা মেডিকেলে আসছিল। বেশির ভাগই ছিল গুলি বা স্প্লিন্টারবিদ্ধ। অনেক আগের ঘটনা তো তাই এই পেশেন্টের ক্ষেত্রে ঠিক কী ঘটেছিল, তা ঠিক মনে করতে পারছি না। তবে ডকুমেন্ট দেখে এটুকু বলতে পারি–আমরা যখন টিকিট করি, তখন এটেন্ডেন্টের কাছে জিজ্ঞেস করি রোগীর কী হয়েছে। সেসময় হয়তো তার এটেন্ডেন্ট বলেছিল যে গুলি লেগেছে। তাই পাশে বুলেট ইনজুরি লেখা হয়েছিল। কিন্তু পরে পরীক্ষার সময় শরীরে কোনো আঘাত দেখা যায়নি।”
শারমিন বলেন, “অনেক সময় এমন হয়–ছোট স্প্লিন্টার শরীরে ঢুকে যায় যা চোখে পড়ে না। সেই সন্দেহ থেকে পোস্টমর্টেম করতে মরদেহ মর্গে পাঠিয়ে দিই। পরে ডেথ সার্টিফিকেট ইস্যুর সময় ‘ফিজিক্যাল অ্যাসল্ট’ উল্লেখ করি। যেহেতু আমরা নিশ্চিত হতে পারছিলাম না, তাই সনদে এমন লিখেছি।”
এদিকে, ছেলের মৃত্যুর বিষয়ে একাধিকবার চরচাকে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেয় সায়মনের পরিবার। সায়মনের বাবা-মা দুজনই জানান, ১৮ জুলাই রামপুরায় আন্দোলনে অংশ নিয়ে হত্যার শিকার হন সায়মন। সায়মনের মা শাহরীন আক্তার দাবি করেন, তার ছেলের বুকে গুলি লেগেছিল। আর বাবা কামরুজ্জামানের দাবি তার স্ত্রী সবকিছু জানেন না। তিনি বলেন, “আমার ছেলেকে পিটিয়ে মারা হয়েছে।” কোথায় আঘাত পেয়েছিলেন সায়মন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমার ছেলের মাথা ফেটে গিয়েছিল; মাথা এবং মুখ রক্তাক্ত ছিল। আর সারা শরীরে রক্ত জমাট ছিল।”
তবে তাদের বক্তব্যের সঙ্গে সুরতহালের ছবির কোনো মিল পায়নি চরচা। ময়নাতদন্ত ছাড়া সায়মনের মরদেহ কেন নিয়ে এলেন–এমন প্রশ্নে কামরুজ্জামান বলেন, “আমার ছেলেটা ছোটবেলা থেকে অসুস্থ ছিল। আল্লাহ নিয়ে গেছে। আবার কাটাছেঁড়া করলে আমি সহ্য করতে পারতাম না।”
২০২৪ সালের ১৮ জুলাই কোথায় ছিলেন সায়মন? ওই দিন বিকেলে বাসা থেকে বের হন আল হামীম সায়মন। পাশের গলিতে দেখা হয়, এলাকার ছোট ভাই এবং সায়মনের অনুসারী ছোট হামজার সঙ্গে। হামজাকে সায়মন বিরিয়ানী খেতে পল্টন যাওয়ার প্রস্তাব দেন। এরপর তারা দুজন কাকরাইলের নাইটিঙ্গেল বারে যান। সেখানে সায়মন মদ্যপান করেন এবং অসুস্থ হয়ে বমি করতে থাকেন। পরে ওই বারের কর্মচারীদের সহযোগিতায় সিএনজি অটোরিকশায় তুলে সায়মনকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যান হামজা। হাসপাতালে নিলে রাত সাড়ে ১০টার দিকে সায়মনকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা।
এই বর্ণনা চরচাকে জানান ছোট হামজা নিজেই। চরচাকে হামজা বলেন, “হেদিন ভাই (সায়মন) গিয়া কাকরাইলের বারে আগে ঢুকল। আমি কোক খাইলাম, আর ভাই কতক্ষণ মদ খাইল। একটু পরে হেয় কয় মাথা চক্কর দিছে, সারা শরীর জ্বলতাছে। এরপর সমানে বমি। বারের পোলাপাইন কইল তাড়াতাড়ি হাসপাতাল নিতে। সবাই ধরাধরি কইরা সিএনজিতে তুললাম।”
হাসপাতালে যাওয়ার পথে ছাত্ররা বিভিন্ন স্থানে আটকেছে, এবং তাদের অনুনয় করে শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে নেন বলে জানান হামজা। পথেই সায়মন নিস্তেজ হয়ে যান জানিয়ে হামজা বলেন, “এরপর হাসপাতালে ডাক্তার যখন কয় মইরা গেছে, আমি তো আর দুনিয়াতে নাই। পলায়া এলাকায় আইয়্যা বড় ভাইদের জানাই এই ঘটনা। পরে সায়মন ভাইয়ের বাপ, বইনসহ সবাই মিল্লা হাসপাতালে গেছি।”
হাসপাতালে চিকিৎসকদের সঙ্গে কী হয়েছিল জানতে চাইলে হামজা বলেন, “ভাই আমার কিচ্ছু মনে নাই। হেরা জিগাইছিল–কেমনে এমন হইছে? পুলিশের ডরে আমি মদ খাওয়ার কথা কই নাই। কইছিলাম, মাথা ঘুইরা রাস্তায় পইড়া গেছে।”
মদ্যপানে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর বিষয়টি গোপন রাখতে হামজাকে চাপ দেন সায়মনের বাবা কামরুজ্জামান। এ জন্য সুরতহালের সময় পুলিশকে হামজা জানান–সায়মন রাস্তায় মাথা ঘুরে পড়ে গিয়ে মারা যান। আর কামরুজ্জামান সাজান ছেলের স্ট্রোকের গল্প।
অভিযোগ আছে, ঘটনার কিছুদিন পর বাসায় ডেকে কামরুজ্জামান হামজাকে বলেন, সায়মন রামপুরায় আন্দোলন করতে গিয়ে মারা গেছে–এখন থেকে সবাইকে এটাই বলতে হবে। মদের কথা যেন কেউ না জানে। একইসঙ্গে তাকে ভয় দেখানো হয় সায়মনের বোনের শ্বশুর একজন পুলিশ সুপার। সায়মন জুলাই শহীদ–এমনটা না বললে হামজার ক্ষতি হবে। ভয় পেয়ে ঢাকা ছেড়ে গ্রামে চলে যান হামজা।
সায়মনের বাবা কামরুজ্জামান এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, হামজাসহ কয়েকজন তার ছেলেকে হেনস্তা করত। কয়েকবার তারা সায়মনকে মারধরও করেছে। মৃত্যুর একমাস আগে সায়মন নিজেই সবুজবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছেন বলেও দাবি করেন কামরুজ্জামান। তবে সেই সাধারণ ডায়েরির (জিডি) কোন অনুলিপি দেখাতে পারেননি। এর ট্র্যাকিং নম্বর না থাকায় থানা থেকে জিডির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি চরচা।
এদিকে, আল হামীম সায়মনের মাদ্যপানের বিষয়ে স্থানীয়দের অনেকেই অবগত। একাধিক সময় সায়মনকে মদ পান করে বেসামাল অবস্থায় এলাকায় দেখেছেন বলে জানান স্থানীয় মুরব্বিরা। সায়মনের বাবা কামরুজ্জামান জমি কেনা-বেচার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেন। তার এক সহযোগীর সঙ্গে কথা হয় চরচার। তিনি জানান, সায়মনের দাফনের আগে কামরুজ্জামানকে নাইটিঙ্গেল বারের ঘটনাটি পুলিশকে জানাতে পরামর্শ দেন তিনি। কিন্তু তাতে কান দেননি সায়মনের বাবা। এরপর জুলাই শহীদ হিসেবে স্বীকৃতি নেওয়ার পরও কামরুজ্জামানকে সতর্ক করেন তার ওই সহযোগী। তিনি বলেন, “সায়মনের বাপ ৩০ লাখ টাকা পাবার পর আমি তারে বলছি, ধরা খাইলে কী করবা? সে বলে কী আর করমু, ফেরত দিয়া দিমু।”
তবে কাকরাইল এলাকার নাইটিঙ্গেল বারে গিয়ে সায়মনের উপস্তিতির বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে রাজি হয়নি বার কর্তৃপক্ষ।
সায়মন হত্যা মামলা ও তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন
সায়মন মারা যান ১৮ জুলাই ২০২৪। এর কয়েক মাসের মধ্যে সরকার ঘোষিত ৩০ লাখ টাকাও বুঝে নেয় তার পরিবার। প্রথমে সরকার থেকে পাওয়া এই সহায়তার কথা অস্বীকার করে সায়মনের পরিবার। তার বাবা চরচাকে বলেন, “আমরা কোনো টাকা নিইনি। কেউ আমাদের কোনো টাকা দেয়নি। সরকার আমাদের টাকা দিতে চেয়েছিল। আমরা বলে দিয়েছি, ছেলে মারা গেছে; আমরা কোন টাকা নেব না। এই টাকা মসজিদে দান করে দিতে বলেছি।”
সায়মনের পরিবারের ৩০ লাখ টাকা পাওয়ার তথ্য চরচার কাছে আছে জানালে টাকা প্রাপ্তির বিষয়টি স্বীকার করেন কামরুজ্জামান। বলেন, “আমাদের কোনো নগদ টাকা দেয়নি। আমার নামে এফডিআর করে দিয়েছে।”
একইভাবে প্রায় প্রতিটি প্রশ্নে অস্বচ্ছ জবাব মিলেছে সায়মনের পরিবারের পক্ষ থেকে। এই যেমন ছেলে হত্যা মামলা করতে পুরো ১ বছর সময় নেন সায়মনের বাবা কামরুজ্জামান। রাজধানীর রামপুরা থানায় গত ৩০ জুন ২০২৫ সালে অজ্ঞাত ১০০–১৫০ জন ব্যক্তিকে আসামি করে মামলাটি দায়ের করেন তিনি। মামলা নম্বর ৩৬। মামলার অভিযোগে তিনি বলেন, ১৮ জুলাই রাজধানীর রামপুরা ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা ছেলেকে পিটিয়ে হত্যা করে।
সায়মন রামপুরা ব্রিজ এলাকায় হামলার শিকার হয়েছেন–এটা কীভাবে নিশ্চিত হয়েছেন, তা জানতে চাইলে কামরুজ্জামান চরচাকে জানান, সায়মনের বন্ধুরা বলেছে তাকে রামপুরায় পেটানো হয়। তবে বন্ধুদের পরিচয় জানাতে পারেননি।
মামলা করতে এত সময় লাগার কারণ সম্পর্কে কামরুজ্জামান বলেন, “আমি মামলা করতে চাইনি। সরকার থেকে আর পুলিশ থেকে বলেছে মামলা করতে, তাই করেছি।”
এদিকে, গেল ৮ মাস ধরে এই হত্যা মামলার তদন্ত করছেন রামপুরা থানার উপপরিদর্শক মাসুদ রানা। ইতোমধ্যেই তিনি আল হামীম সায়মনের মৃত্যুর পেছনে বিতর্কের বিষয়টি অবহিত। মৃত্যুর সময় সঙ্গে থাকা সায়মনের এলাকার ছোট ভাই হামজার বক্তব্য ফোনে জেনেছেন এবং সায়মনের আরও দুই বন্ধুর লিখিত জবানবন্দী টাইপ করে রেখেছেন। সেখানে সায়মনের মদ্যপানে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে চরচার কাছে এসব বিষয়ে স্বীকার করেননি। তিনি বলেন, “মানুষ মুখে মুখে অভিযোগ করলে, তা সত্য বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। আমাদের তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষের আগে এ বিষয়ে মন্তব্য করার সুযোগ নেই। আমরা মন্ত্রণালয় এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সায়মনের মৃত্যু সম্পর্কে তথ্য চেয়েছি। এসব তথ্য পেলে আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারব।”
সায়মনের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন করা হয়েছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে মরদেহ উত্তোলন করে ময়নাতদন্তের আবেদন করেছেন কি না, জানতে চাইলে কোনো উত্তর দেননি মাসুদ রানা। এই মামলা-সংক্রান্ত তথ্য জানতে হলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি।
এদিকে, আল হামীম সায়মনের মরদেহ উত্তোলনের জন্য কোনো নির্দেশনা পাননি বলেও চরচাকে নিশ্চিত করেছেন দাউদকান্দি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাছরীন আক্তার।
এ বিষয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজি খন্দকার রফিকুল ইসলাম চরচাকে বলেন, “জুলাই-সংক্রান্ত প্রতারণার এমন বেশ কিছু ঘটনা আমরা তদন্ত করছি। আপনারা আমাদের তথ্য দিন, আমরা তদন্ত করে অবশ্যই ব্যবস্থা নেব। তাছাড়া একটি মামলা যেহেতু তদন্তাধীন, আমরা এটিকে গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব। কোনো প্রতারণার বিষয়ে ছাড় দেওয়া হবে না।”
মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের জুলাই অভ্যুত্থান শাখার উপসচিব ড. মো. মতিউর রহমান জানান, এই ঘটনায় স্থানীয় জুলাই যোদ্ধাদের কমিটির পক্ষ থেক মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে, আল হামীম সায়মনের মৃত্যুর ১৯ মাস অতিবাহিত হলেও ময়নাতদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব বলে মনে করেছেন চিকিৎসকেরা। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রভাষক ডা. প্রদীপ বিশ্বাস চরচাকে জানান, পচনশীল অঙ্গ বাদে শরীরের হাড়ের ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে মৃত্যুর কারণ অনুমানের সুযোগ রয়েছে। যদি কোনো ব্যক্তির বিষক্রিয়ায় মৃত্যু হয় তবে তা হাড়ের কেমিকেল পরীক্ষায় চলে আসবে।










































