প্রচ্ছদ রাজনীতি দাদি-নাতনি খু’ন: ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে লোমহর্ষক বর্ণনা দিলেন অভিযুক্ত শরীফ

দাদি-নাতনি খু’ন: ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে লোমহর্ষক বর্ণনা দিলেন অভিযুক্ত শরীফ

পাবনার ঈশ্বরদীতে দাদি ও নাতনিকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পর রহস্য উদঘাটন করেছে পাবনা জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। এই হত্যাকাণ্ডে সন্দেহভাজন হিসেবে ভবানীপুর উত্তরপাড়া গ্রামের রাব্বি মন্ডল ও শরিফুল ইসলাম নামে আটক করা দুই যুবককে থানা হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদকালে শরীফ পুলিশের কাছে হত্যার কথা স্বীকার করে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছে। সে সম্পর্কে নিহত কিশোরীর চাচা।

পাবনা জেলা ডিবির ওসি রাশিদুল ইসলাম জানান, ​হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে পাবনা ডিবি পুলিশের একটি বিশেষ দল তদন্ত শুরু করে। তারা স্থানীয় তথ্য এবং প্রযুক্তির সহায়তায় সন্দেহভাজন হিসেবে শরীফুল ইসলামকে শনিবার রাত ১০টার দিকে আটক করে। ডিবি কার্যালয়ে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের মুখে সে নিজের অপরাধ স্বীকার করে এবং হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক বর্ণনা দেয়।

শরীফ পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে, যৌন হয়রানির চেষ্টা ও তাতে নাতনির বাধার কারণে সৃষ্ট ক্ষোভ থেকেই তিনি জয়নাল খাঁর মা সুফিয়া খাতুন (৬৫) ও তার নাতনি জামিলা আক্তারকে (১৫) খুন করে। গ্রেফতার শরীফ ও নিহতরা পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার দাশুড়িয়া ইউনিয়নের ভবানীপুর উত্তরপাড়া এলাকার বাসিন্দা। জামিলা স্থানীয় একটি মাদ্রাসার নবম শ্রেণির ছাত্রী ছিল। ঘটনায় জামিলার বোন বাদী হয়ে ঈশ্বরদী থানায় অজ্ঞাতদের আসামি করে একটি মামলা করে।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, জামিলার বাবা জয়নাল খাঁ কাজের তাগিদে প্রায়শই ঢাকার সাভারে তার বড় মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে থাকতেন। জামিলা তার দাদি সুফিয়া খাতুনের সঙ্গেই গ্রামের বাড়িতে বসবাস করতো। ঘটনার সময়ও জামিলার বাবা বাড়িতে ছিলেন না।

পাবনা ডিবি পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার ট্রাকচালক শরিফুল ইসলাম শরীফ হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছে। শরীফ ভবানীপুর উত্তরপাড়া গ্রামের মোফাজ্জল হোসেনের ছেলে।

শরীফের বর্ণনা অনুযায়ী, গত ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে সে জামিলাদের বাড়িতে বাজার পৌঁছে দিতে যায়। সে সময় সুফিয়া খাতুন বাড়িতে না থাকার সুযোগে তার নাতনিকে যৌন হয়রানির চেষ্টা করে। কিশোরী এতে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন এবং টাকে চড় মারেন। সেখান থেকে শরীফ অপমানিত হয়ে ফিরে আসে।

এর কয়েকদিন পর, গত শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত রাতে শরীফ আবারও জামিলাদের বাড়িতে যান। এবার তিনি দাদি সুফিয়া খাতুন ও নাতনি জামিলার কাছে পূর্বের ঘটনার জন্য ক্ষমা চায়। তবে সুফিয়া খাতুন তাকে ক্ষমা না করে চিৎকার করেন। এতে শরীফ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে শরীফ পাশে পড়ে থাকা একটি কাঠের বাটাম দিয়ে সুফিয়া খাতুনের মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করে। বৃদ্ধা মাটিতে লুটিয়ে পড়লে জামিলা চিৎকার করতে শুরু করে। এতে শরীফ তাকেও একই কুন্নি (রাজমস্ত্রিদের প্লাস্টার করার কাজে ব্যবহৃত সরঞ্জাম) দিয়ে জামিলার মাথায় ও কপালে আঘাত করে। জামিলা মাটিতে পড়ে গেলে শরীফ তাকে টেনেহিঁচড়ে বাড়ির পাশের একটি খোলা সরিষাক্ষেতের দিকে নিয়ে যায়।

মাঝে পুকুরপাড়ে নিয়ে কিশোরীকে ধর্ষণ করে। এরপর গলা টিপে মৃত্যু নিশ্চিত করে লাশ সরিষাক্ষেতে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। ঘটনার পরে ​প্রাথমিকভাবে ঈশ্বরদী থানার ওসি মমিনুজ্জামান এবং ঈশ্বরদী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার প্রণব কুমার আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, ‘কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।’

এর আগে, শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) মধ্যরাতের পর ঈশ্বরদী উপজেলার ভবানীপুর উত্তরপাড়া গ্রামে কান্নাকাটির শব্দ শুনে স্থানীয়রা বের হলেও পরে পরিস্থিতি শান্ত দেখে সবাই ঘরে ফিরে যান। পরদিন শনিবার সকালে বাড়ির উঠানে বৃদ্ধা সুফিয়া বেগমের রক্তাক্ত মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন স্বজনরা। এ সময় নাতনি জামিলা আক্তারকে খুঁজে না পেয়ে চারদিকে তল্লাশি শুরু হয়। পরে বাড়ি থেকে কিছু দূরে একটি সরিষা ক্ষেতে তার বিবস্ত্র মরদেহ উদ্ধার করে এলাকাবাসী। নিহত সুফিয়া বেগম ওই গ্রামের মৃত নাজিম উদ্দিন খাঁর স্ত্রী এবং জামিলা আক্তার কালিকাপুর দাখিল মাদ্রাসার দশম শ্রেণীর ছাত্রী ও হাফেজা ছিল। বাড়িতে কোনো পুরুষ মানুষ না থাকায় তারা দাদি-নাতনি একসাথেই থাকতেন।

ঘটনার খবর পেয়ে রাজশাহী রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি খন্দকার মো. শামীম হোসেন ও পাবনার পুলিশ সুপার আনোয়ার জাহিদ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তারা খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে জড়িতদের গ্রেপ্তার ও হত্যার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের মূল মোটিভ বা কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মরদেহ দুটি ময়নাতদন্তের জন্য পাবনা জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।