
তুমি যাবে ভাই-যাবে মোর সাথে, আমাদের ছোট গাঁয়/গাছের ছায়ায় লতায় পাতায় উদাসী বনের বায়; মায়া মমতায় জড়াজড়ি করি…’ (নিমন্ত্রণ)। পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের এই কবিতার মতো নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও সাংগঠনিক কার্যক্রম নিষেধাজ্ঞায় থাকা আওয়ামী লীগকে দেশের রাজনীতিতে ফিরে আসার আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। আর আওয়ামী লীগ নামের বর্গিরা ফের দেশের রাজনীতিতে ফেরার আভাসে এনসিপি, জামায়াত তো বটেই: সারা দেশের সাধারণ মানুষ ও বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক শুরু হয়েছে। যে আওয়ামী লীগের জুলুম-নির্যাতন, হামলা-মামলা মাথায় নিয়ে দীর্ঘ ১৮ বছর বিপর্যস্তকর জীবন যাপন করেছেন বিএনপি নেতাকর্মীরা, ক্ষমতায় আসার এক মাস হতে না হতেই সেই ভয়ঙ্কর দানবরূপী আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের চেষ্টায় তারা ভীত-সন্ত্রস্ত্র।
হিংস্র রাজনীতিতে অভ্যস্ত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের যেভাবে জামিনে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে, তাতে অনেকের শঙ্কা: ভারতের তাঁবেদার ওই দলের নেতারা রাজনীতিতে ফিরতে পারলে বিএনপির প্রতিই প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠবে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর বিএনপি নেতারাই ওইসব (আওয়ামী লীগ) নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। আওয়ামী লীগ নেতারা জামিনে বের হয়ে এলে এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতি শুরু হলে তারা সর্বপ্রথম বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেবে।
এর মধ্যেই বরিশালে আওয়ামী লীগের চিহ্নিত নেতাদের জামিন দেয়া নিয়ে আদালতের এজলাসে ভাঙচুর ও বিচারকাজে বাধা দেয়ার অভিযোগে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আটকের ঘটনা ঘটেছে। ঘটনাটি হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে। ভারতের পালাতক হাসিনার অলিগার্ক হিসেবে চিহ্নিত নি¤œ আদালতের বিচারকের আদালতে ‘আওয়ামী লীগ নেতাদের জামিন’ ঘটনা এখন ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মূলত নি¤œ আদালতে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের অনুসারী যে বিচারকরা রয়েছেন, তারাই আওয়ামী লীগ নেতাদের জামিন দিতে পারেন: এমনটিই মনে হচ্ছে।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. নূরুল আমিন ব্যাপারী বলেন, আওয়ামী লীগ ফিরে এলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিএনপি। কোনোভাবেই আওয়ামী লীগকে প্রশ্রয় দেয়া উচিত নয়। মনে রাখতে হবে: ভারত নয়, জনগণ বিএনপিকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় এনেছে। এবারের নির্বাচনে প্রভাব খাটিয়ে বিএনপিকে ক্ষমতায় আনার সক্ষমতা দিল্লির থাকলে তারা জুলাই অভ্যুত্থান ঠেকিয়ে আওয়ামী লীগকেই ক্ষমতায় রাখত।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরিশালের মতোই সারাদেশে জুলাই অভ্যুত্থানের পর হত্যাসহ নানান অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ নেতাদের জামিন দেয়ার হার বেড়ে গেছে। গতকালও পাঁচ মামলায় জামিন পেয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আওয়ামী লীগ নেত্রী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। আর কক্সবাজারের জুলাই-আগস্টে হত্যাযজ্ঞের মামলায় কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ আসনের সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদি জামিন পান। গতকাল বৃহস্পতিবার হাইকোর্ট থেকে জামিন পান তিনি। বদি কুখ্যাত মাদক কারবারি। আওয়ামী লীগ শাসনামলে দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হওয়ায় একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বদির পরিবর্তে তার স্ত্রী শাহীন আক্তারকে মনোনয়ন দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের কাছেই ঘৃণিত এবং ইয়াবা বদিকে বিএনপির শাসনামলে জামিন দেয়া হয়েছে। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা নতুন রাজনৈতিক দলের শাসনামলে মাফিয়াতন্ত্রের আওয়ামী লীগের কারাবন্দি নেতাদের জামিন নিয়ে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে সারাদেশে। দল-মত নির্বিশেষে সবার মধ্যে ভয়: আওয়ামী লীগ নেতারা জামিনে বের হয়ে এলে প্রতিশোধ নেবে। কারণ তাদের হাতে প্রচুর টাকা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন ‘আওয়ামী লীগ ফিরে আসছে’ সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচারণা চলছে।’ এক ঝাক ইউটিউবার, কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে সোশ্যাল মিডিয়ায় আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রচারণায় মাঠে নামানো হয়েছে। ভারতে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতারা কখন এবং কিভাবে দেশে ফিরবেন এবং কার কার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেবেন: সে ব্যাপারে হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন। এ অবস্থায় বরিশালের ঘটনা সবার নজর কেড়েছে। ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের পর বিশেষ করে আওয়ামী লীগের শাসনামলের সাড়ে ১৫ বছর বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ ‘বরিশালের গডফাদার’ হয়ে উঠেছিলেন। সেখানে আইনের শাসন নয়, চলেছে হাসানাত আবদুল্লাহর শাসন। স্থানীয় বাসিন্দা, ভুক্তভোগী মানুষ ও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নেতাকর্মীদের মতে, হাসানাত আবদুল্লাহর রাজত্বে বরিশালের সবাই ছিল ‘করদ প্রজা’। সন্ত্রাসী ছেলে সাদেক আবদুল্লাহকে করেছিলেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র। ফ্যাসিস্ট হাসিনার ফুফাতো ভাই হওয়ার সুবাদে তিনি বরিশালের ‘অভিভাবক’ হয়ে উঠেছিলেন। সেখানে তার কথায় ছিল আইন। দীর্ঘ ১৫ বছর বিএনপিকে রাজপথে নামতে দেননি। এমনকি বিএনপির সিনিয়র নেতারাও প্রকাশ্যে চলাফেরা করতে পারতেন না। বিএনপি-জামায়াতের পাশাপাশি সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় থেকে শুরু করে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও তার জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যা জাতীয় গণমাধ্যমে প্রচার হয়েছে। একজন উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে হাসানাত আবদুল্লাহর ছেলে সাদের আবদুল্লাহ কী হাল করেছিল, তা সবার জানা। সেই হাসানাতের যারা ডান হাত ও বাম হাত হয়ে বরিশালে দীর্ঘ ১৫ বছর ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল, তাদের একজন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এমপি তালুকদার মো. ইউনুসের জামিন দেয়াকে কেন্দ্র করে আদালতে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। ২৩ ফেব্রুয়ারি বরিশাল অতিরিক্ত মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নিলে আইনজীবীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। আইনজীবীরা মহানগর আদালত বর্জন করেন এবং সংশ্লিষ্ট বিচারকের অপসারণ ও জামিন বাতিলের দাবি জানান। অতঃপর এজলাসে ভাঙচুর ও বিচারকার্যে বাধা দেয়ার অভিযোগে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সাদিকুর রহমান লিংকনকে আটক করে কারাগারে পাঠানো হয়। সারাদেশে এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে।









































