প্রচ্ছদ জাতীয় ড. ইউনূস প্রমাণ করলেন তিনিই একমাত্র আন্তর্জাতিক খেলোয়াড় বাকি সবাই আঞ্চলিক

ড. ইউনূস প্রমাণ করলেন তিনিই একমাত্র আন্তর্জাতিক খেলোয়াড় বাকি সবাই আঞ্চলিক

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন বিএনপি নেতা তারেক রহমান। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দীর্ঘ ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন শাসন শেষে দেশে আবার নির্বাচিত সরকার গঠিত হলো। তবে তারেক রহমান রাষ্ট্রক্ষমতায় বসলেও বিশ্লেষকদের প্রশ্ন—এই পুরো প্রক্রিয়ায় প্রকৃত বিজয়ী কে? অনেকে মনে করছেন, ৮৫ বছর বয়সী নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস অত্যন্ত কৌশলে তার লক্ষ্য পূরণ করে এক অনন্য উচ্চতায় নিজেকে নিয়ে গেছেন।

ইন্ডিয়া টুডের এক বিশ্নেষণে বলা হয়, আজ বিএনপির তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেও, বাংলাদেশের প্রকৃত বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন মুহাম্মদ ইউনূস। গত ১৮ মাসে তিনি যা যা করতে চেয়েছিলেন, তার প্রায় সবটুকুই সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন এবং তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়েই একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান করেছেন। ৮৫ বছর বয়সী ইউনূস কীভাবে সবকিছু নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী করতে সক্ষম হলেন?

এতে আরও বলা হয়, যখন সবার নজর ছিল খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার লড়াইয়ের দিকে, তখন বাংলাদেশে অন্য এক রাজনৈতিক ঘূর্ণিঝড় দানা বাঁধছিল। এর কেন্দ্রে ছিল এমন এক প্রধানমন্ত্রীর লড়াই যার কোনো নোবেল নেই, এবং এমন এক নোবেল জয়ীর লড়াই যার কোনো প্রধানমন্ত্রীর চেয়ার নেই। খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান যে মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছেন, তা মূলত সেই লড়াইয়েরই ফলাফল।

২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ড. ইউনূস বেশ কিছু সাহসী পদক্ষেপ নেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তার সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক বিজয় হলো আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রাখা। শেখ হাসিনার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পরিচিত ইউনূস পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থন আদায় করে একটি ‘অংশগ্রহণমূলক’ নির্বাচনের তকমা দিতে সক্ষম হয়েছেন, যেখানে দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগ অনুপস্থিত ছিল।

তবে আজকের আলোচনার বিষয় হলো—ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখের নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করা এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে ইউনূস প্রকৃত বিজয়ী হলেন। ইউনূস, যার কোনো রাজনৈতিক সাংগঠনিক শক্তি নেই, তিনি কীভাবে সব কাজ হাসিল করলেন? এবং আমরা এই কঠিন প্রশ্নটির উত্তর খোঁজার চেষ্টা করব—ইতিহাস কি মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতি সদয় হবে?

১৮ মাসে ইউনূসের অর্জন

অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. ইউনূস মঙ্গলবার নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে বিদায় নিচ্ছেন।যদি গভীরভাবে দেখা হয়, তবে দেখা যাবে ইউনূস গত ১৮ মাসে যা করতে চেয়েছিলেন তার বেশিরভাগই সফল করেছেন। রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারি থেকে শুরু করে আমেরিকার সাথে বাণিজ্য চুক্তি, এমনকি সেনাপ্রধান যেখানে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচন চেয়েছিলেন, সেখানে ইউনূস নিজের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন দিয়ে তা সফল করেছেন।

বাংলাদেশি-আমেরিকান রাজনৈতিক বিশ্লেষক শাফকাত রাব্বী বলেন, ‘‘৮৫ বছর বয়সেও ইউনূস কঠোর পরিশ্রম করেছেন এবং খুব অল্প সময়ে যা চেয়েছিলেন তা অর্জন করেছেন। এটি তাকে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম কর্মক্ষম সরকার প্রধান হিসেবে চিহ্নিত করবে।’’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহান বলেন, ইউনূস একটি ‘শোভন কাজ’ করেছেন। তিনি মনে করেন, প্রধান উপদেষ্টা অর্থনৈতিক ধস ঠেকাতে এবং নির্বাচন আয়োজন করতে পারলেও, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, ‘মবোক্রেসি’ বা উশৃঙ্খল জনতাকে সামলানো এবং নাগরিকদের ব্যক্তিগত অধিকার রক্ষায় অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছেন।

সংস্কারের বাইরে ইউনূসের সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত বিজয় হলো—তার প্রধান প্রতিপক্ষ হাসিনার দল আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করা। শুধু তাই নয়, পশ্চিমা দেশগুলোকেও তিনি এই নির্বাচনের বৈধতা দিতে রাজি করিয়েছেন।

জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক স্বদেশ রায় বলেন, ‘‘ইউনূসের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো তিনি ৪০% ভোট ব্যাংকধারী বাঙালি জাতীয়তাবাদী শক্তিকে (আওয়ামী লীগ) বাইরে রেখে নির্বাচন করেছেন এবং গণতান্ত্রিক দেশগুলোর কাছ থেকে একে ‘অংশগ্রহণমূলক’ হিসেবে স্বীকৃতিও পেয়েছেন।’’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘‘এটি ইউনূসের একটি জাদুকরী ক্ষমতা, কারণ এর আগে শেখ হাসিনা যখন একই শতাংশ ভোটারকে নির্বাচনের বাইরে রেখেছিলেন, তখন এই পশ্চিমা দেশগুলোই তার সমালোচনা করেছিল।’’

অন্তর্বর্তী সরকারের পারফরম্যান্স

২০২৪ সালের ৮ আগস্ট প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন ইউনূস। তিনি অর্থনীতিকে কিছুটা স্থিতিশীল করতে পারলেও মানবাধিকার লঙ্ঘনের যে অভিযোগে হাসিনা সরকার সমালোচিত হতো, তা পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেননি। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং গণপিটুনি অব্যাহত ছিল। এমনকি নারী অধিকারের ইস্যুতে তিনি ইসলামপন্থী সংগঠনগুলোর চাপের কাছে নতি স্বীকার করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

প্রফেসর শাহান বলেন, ‘‘ইউনূসের ম্যান্ডেট ছিল তিনটি—নির্বাচন, সংস্কার এবং বিচার নিশ্চিত করা। তিনি একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিতে পেরেছেন, কিন্তু সংস্কারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। আইনের শাসনের ক্ষেত্রে তিনি পরবর্তী সরকারের জন্য খুব একটা ভালো উদাহরণ তৈরি করতে পারেননি।’’

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন ইউনূসের জন্য একটি স্বস্তির বিষয় হলেও ‘জুলাই চার্টার’ বা জুলাই সনদের বাস্তবায়ন এখন প্রশ্নবিদ্ধ। এই সনদের ওপর হওয়া গণভোটে ৬২% মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছিল, যা সংসদকে ১৮০ দিনের জন্য সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিএনপি এই সনদের অনেক ধারা নিয়ে দ্বিমত পোষণ করছে।

ইউনূস কীভাবে সফল হলেন?

ইউনূসের নিজস্ব কোনো রাজনৈতিক দল ছিল না। তাহলে তিনি কীভাবে সবকিছু সামলালেন?ইউনূস খুব সুনিপুণভাবে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং হেফাজতে ইসলামের মতো দলগুলোকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে এক করতে পেরেছিলেন। ছাত্র নেতাদের ‘ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি’ (এনসিপি) এবং জামায়াতের প্রকাশ্য সমর্থন তার বড় শক্তি ছিল। এছাড়া তরুণ প্রজন্মের এক বিরাট অংশের সমর্থনও তিনি পেয়েছিলেন।

শাফকাত রাব্বী মনে করেন, ইউনূস প্রথাগত রাজনীতিকদের মতো কাজ না করে তার বিশ্বস্ত কিছু সহযোগী ও দাতব্য সংস্থার অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন ধরন।

এখন মুহাম্মদ ইউনূসের ভবিষ্যৎ কী?

অনেকেই ধারণা করেছিলেন ইউনূস হয়তো রাষ্ট্রপতি হবেন। কিন্তু ক্ষমতায় যেহেতু বিএনপি আসছে, তাই তা হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ তারেক রহমানের মা খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধেও ছিল।প্রফেসর শাহান মনে করেন, ইউনূস হয়তো এখন বিশ্রাম নেবেন এবং তার পুরনো জীবনে ফিরে যাবেন। একটি শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর তার বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হবে।

তবে স্বদেশ রায় বলেন, ‘‘ইউনূস একসময় বলেছিলেন তিনি আঞ্চলিক নয়, আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়। তিনি এখন প্রমাণ করলেন বাকি সবাই আঞ্চলিক খেলোয়াড়, আর একমাত্র তিনিই আন্তর্জাতিক স্তরের খেলোয়াড়।’’ইতিহাস কি তার প্রতি সদয় হবে? স্বদেশ রায়ের মতে, ‘‘ইতিহাস খুব বাছবিচার করে চলে। এটি সবাইকে জায়গা দেয়, কিন্তু সব জয়ীকেই উষ্ণভাবে আলিঙ্গন করে না।’’