
সকালে পদত্যাগ, বিকেলে শপথ। রাজনীতির মঞ্চে এমন দ্রুত দৃশ্যপট বদল সচরাচর দেখা যায় না। কিন্তু সেটিই ঘটেছে ড. খলিলুর রহমানকে ঘিরে। অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পদ ছাড়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় টেকনোক্র্যাট কোটায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। একসময় যাঁকে নিয়ে ‘হ্যাশট্যাগ খলিল মাস্ট গো’ প্রচারণা চলেছিল, সেই খলিলকেই এখন কূটনীতির দায়িত্ব দিল বিএনপি— রাজনৈতিক অঙ্গনে এ সিদ্ধান্তে তৈরি হয়েছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা।
সমালোচনা থেকে স্বাগত: বিএনপির অবস্থান বদল!
গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে রাখাইনে ‘মানবিক করিডোর’ ইস্যুতে ড. খলিলুর রহমানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সোচ্চার ছিল বিএনপি। তাঁর নাগরিকত্ব প্রশ্নে বিতর্ক, জাতীয় নিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল দপ্তরে ‘বিদেশি নাগরিক’ নিয়োগের অভিযোগ— সব মিলিয়ে তাঁকে অপসারণের দাবি তোলে দলটি। দলীয় নেতারা অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে বৈঠকে সরাসরি তাঁর পদত্যাগ চান। সামাজিক মাধ্যমে বিএনপির কয়েকজন বর্তমান সংসদ সদস্য ‘#KhalilMustGo’ প্রচারণা চালান।
খুলনার সার্কিট হাউস ময়দানে এক সমাবেশে দলটির নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ প্রশ্ন তোলেন, কীভাবে একজন বিদেশি নাগরিককে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা করা হলো? তিনি অভিযোগ করেন, রোহিঙ্গা করিডোরের নামে দেশকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। তখনকার প্রেক্ষাপটে বিএনপির বক্তব্য ছিল স্পষ্ট— জাতীয় নিরাপত্তা ‘বিদেশি’ কারও হাতে থাকতে পারে না।
কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই অবস্থানেই দৃশ্যমান পরিবর্তন। বিএনপি সরকার গঠনের পর টেকনোক্র্যাট কোটায় ড. খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা হয়েছে। দলীয় সূত্র বলছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর অভিজ্ঞতা ও যোগাযোগই এই সিদ্ধান্তের প্রধান কারণ।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস-এর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে ড. খলিল একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগে ভূমিকা রাখেন বলে জানা যায়। লন্ডনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর সঙ্গে ইউনূসের বৈঠকের পেছনে তাঁর সমন্বয় ছিল বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় ফেরার পর ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কে টানাপোড়েনের সময়ও খলিলকে সক্রিয় দেখা যায়। মার্কিন শুল্ক আরোপের প্রেক্ষাপটে যে পারস্পরিক বাণিজ্য সমঝোতা হয়, তার নেপথ্য কারিগরদের একজন হিসেবে তাঁর নাম আসে। একই সঙ্গে আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ, মিয়ানমার ইস্যুতে কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সংলাপ অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রেও তিনি সক্রিয় ছিলেন।
ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল-এর সঙ্গে যোগাযোগ, কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা এবং বেইজিংয়ে কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ— সব মিলিয়ে বহুমাত্রিক কূটনৈতিক তৎপরতায় তিনি আলোচনায় ছিলেন। ওই আয়োজনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন এবং পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারিসহ বিশ্বনেতাদের পাশে তাঁকে দেখা যায়।
নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন
তবে নতুন মন্ত্রিত্বের শপথের পরই প্রশ্ন উঠেছে— অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বে থাকাকালে তিনি কতটা নিরপেক্ষ ছিলেন? জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন, ড. খলিলের বিএনপি সরকারে যোগ দেওয়া প্রমাণ করে তিনি আগে থেকেই একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষে কাজ করেছেন। তাঁর দাবি, সাম্প্রতিক নির্বাচনে এনসিপির আসন কমে যাওয়া এবং সরকারি দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ‘পরিকল্পিত ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর অংশ।
উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে ছাত্রনেতাদের পদত্যাগের দাবি জানিয়েছিল বিএনপি। সেই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনের আগে উপদেষ্টা পরিষদ থেকে সরে দাঁড়ান মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। এখন প্রশ্ন উঠছে— একই যুক্তি কি ড. খলিলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য ছিল না?
ড. খলিলুর রহমান ১৯৭৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। ১৯৭৯ সালে বিসিএস (পররাষ্ট্র) ক্যাডারে যোগ দেন। যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন ও কূটনীতিতে এমএ এবং অর্থনীতিতে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগ, জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন এবং আঙ্কটাডে বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাঁর ঝুলিতে।
এই পেশাগত পরিধিই কি শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক আপত্তি ছাড়িয়ে গেল? নাকি বিএনপি কৌশলগত বাস্তবতায় অবস্থান বদল করেছে— এই প্রশ্ন এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘুরপাক খাচ্ছে।
নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ড. খলিলুর রহমানের সামনে চ্যালেঞ্জ কম নয়। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন— তিন পরাশক্তির ভারসাম্য রক্ষা, রোহিঙ্গা সংকট, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বাণিজ্য— সব ক্ষেত্রেই সূক্ষ্ম কূটনৈতিক চাল প্রয়োজন। একই সঙ্গে তাঁকে সামলাতে হবে রাজনৈতিক বিতর্ক ও আস্থার সংকট।
যাঁকে ঘিরে একসময় সরব ছিল বিরোধিতা, সেই খলিল এখন সরকারের মুখপাত্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। সমালোচকরা বলছেন, এটি ‘রাজনীতির বাস্তববাদ,’; সমর্থকদের দাবি, ‘দক্ষতার স্বীকৃতি’। কিন্তু প্রশ্ন একটাই— এই নাটকীয় রূপান্তর কি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে, নাকি এটি কেবল ক্ষমতার পালাবদলের স্বাভাবিক পরিণতি? সময়ই দেবে তার উত্তর।











































