প্রচ্ছদ জাতীয় এবারের ‘ভোটযুদ্ধে’ নেই যেসব শীর্ষ নেতা, নেপথ্যের কারণ কী

এবারের ‘ভোটযুদ্ধে’ নেই যেসব শীর্ষ নেতা, নেপথ্যের কারণ কী

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতীক বরাদ্দের একদিন পর ২২ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়েছে ভোট উৎসব। সে অনুযায়ী প্রতিটি দলের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরাই প্রচারণা ও গণসংযোগে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।

তবে এবার প্রধান দলগুলোর অনেক শীর্ষ নেতাই নেই ভোটযুদ্ধে। এদের মধ্যে কেউ বার্ধক্যজনিত কারণে, কেউ দলীয় নির্বাচন কমিটিতে থাকায়, আবার কোনও কোনও নেতার নিজের নির্বাচনি আসনে শক্তিশালী ভিত্তি নেই। তাই তারা ভোট উৎসবে শরিক হতে পারেননি।

আর ইসির সিদ্ধান্তের কারণে সাময়িক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কোনও নেতাই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারছেন না।

দলগুলোর প্রচার ও গণমাধ্যম শাখা ও নেতাদের কাছ থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

বিএনপির নেতাদের মধ্যে যারা নির্বাচন করছেন না তারা হলেন—সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার। পঞ্চগড়-১ আসন থেকে অতীতে একাধিকবার জয়ী হয়েছেন তিনি। সর্বশেষ ২০০১ সালের নির্বাচনেও তিনি জয়লাভ করেন। তবে বার্ধক্যজনিত কারণে এবার তার স্থলে নির্বাচন করছেন তার ছেলে ব্যারিস্টার নওশাদ জমির সরকার।

একই কারণে নির্বাচনে নেই স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া। ১৯৯১ সালে কুমিল্লা-৩ (মুরাদনগর) আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হন। পরবর্তী সময়ে দুই দফা শিক্ষামন্ত্রী ও গণপূর্তমন্ত্রী ছিলেন। সর্বশেষ ২০০৮ সালে ঢাকার একটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যান। এরপর আর কোনও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেননি। ২০১৮ সালের পর থেকেই নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি শয্যাশায়ী।

নির্বাচন পরিচালনা কমিটির দায়িত্বে থাকায় নির্বাচন করছেন না স্থায়ী কমিটির আরও দুই সদস্য নজরুল ইসলাম খান ও সেলিমা রহমান।

নজরুল ইসলাম খান নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান, আর সেলিমা রহমান ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন।

একই কারণে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, আব্দুস সালাম, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল ও হুমায়ুন কবিরসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা নির্বাচনে নেই।

দলের মিডিয়া সেলের পক্ষ থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

বিএনপির পর অন্যতম বড় দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতাও এবারের নির্বাচনে নেই।

এর মধ্যে বার্ধক্যজনিত কারণে নির্বাচন করছেন না দলটির নায়েবে আমির আ ন ম শামসুল ইসলাম। তিনি ২০০৮ সালে চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগড়া) আসন থেকে নির্বাচন করে জয়লাভ করেন। সেখানে তার বদলে নির্বাচন করছেন আরেক নেতা শাহজাহান চৌধুরী।

এছাড়া পাঁচ জন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবার নির্বাচন করছেন না। এর মধ্যে অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন হেলাল বরিশাল-৫ (সদর) আসন থেকে মনোনয়ন বৈধ হওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত দলীয় সিদ্ধান্তে ইসলামী আন্দোলনের নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীমকে সমর্থন করে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।

আর নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতে থাকায় প্রার্থী হননি আরও চার সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল- এ টি এম মাছুম, মুহাম্মদ শাহজাহান, মাওলানা আব্দুল হালিম ও অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।

দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘‘দলীয় সিদ্ধান্তের কারণে কয়েকজন শীর্ষ নেতা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন না। তবে ভোটে প্রার্থীদের সার্বিক বিষয়ে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন।’’

বার্ধক্যজনিত কারণে এবার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেননি জাতীয় পার্টির প্রয়াত চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পত্নী রওশন এরশাদ। এর আগে বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও রংপুরের দুটি আসন থেকে একাধিকবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হন তিনি। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর তিনি বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েও শেষ পর্যন্ত ভোটে নেই জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। বার্ধক্যজনিত ও অনিশ্চয়তার কারণে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানা গেছে।

পিরোজপুর-৩ (ভাণ্ডারিয়া, কাউখালী) আসন থেকে তিনি ২০১৮ পর্যন্ত টানা ৭ বারের এমপি ছিলেন। তবে ২০২৪ সালের নির্বাচনে হেরে যান। ৫ আগস্টের পর গ্রেফতার হলেও পরে ছাড়া পান। তিনি একাধিকবার মন্ত্রীও ছিলেন।

যুগপতের শরিক হিসেবে পিরোজপুর-১ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন পান জাতীয় পার্টি (জাফর) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার মোস্তফা জামাল হায়দার। তিনিও বার্ধক্যসহ নানা কারণে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেননি।

তরুণদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রায় সব শীর্ষ নেতাই এবার প্রথমবারের মতো ভোটযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন। উল্লেখযোগ্য কয়েকজন নেতা নির্বাচন করছেন না। এর মধ্যে অন্যতম দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।

সরকারের উপদেষ্টা পদে থাকাকালীনই গুঞ্জন ছিল পদত্যাগ করে তিনি নিজ জন্মস্থান কুমিল্লা-৩ (মুরাদনগর) অথবা ঢাকা-১০ (ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, কলাবাগান) আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়বেন। পদত্যাগ করার পর এ নিয়ে আসনটিতে নিজের ব্যানার-ফেস্টুন সাঁটিয়ে প্রচারও করেছিলেন।

তবে গত ২৯ ডিসেম্বর তিনি এনসিপিতে যোগ দিয়ে মুখপাত্রের দায়িত্ব লাভ করেন। পরবর্তীকালে তাকে করা হয় দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান। এছাড়া দুই শীর্ষ নেত্রী সামান্তা শারমিন ও ডা. মাহমুদা মিতু নির্বাচন করছেন না।

দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখ্য সমন্বয়কারী তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘‘আমাদের প্রায় বেশিরভাগ শীর্ষ নেতাই নির্বাচন করছেন। তবে দলীয় সিদ্ধান্তে যারা নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতে আছেন, তারা ভোটে অংশ নেননি। কারণ সারা দেশের প্রার্থীদের বিষয়ে তাদের খোঁজ নিতে হবে।’’

নির্বাচনে নেই ধর্মভিত্তিক দ্বিতীয় বৃহত্তম দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম।

দলটির যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, অতীতে তাদের দলীয় প্রধান প্রয়াত মাওলানা ফজলুল করীমও কখনও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। তিনি জানান, মূলত দলীয় প্রধানের যাতে সারা দেশের প্রার্থীদের পক্ষে সমাবেশ ও প্রচারণা করতে সুবিধা হয়, সে জন্য তিনি নির্বাচন করেন না।

‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই’ দাবি করে এবার নির্বাচন করছেন না কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী। টাঙ্গাইল-৮ (সখীপুর) আসন থেকে আওয়ামী লীগের হয়ে একাধিকবার নির্বাচিত এমপি ছিলেন তিনি। তবে দলটির সঙ্গে মতবিরোধের জেরে ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে পদত্যাগ করেন। এরপর গঠন করেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ নামের রাজনৈতিক দল।

২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় নির্বাচনে তিনি গামছা প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়লাভ করেন। সর্বশেষ এ আসনটি থেকে ২০১৮ সালের নির্বাচনে আইনি জটিলতায় তিনি অংশগ্রহণ করতে পারেননি। তার স্থলে বিএনপি জোটের সমর্থনে নির্বাচন করে হেরে যান তার মেয়ে কুঁড়ি সিদ্দিকী। সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে কাদের সিদ্দিকী বলেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচনের সুযোগ না পেলে তিনিও ভোটে থাকবেন না। সে অনুযায়ী তার আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী সালাহ উদ্দিন আলমগীর রাসেলকে সমর্থন দেন তিনি।

নির্বাচনে নেই বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম। অতীতে তিনি চট্টগ্রামের দুটি আসন থেকে একাধিকবার নির্বাচিত হয়েছেন। সর্বশেষ ২০০৮ সালের নির্বাচনেও তিনি চট্টগ্রাম-১৪ আসন থেকে এলডিপির ছাতা প্রতীকে নির্বাচন করে জয়ী হন। তবে এবার নিজস্ব সিদ্ধান্তে নির্বাচন করছেন না বলে জানা গেছে। তার পরিবর্তে জামায়াত জোট থেকে নির্বাচন করছেন তার ছেলে ওমর ফারুক।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) সভাপতি আ. স. ম. আবদুর রব ১৯৯৬ সালে লক্ষ্মীপুর-৪ আসন থেকে জাসদের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হন।

তখন আওয়ামী লীগের ঐকমত্য সরকারের মন্ত্রী হন। তবে পরবর্তীকালে আর বিজয়ী হতে পারেননি। সর্বশেষ ২০১৮ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের পক্ষ থেকে নির্বাচন করে হেরে যান। এবার বার্ধক্যজনিত কারণে নির্বাচন করতে পারছেন না বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। তার স্থলে নির্বাচন করছেন সহধর্মিণী তানিয়া রব।

অপরদিকে বাম দলগুলোর বেশিরভাগ শীর্ষ নেতাই এবার নির্বাচন করছেন।

আর নির্বাচনে নেই হাতেগোনা কয়েক জন। বাসদের (জামান) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন না। এ বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি জানান, দলীয় সিদ্ধান্তের কারণে এবার তিনি নির্বাচন করছেন না। তবে দলের শীর্ষ অনেক নেতাই ভোটযুদ্ধে নেমেছেন।

এছাড়া নির্বাচনে নেই ১০ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের শরিক দল বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) কোনও শীর্ষ নেতা। শুধু তাই নয়, ১০ দলীয় সমঝোতায় এই দুই দলের কোনও প্রার্থী নেই।